- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ১১, ২০২৫
‘অভিযান বন্ধ হলে,যুদ্ধবিরতিতে রাজি’, শান্তি আলোচনার বার্তা মাওবাদীদের ! শর্ত মানতে নারাজ রাষ্ট্র ।যুযুধান যুদ্ধে কী অবস্থা দেশের মূল-নিবাসীদের ?
নীরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে গত ১৫ মাসে ৪০০ মাওবাদী সদস্য নিহত হয়েছেন। আত্মসমর্পণ করেছেন অনেকে। ক্রমাগত ক্ষরণের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে রাজি মাওবাদীরা। তবে শান্তি আলোচনার আগে বেশকিছু শর্ত রেখে দ্বিতীয়বার স্বরাষ্ট্র দফতরকে চিঠি দিয়েছেন মাওবাদী শীর্ষ নেতা অভয়। মূলস্রোতে ফিরে এলে মাওবাদীদের সঙ্গে বৈঠকে রাজি ছত্তিশগড় সরকার, তবে এ শান্তি আলোচনা হতে হবে শর্তহীন। রাষ্ট্র বনাম মাওবাদ, যুযুধান লড়াইয়ে কী অবস্থা ভারতের মূলনিবাসী অরণ্য সন্তানদের ?
যুদ্ধবিরতিতে রাজি মাওবাদীরা ! লাগাতার অভিযানের জেরে গত ১৫ মাসে ৪০০ মাওবাদী সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। এই আবহে কেন্দ্র ও রাজ্যের উদ্দেশে বিবৃতি জারি করে মাওবাদীদের সেন্ট্রাল কমিটি জানালো, ‘অভিযান বন্ধ করুন, আমরা যুদ্ধবিরতিতে রাজি।’ এমনকি অভিযান বন্ধ করলে কেন্দ্র ও রাজ্যের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতেও রাজি মাওবাদী সংগঠন। নিহত মাওবাদী নেতা কোটেশ্বর রাও ওরফে কিশানজির ভাই, নিষিদ্ধ সংগঠন সিপিআই(মাওবাদী) দলের মুখপাত্র অভয় জানান,২৪ মার্চ হায়দরাবাদের তাঁদের গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কমিটির বেশিরভাগ সদস্যই কোনো সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধবিরতির পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে শান্তি আলোচনার আগে বেশকিছু শর্ত রেখে দ্বিতীয়বার স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে চিঠি দিয়েছেন মাওবাদী শীর্ষ নেতা অভয়। মূলস্রোতে ফিরে এলে মাওবাদীদের সঙ্গে বৈঠকে রাজি ছত্তিশগড় সরকার, তবে এ শান্তি আলোচনা হতে হবে শর্তহীন। রাষ্ট্র ও মাওপন্থা, যুযুধান লড়াইয়ে কী অবস্থা ভারতের মূলনিবাসী অরণ্য সন্তানদের ?
প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মাওবাদী স্ট্রেন্টাল কমিটি জানিয়েছে, তাঁরা শান্তি সমঝোতা ও যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী। কিন্তু তার আগে কিছু শর্ত রয়েছে তাঁদের। এক, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার মাওবাদী অধ্যুসিত অঞ্চলগুলিতে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান বন্ধ করতে হবে। দুই, ওই এলাকাগুলি নতুন করে পুলিশের ফাঁড়ি তৈরি বন্ধ করতে হবে ও আদিবাসী মানুষের উপর পুলিশি নির্যাতন থামাতে হবে। গত ২ এপ্রিল রাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠির পর, ৮ এপ্রিল এ বিষয়ে নতুন করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে মাওবাদী সংগঠন। এ বিষয়ে কেন্দ্র সরকার বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া না এলেও, ছত্তিশগড় সরকার মুখ খুলেছে। বৃহস্পতিবার এক সংবাদিক সম্মেলনে ছত্তিশগড়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজয় শর্মা বলেছেন, ‘বিদ্রোহী দলগুলি যদি মূলস্রোতে ফিরে আসতে চায়, তবে রাজ্য সরকার শর্তহীন শান্তি আলোচনা করতে প্রস্তুত।’ তিনি আরো বলেছেন, চিঠিটিতে যে ‘শান্তি কমিটি’র কথা বলা হয়েছে, সেই কমিটি সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।’ তিনি বলেছেন, ‘যদি এমন কোনো কমিটি থাকে, তবে আমি তাদেরকে অনুরোধ করছি আলোচনার মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান করুণ। আপনাদের নিরাপত্তা আমি সুনিশ্চিত করবো। আপনারা কোনো কমিটি গঠন করে আমাদের কাছে আসতে পারেন অথবা কোনো শীর্ষ নেতাকে পাঠাতে পারেন। আমরা পুনর্বাসন নীতির অধীনে আলোচনা করতে প্রস্তুত।’ সাংবাদিকদের করা মাওবাদী আত্মসমর্পণ বা অস্ত্রত্যাগ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে শর্মা বলেন, ‘আপনারা আলোচনা বলতে কী বুঝছেন? এটা কি চা-নাস্তা খাওয়ার বৈঠক হবে? না, এটা মাওবাদী সদস্যের মূলধারায় ফিরে আসার প্রেক্ষিতে বৈঠক। আমরা এখানে কোনো চুক্তি করছি না। তাঁরা মূলধারায় ফিরে আসতে পারেন, রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে ভূল ধারণা ও সন্দেহ মেটাতে পারেন। ভারতের সংবিধান চায়, যাতে দেশের মানুষ আইন-শৃঙ্খলা মেনে চলুক। সুতরাং তাঁরা যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চান তাহলে তাঁদের নিরাপত্তা, পুনর্বাসন বা ভবিস্যতে পুলিশ কেস যাতে না হয়, সে বিষয়টি আমরা দেখবো।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যেমন তাদের উপর কোনো শর্ত চাপাচ্ছি না শান্তি আলোচনা করার জন্য, তাঁরাও যেন কোনো শর্ত না রাখে। তাহলেই আলোচনা করা সম্ভব।’ এদিকে, ৮ এপ্রিল প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সিপিআই (মাওবাদী)-এর উত্তর-পশ্চিম উপ-অঞ্চলীয় ব্যুরো জানিয়েছে, ‘যদিও আমরা শান্তি আলোচনার বিরোধী নই, কিন্তু বাস্তারে চলমান হত্যা ও নিরাপত্তাবাহিনীর নির্যাতনের পরিস্থিতিতে আলোচনা করা সম্ভব না।’
গত ২২ মার্চ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে ঘোষণা করেন, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে দেশ থেকে নকশালবাদ সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হবে। তিনি জানিয়েছেন, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ১৬,৪৬৩টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু গত দশ বছরে এই সংখ্যা ৫৩% কমেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেছেন, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ১,৮৫১ জন নিরাপত্তা কর্মী শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু গত দশ বছরে এই সংখ্যা ৭৩% কমে ৫০৯-এ দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি সংঘর্ষে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ৪,৭৬৬ থেকে ১,৪৯৫-এ নেমে এসেছে, যা আগের তুলনা ৭০% কম। ছত্তিশগড়ে সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কথা বলা বলতে গিয়ে, অমিত শাহ জানিয়েছেন, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নকশাল-প্রভাবিত এলাকায় ১১,৫০৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও, ২০,০০০ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ২,৩৪৩টি মোবাইল টাওয়ার আর দ্বিতীয় পর্যায়ে ২,৫৪৫টি টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে ৪,০০০ মোবাইল টাওয়ার বসানোর কাজ চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ১ ডিসেম্বরের মধ্যে নকশাল-প্রভাবিত সমস্ত এলাকা মোবাইল সংযোগের আওতায় আনা হবে। ২০২৩ সালে বিজেপি ছত্তিশগড়ে ক্ষমতায় আসার পরে মাওবাদী দমনে যৌথ বাহিনীকে খোলা ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারও সবরকম সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাষ্ট্র বনাম মাওবাদ, যুযুধান লড়াইয়ে কী অবস্থা ভারতের মূলনিবাসী অরণ্য সন্তানদের ? রাষ্ট্র উন্নয়ণ দাবি করলেও, সত্যিই কেমন আছেন তাঁরা! এ প্রশ্নই দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরপাক খাচ্ছে। মূল-নিবাসী মানুষের অরণ্যের অধিকার, দারিদ্র্য, শোষণ, অত্যাচার, পুঁজিবাদী হস্তক্ষেপ, ভূমি ও জীবিকার ক্ষতি, উপজাতীয় মর্যাদা হারানো – ছত্তিশগড়, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, তেলেঙ্গানা, মধ্যপ্রদেশের ও মহারাষ্ট্রের জঙ্গলে এই সব প্রশ্নের উত্তর আদায় করতেই মাওবাদীদের উত্থান ? না কি এর পিছনে ক্ষমতা ও অর্থের অন্য সমীকরণ কাজ করছে ? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নকশালমুক্ত ভারতে এইসব মানুষদের স্থান কোথায় ? তাঁদের অধিকারের দাবি তুলবে কে ? একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে ভারতের আমজনতাকে সরকারের কাছে লাগাতার এ প্রশ্ন তুলতে হবে।
সংবিধানের আলোয়, আইনের শৃঙ্খলায় যদি দেশ চালানো উদ্দেশ্য হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সব মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, বিচ্ছিন্ন মানুষদের ফিরিয়ে আনবার সমাধানসূত্র কেমনভাবে বেড় করা যায়, এগুলি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রতিদিন সংবাদে প্রকাশিত হচ্ছে মাওবাদী ‘খতম’-এর খবর। নিহতদের মধ্যে শুধুই মাওবাদী ? না তালিকায় রয়েছেন মূলনিবাসী গ্রামবাসীরা। দু-পক্ষের যুদ্ধে যারা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ভয়ঙ্কর আঘাতে মারা যান, পরিবার-পরিজন হারান। হেলিকপ্টার থেকে ছোঁড়া বোমা মাওবাদী দেখে না, গ্রামকে গ্রামকে উড়িয়ে দেয়। একজন মাওবাদী দেখতে কেমন? কেউ তা জানে না। শুধু ট্যাগটুকু আছে। শহরে বসে কার্ল মার্কস পড়তে যদি ‘আর্বান নকশাল’ খেতাব জোটে , তবে প্রতিটি বনাঞ্চলবাসী, যারা তাঁদের জমি আঁকড়ে ধরে পড়ে আছেন, অধিকার ফেরত পেতে চাইছেন, তাঁদের ‘মাওবাদী’ তো বলা বলা যেতেই পারে! গায়ে ইনফ্রারেড রশ্মির পড়বার পর এক’দুখানা বুলেট শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতেই পারে! সময় এগিয়েছে, সরাকার বদলেছে, কংগ্রেসের নিও-লিবারাল পেরিয়ে এখন আত্মনির্ভর ভারত। কংগ্রেসের অপারেশন গ্রিন হান্ট, নাম বদল করে এখন মাওবাদী খতম অভিযান। আদিবাসী মানুষের জল-জঙ্গল-জমির অধিকার পুঁজিবাদী শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার ‘বিকাশ’ অব্যাহত।
❤ Support Us






