Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ১২, ২০২৬

‘পুশ ইন’ ইস্যুতে নীরবতা, সীমান্তে উত্তেজনা অব্যহত। অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান রুখতে দিল্লি বৈঠকে সমন্বয়ে ঐকমত বিএসএফ-বিজিবি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘পুশ ইন’ ইস্যুতে নীরবতা, সীমান্তে উত্তেজনা অব্যহত। অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান রুখতে দিল্লি বৈঠকে সমন্বয়ে ঐকমত বিএসএফ-বিজিবি

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশ ইন’ সমস্যা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, পাচার, সীমান্তে মৃত্যুর ঘটনা ইত্যাদি একাধিক স্পর্শকাতর ইস্যুতে মুখোমুখি হয়েছিল দু–দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা। দিল্লিতে চার দিনের দীর্ঘ আলোচনার শেষে সীমান্তে শান্তি, স্থিতাবস্থা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তবে বৈঠক শেষে ঘটল এক নজিরবিহীন ঘটনা। দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে যৌথ আলোচনার নথিতে স্বাক্ষরের পর বিএসএফ ও বিজিবির মহাপরিচালকেরা কোনো যৌথ সাংবাদিক বৈঠক করেননি। কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলের একাংশের মতে, দু–দেশের সীমান্ত পরিস্থিতি ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এ ঘটনাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।

নয়াদিল্লিতে বিএসএফ সদর দপ্তরে ৮ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ৫৭তম মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের সীমান্ত সমন্বয় সম্মেলন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।  গত মঙ্গলবার, লোদী রোডে বিএসএফ সদর দফতরে আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয় ভারত-বাংলাদেশ ৫৭তম ডিজি-স্তরের সীমান্ত সমন্বয় সম্মেলন। ৪ দিন ধরে চলা উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠক শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার।

বৈঠক শেষে, শুক্রবার বিএসএফের তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সীমান্ত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই আলোচনার টেবিলে উঠেছে। মাদক, অস্ত্র, জাল নোট, সোনা এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান রোধের পাশাপাশি মানব পাচার এবং অবৈধ সীমান্ত পারাপার ঠেকাতে যৌথ পদক্ষেপ আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দু–পক্ষই মনে করছে, কেবল কাঁটাতার বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করলেই হবে না, সীমান্তে সক্রিয় আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান চালানোও সমান জরুরি। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি নজর কেড়েছে বৈঠক-পরবর্তী পরিস্থিতি।

অতীতে প্রায় প্রতিটি ডিজি-স্তরের বৈঠকের শেষে যৌথ আলোচনার নথিতে স্বাক্ষর করার পর দুই বাহিনীর প্রধান সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতেন। সেখানে বৈঠকের মূল সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা তুলে ধরা হত। কিন্তু এ বার সেই প্রথা অনুসরণ করা হয়নি। পরিবর্তে, কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে কেবল একটি লিখিত প্রেস বিবৃতি প্রকাশের কথা জানানো হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার এবং পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই ছিল দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে প্রথম শীর্ষ বৈঠক। সে কারণে কূটনৈতিক দিক থেকেও এই বৈঠককে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছিল।

বৈঠকের আগে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকায় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বিএসএফের কথিত ‘পুশ-ব্যাক’ নীতি এবং সীমান্তে গুলিচালনার অভিযোগ তাঁরা আলোচনায় তুলবেন। গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ প্রশাসন বার বার অভিযোগ করেছে, ভারতে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের যথাযথ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্তে এনে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভারত অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে এবং জানিয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক নিয়ম ও দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা মেনেই করা হয়। এ বিতর্কের আবহেই শুক্রবার নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে। বাংলাদেশের দাবি, ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ১২ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবির বক্তব্য, তাঁরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় ওই ১২ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেন। ফলে যাঁদের সীমান্তে আনা হয়েছিল, তাঁরা শূন্যরেখা থেকে প্রায় ৫০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান নিতে বাধ্য হন। বর্তমানে ওই ব্যক্তিরা সীমান্তের ভারতীয় অংশে, শূন্যরেখা সংলগ্ন এলাকায় বিএসএফের নজরদারিতে খোলা আকাশের নীচে অবস্থান করছেন বলে জানা গিয়েছে।

পরিস্থিতি যাতে উত্তপ্ত না হয়, সে জন্য বিজিবি এবং স্থানীয় বাসিন্দারা সীমান্ত এলাকায় সতর্ক নজরদারি চালাচ্ছেন। বিষয়টির সমাধানে প্রাগপুর বিওপি থেকে বিএসএফের মথুরাপুর ক্যাম্পের কাছে পতাকা বৈঠকের প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সে বিষয়ে বিএসএফের তরফে এ সংক্রান্ত কোনো মন্তব্য বা বিজ্ঞপ্তি জারি হয় নি। এর আগেও সীমান্তে একই ধরনের উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি মেঘালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম গারো হিলস জেলার মহেন্দ্রগঞ্জ সংলগ্ন নন্দির চর এলাকায় সতি রাজবংশী নামে রাজশাহির এক ৫৫ বছর বয়সি ব্যক্তিকে ঘিরে বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করে বিএসএফ ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।

অন্যদিকে, বাংলাদেশও তাঁকে গ্রহণে অনীহা দেখায় বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে তিনি টানা দু–দিন নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে ছিলেন।  পরে বিষয়টি নিয়ে দু–পক্ষের মধ্যে বৈঠক হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান মেলেনি। ফলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়ায়। পরে উভয় দিক থেকে পাথর ছোড়াছুড়ির অভিযোগ উঠেছে। বিজিবি সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ২,৩৪৪ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ করা হয়েছিল বলে তাদের দাবি। তার পরে কয়েক মাস পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকলেও চলতি বছরের ৮ মে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। এর পর থেকেই আবার একের পর এক ‘পুশ-ইন’ এবং ‘পুশ-ইন’-এর চেষ্টা নিয়ে অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করেছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মোট ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ২,২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত, যা মোট সীমান্তের অর্ধেকেরও বেশি। এ ছাড়া ত্রিপুরার সঙ্গে ৮৫৬ কিলোমিটার, মেঘালয়ের সঙ্গে ৪৪৩ কিলোমিটার, মিজোরামের সঙ্গে ৩১৮ কিলোমিটার এবং অসমের সঙ্গে ২৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ভারতীয় সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ৮৬০ কিলোমিটার সীমান্ত এখনো সম্পূর্ণ ভাবে বেড়াবন্দি নয়। তার মধ্যে ১৭৪.৫১ কিলোমিটার এলাকায় ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক কারণে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করাই সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ইতিমধ্যেই অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। সরকারের বক্তব্য, অনুপ্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’— অর্থাৎ শনাক্তকরণ, সরকারি নথি থেকে নাম অপসারণ এবং বহিষ্কারের তিন ধাপের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ পরিস্থিতিতে দিল্লির বৈঠকে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সহযোগিতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করলেও সীমান্তে ‘পুশ-ইন’, অনুপ্রবেশ, বেড়া নির্মাণ এবং প্রত্যাবাসন নিয়ে মতপার্থক্য যে এখনো সম্পূর্ণ মেটেনি, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ফলে আগামী নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী ডিজি-স্তরের বৈঠকের দিকে এখন নজর থাকবে দুই দেশের প্রশাসন ও কূটনৈতিক মহলের।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!