- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৫, ২০২৬
৩০০ বছর ধরে ব্যবহৃত ভাষা এখনো ‘বিদেশি’? তিন-ভাষা নীতি নিয়ে সুপ্রিম প্রশ্নের মুখে ‘সিবিএসই’, শিক্ষক-সংকটেও উদ্বেগ
তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভারতে ব্যবহৃত হচ্ছে ইংরেজি। স্বাধীনতার পরেও প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সরকারি যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ভাষাটির। ফলে, ইংরেজিকে কি এখনো ‘নন-নেটিভ’ বা অ-দেশীয় ভাষা বলা যায় ? ‘সিবিএসই’-র নতুন ‘তিন-ভাষা নীতি’ ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে মঙ্গলবার উঠল এ প্রশ্নই। আর সে প্রশ্নের সূত্র ধরেই দেশের ভাষানীতি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং বাস্তব পরিকাঠামো নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিল শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা-র বেঞ্চে এ দিন একাধিক আবেদনের শুনানি চলাকালীন বিচারপতি বাগচী সরাসরি জানতে চান, ‘ভারত কি এখনো ইংরেজিকে একটি স্বদেশীয় ভাষা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না?’ তাঁর পর্যবেক্ষণ, অন্তত পাঁচটি রাজ্যে সরকারি যোগাযোগের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত ইংরেজিকে জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ বা আরবির মতো ভাষার সঙ্গে একই শ্রেণিতে ফেলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘সিবিএসই’-র ১০ জুলাই জারি করা একটি বিজ্ঞপ্তি। সেখানে ‘ভারতীয় ভাষা’ এবং ‘অভারতীয় ভাষা’-র মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন টানা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় নবম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের অন্তত দু–টি দেশজ ভাষা পড়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ, এত দিন যারা ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি, জার্মান, আরবি বা অন্য কোনো বিদেশি ভাষা পড়ছিল, তাদের নতুন করে ভারতীয় ভাষা বেছে নিতে হতে পারে।
শুনানির সময় বিচারপতি বাগচী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, ‘নেটিভ’ শব্দটির মধ্যেই ঔপনিবেশিক অভিঘাত রয়েছে। সংবিধান কিংবা দেশের আইনকানুনে কোথাও ‘নেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ’ শব্দবন্ধ ব্যবহৃত হয়নি। সেখানে ‘মাতৃভাষা’, ‘আঞ্চলিক ভাষা’ কিংবা ‘ভারতীয় ভাষা’র উল্লেখ রয়েছে। আদালতের প্রশ্ন, ‘সিবিএসই’ কোন ভিত্তিতে ‘নেটিভ’ এবং ‘নন-নেটিভ’ শব্দ ব্যবহার করল? যদিও তিন-ভাষা নীতির মূল উদ্দেশ্য নিয়ে আপাতত প্রশ্ন তুলতে চায়নি শীর্ষ আদালত। বরং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর পর্যবেক্ষণ, সংবিধানের ভাবনায় সরকারি কাজে ভারতীয় ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধির যে লক্ষ্য রয়েছে, এ নীতিকে তারই সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু নীতির উদ্দেশ্যের চেয়ে বাস্তবায়ন নিয়েই আপাতত বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আবেদনকারীদের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, দেশের অধিকাংশ স্কুলে এহেন নীতি কার্যকর করার মতো পরিকাঠামোই নেই। শিক্ষক নেই, পাঠ্যপুস্তক নেই, অথচ শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়ে গিয়েছে।
অভিভাবক ও পড়ুয়াদের পক্ষে সওয়াল করে আইনজীবী গোপাল শঙ্করণারায়ণনের বক্তব্য, ২২টি তফসিলভুক্ত ভাষার মধ্যে মাত্র কয়েকটির পাঠ্যবই এখনো পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। অথচ নীতি কার্যকর হয়েছে ১ জুলাই থেকেই। তাঁর প্রশ্ন, ‘যদি প্রত্যেক ছাত্রকে ২২টি ভাষার মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ দিতে হয়, তা হলে কি প্রতিটি স্কুলে ২২ জন অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে না?’ শঙ্করণারায়ণনের দাবি, বাস্তবে তা অসম্ভব। দেশের হাজার হাজার স্কুলের পক্ষে এত সংখ্যক ভাষাশিক্ষক নিয়োগ করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। এতে শিক্ষাব্যবস্থার উপর বিপুল চাপ তৈরি হবে। একই সুর শোনা যায় বরিষ্ঠ আইনজীবী মুকুল রোহতগির বক্তব্যেও। তিনি আদালতকে জানান, নবম শ্রেণির একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে হঠাৎ নতুন একটি ভাষা শিখে কয়েক মাসের মধ্যে পরীক্ষায় বসতে বলা অত্যন্ত অবাস্তব। ‘দিল্লির কোন স্কুলে তামিল শেখানোর শিক্ষক আছে?’— প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি আরও দাবি করেন, ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি’তে এ ধরনের পরিবর্তনের পূর্ণ বাস্তবায়নের সময়সীমা ছিল ২০৩০ সাল। কিন্তু ‘সিবিএসই’ তা কয়েক বছর এগিয়ে এনে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই কার্যকর করতে চাইছে।
অন্যদিকে, ‘সিবিএসই’ আদালতে দাখিল করা হলফনামায় জানিয়েছে, তারা সমস্যাগুলির কথা জানে। তবে সমাধানের পথও তাদের কাছে রয়েছে। বোর্ডের বক্তব্য, আপাতত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন স্নাতকোত্তর এবং ভার্চুয়াল ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষক-সংকট অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব। স্কুলগুলির মধ্যে শিক্ষক ভাগ করে নেওয়া বা ‘সহোদয়’ ক্লাস্টারের মাধ্যমেও সমস্যা মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ‘সিবিএসই’-র হিসাব অনুযায়ী, নবম শ্রেণির পরীক্ষার্থী পাঠানো ২৮,৮৪৮টি স্কুলের মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশ স্কুল ইতিমধ্যেই দুটি বা তার বেশি ভারতীয় ভাষা পড়াচ্ছে। ফলে তাদের ক্ষেত্রে নতুন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বোর্ডের আরও দাবি, ৯৯.৯ শতাংশ স্কুলে অন্তত একজন ভারতীয় ভাষার শিক্ষক রয়েছেন। পাঠ্যবই নিয়ে ওঠা অভিযোগেরও জবাব দিয়েছে ‘এনসিইআরটি’। তাদের হলফনামায় জানানো হয়েছে, ২২টি তফসিলভুক্ত ভাষার জন্য পাঠ্যসামগ্রী তৈরির কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। হিন্দি, সংস্কৃত, মারাঠি ও উর্দুর বই ইতিমধ্যেই ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে। বাকি ভাষাগুলির বইও জুলাইয়ের শেষের মধ্যে প্রকাশিত হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে তারা।
শুনানিতে আবেদনকারীদের আইনজীবীরা আরও দাবি করেন, নতুন নীতির ফলে অনেক শিক্ষক চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। এর জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের মন্তব্য, ‘কোনো ভাষা শেখা কখনোই বিফলে যায় না। যদি কাউকে অন্যায় ভাবে বরখাস্ত করা হয়, আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।’ তবে এ দিনই ‘তিন-ভাষা নীতি’র উপর স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করেছে সুপ্রিম কোর্ট। নতুন আবেদনের উপর নোটিস জারি করে কেন্দ্র, ‘সিবিএসই’ এবং ‘এনসিইআরটি’-কে জবাব দিতে বলা হয়েছে। আগামী ২২ জুলাই মামলার পরবর্তী শুনানি। তত দিনে হয়তো আরও স্পষ্ট হবে— বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু কি শুধুই ইংরেজির ‘পরিচয়’, নাকি ভারতের বহুভাষিক বাস্তবতার সঙ্গে শিক্ষানীতির সংঘাত? কারণ আদালতের পর্যবেক্ষণেই স্পষ্ট, প্রশ্নটা কেবল ভাষার নয়; প্রশ্ন পরিকাঠামো, সুযোগ এবং বাস্তবায়নেরও। আর সে পরীক্ষাতেই এখন দাঁড়িয়ে দেশের বহুল আলোচিত ‘তিন-ভাষা নীতি’।
❤ Support Us







