- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৫
রাত পোহালেই তর্পণ, তবু শহরজুড়ে ‘মগজখেকো’র আতঙ্ক ! চিকিৎসকদের আশ্বাসেও কাটছে না সংশয়
রাত পোহালেই মহালয়া। ধর্মীয় রীতিতে পূর্বপুরুষের উদ্দেশে গঙ্গার জলে তর্পণ করতে ভোর থেকে গঙ্গায় বুকে ঢল নামবে হাজার হাজার মানুষের। কিন্তু তর্পণপূর্ব ভাবনায় ঢুকে পড়েছে নতুন সংশয়। গঙ্গায় নামলে যদি জল ঢুকে পড়ে নাক দিয়ে? যদি সেই জলের সঙ্গে গোপনে শরীরে ঢুকে পড়ে প্রাণঘাতী ‘মস্তিষ্কখাদক’ অ্যামিবা?
কেরলে গত কয়েক মাসে অন্তত ১৯ জনের মৃত্যু ঘটেছে এককোষী এই প্রাণীর আক্রমণে। চিকিৎসকদের মতে, ‘নিগ্লেরিয়া ফোলেরি’ নামের ওই অ্যামিবা সাধারণত গরম ও বদ্ধ জলে বাস করে। একবার নাক দিয়ে শরীরে প্রবেশ করলেই পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে। সেখানে পৌঁছে স্নায়ুকোষ আক্রমণ করে ও ধ্বংস করে ফেলে। এর ফলে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই। চিকিৎসক অনির্বাণ দলুই জানিয়েছেন, একবার শরীরে ঢুকে পড়লে এ অ্যামিবা মস্তিষ্কে সিস্ট তৈরি করে। তখন ‘প্রাইমারি অ্যামিবিক মেনিনগোএনসেফালাইটিস’ বা পিএএম নামক একটি বিরল এবং প্রায় প্রাণঘাতী রোগ দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা শুরু না হলে মৃত্যুঝুঁকি প্রবল।
তবে বাংলায় কি এই ‘মগজখেকো’ অ্যামিবার উপস্থিতি রয়েছে ? গঙ্গার জলে নামা কি সত্যিই বিপজ্জনক? চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদার জানাচ্ছেন, এই অ্যামিবা সাধারণত জমা, বদ্ধ ও অপরিষ্কার জলে বেশি দেখা যায়। গঙ্গা একটি প্রবাহমান নদী, যেখানে স্রোত রয়েছে। ফলে সেখানে নিগ্লেরিয়া ফোলেরির থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। যদিও নিশ্চিত করে না বলা যাচ্ছে না কিছুই। তবে গঙ্গার মতো বহমান নদীর জলে এই অ্যামিবার বাস স্বাভাবিক নয়। বাংলায় কিন্তু অ্যামিবার প্রজাতি ভিন্ন। এখানকার সংক্রমণ মূলত ‘অ্যাকান্থামিবা’ নামের একটি পৃথক প্রজাতির মাধ্যমে ঘটে থাকে। ভাইরোলজিস্ট সিদ্ধার্থ জোয়ারদার জানিয়েছেন, কেরলের অ্যামিবার তুলনায় বাংলার অ্যামিবার মারণক্ষমতা অনেক কম। এই অ্যামিবা মূলত গ্রানুলোম্যাটাস অ্যামিবিক এনসেফালাইটিস বা জিএই তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে শরীরে সংক্রমণ ঘটায়। সময়মতো রোগ নির্ণয় হলে চিকিৎসার মাধ্যমে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।
তর্পন করতে গঙ্গায় নামা যাবে না, এমনটি মোটেও বলছেন না চিকিৎসকেরা। বরং তাঁরা বলছেন, তর্পণ করা যেতেই পারে, কিন্তু জল যেন কোনো ভাবে নাক বা মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ না করে, সে দিকে খেয়াল রাখা দরকার। বিশেষ করে মাথা ডুবিয়ে স্নান না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। অনেকেই তর্পণের শেষে মাথা বা মুখে জল ছিটিয়ে থাকেন। চিকিৎসকদের মতে, সে অভ্যাস থেকে বিরত থাকাই ভাল। শিশু ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে সাবধানতা আরো বেশি প্রয়োজন। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনায় কম, তাই সংক্রমণের আশঙ্কাও বেশি। এছাড়াও, পাড়ার নোংরা, বদ্ধ ও দীর্ঘদিন অপরিষ্কার জলাশয়ে তর্পণ একেবারেই করা উচিত নয়।
এ রোগ কি ছোঁয়াচে? চিকিৎসকরা একবাক্যে জানাচ্ছেন, না। নিগ্লেরিয়া ফোলেরি একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের শরীরে ছড়ায় না। অর্থাৎ সংক্রমিত ব্যক্তি কারো সংস্পর্শে এলে, অন্য কেউ আক্রান্ত হবেন না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ সময়ে বঙ্গপ্রশাসনের পক্ষ থেকেও সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। শহর ও গ্রামে যেসব জলাশয়ে তর্পণ হয়, সেগুলি ব্লিচিং পাউডার কিংবা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দিয়ে আগে থেকে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, কোথাও যদি জমা জল থেকে যায়, তার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
পিতৃপক্ষের শেষ আর মাতৃপক্ষের শুরুর সন্ধিক্ষণে, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ বাংলার এক গভীর সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও আত্মিক পরম্পরা। সে পরম্পরার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই চিকিৎসকরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতার মাধ্যমে কাজটি শান্ত মনে সম্পন্ন করা যাক। নদীর স্রোতস্বচ্ছ জলে তর্পণ করলে সংক্রমণের আশঙ্কা নেই বললেই চলে, তবে একটু সচেতন হলেই বিপদের সম্ভাবনা অনেকটাই হ্রাস পায়।
❤ Support Us







