- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ প্রচ্ছদ রচনা
- অক্টোবর ১৩, ২০২২
১৬ অক্টোবর চিনা কমিউনিস্ট পার্টির কুড়িতম জাতীয় কংগ্রেস।মাওসেতুং এর মতো আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট পদে কী জিনপিং
চিনে কি আবার মাও সেতুং জামানা ফিরে আসছে ? পশ্চিমের বহুমুখী চাপকে নস্যাৎ করে দীর্ঘতর হয়ে উঠবে বাক সংযমী, কৌশনপ্রিয় জি জিনপিং এর শাসন পর্ব?
চিনে কি আবার মাও সেতুং জামানা ফিরে আসছে ? পশ্চিমের বহুমুখী চাপকে নস্যাৎ করে দীর্ঘতর হয়ে উঠবে বাক সংযমী, কৌশল প্রিয় জি জিনপিং এর শাসন পর্ব? গুরুতর প্রশ্ন। গত দশ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট পদে বহাল রয়েছেন জিনপিং। তাঁর নেতৃত্বে, চিন বিশ্বের অন্যতম মহাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। নিঃশব্দে তার অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রবেশ করেছে পশ্চিম এশিয়া, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া আর আফ্রিকার দেশগুলিতে। চিন সাগরেও স্থাপিত হয়েছে বেইজিং এর একাধিপত্য। অস্ট্রেলিয়া, জাপান আর মার্কিন কূটনীতিকে প্রশ্রয় দেননি জিংপিং।
অনেকদিন ধরে জল্পনা উড়ছিল যে, মাওসেতুং এর মতো আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকতে পারেন জিনপিং। সরাসরি তাঁর প্রেসিডেন্টশিপের মেয়াদ বাড়বে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব।আগামী রবিবার বৈঠকে বসছে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির কুড়িতম জাতীয় কংগ্রেস। উপস্থিত থাকবেন দলের ২৩০০ প্রতিনিধি। জিনপিং এর পুনঃ নির্বাচন নিয়ে সম্ভবত প্রশ্ন উঠবে না। প্রতিদ্বন্দ্বীহীন প্রেসিডেন্টকে সবই একবাক্যে সমর্থন করবেন। পশ্চিমি দুনিয়া জিনপিং এর সাম্ভাব্য দীর্ঘ মেয়াদি নেতৃত্বকে একক আধিপত্য অথবা স্বৈরশাসনের দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরছে। মাওসেতুং জমানাকে এভাবে বিচার করেছিল।মাও এর জনপ্রিয়তা আর গণসমর্থনকে হেয় করতে জোরালো প্রচার, অপপ্রচার চালিয়েছে। অবিভক্ত সোভিয়েতও তাঁকে রেহাই দেয়নি। পুতিন শাসিত রাশিয়া এখন জিংপিং এর পাশে। কমিউনিস্ট শাসন থেকে বেরিয়ে গেলেও মস্কো জিনপিং শাসিত চিনের নিন্দা থেকে বিরত। রাশিয়ার নিকটতম শত্রু ইউরোপ ও আমেরিকা। এক্ষেত্রে চিন তার ঘনিষ্ঠতম মিত্র। নির্বাচিত পুতিনও নিজের দীর্ঘমেয়াদী শাসনপর্ব চালিয়ে যাবার সামাজিক ভিত্ তৈরি করেছেন, ভোটে জয়ী হয়ে, পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনে।
ন্যাটোভূক্ত তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানও একই নৌকার যাত্রী। নিজেই নিজের শাসনকাল বাড়িয়ে দিয়েছেন।জিংপিং এর সঙ্গে পুতিন কিংবা এরদোগানের তফাৎ – সিপিসি বিনাপ্রশ্নে, বিনা নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বকে মেনে নেয়। রাশিয়া অথবা তুরস্কে পশ্চিম এশিয়ার সিরিয়া ও অন্যান্য গুটি কয়েক দেশের মতো নির্বাচন হয়। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সাধারণত দেখা যায় যে, শাসক বিপুল ভোটে নির্বাচিত। উপসাগরীয় অঞ্চলের ইরানও প্রকারান্তরে ৭৯ সাল থেকে একদলীয়, একক শাসনের ধারা অব্যাহত। ইরান ধর্মশাসিত হলেও চিনের কমিউনিস্ট পার্টির শাসন কাঠামোকে অনুসরণ করছে। জিনপিং এর আমলে চিন-ইরানের হৃদ্যতা বেড়েছে। ইরানের ওপর পশ্চিমের, বিশেষ করে আমেরিকার বহুকৌনিক চাপ যত বাড়বে, বেইজিং ততই তেহরানের নিকটস্থ হবে। হিসেব পরিস্কার, পশ্চিম এশিয়াকে পশ্চিমের অর্থনৈতিক ক্ষমতাবলয় থেকে বের করে ক্রমশ পূর্বমুখী, চিনমুখী করে তোলা।এক্ষেত্রে ভারত বাধা হবে না। এটাই জিনপিং শাসনের অন্যতম সাফল্য। তাঁর সম্ভাব্য পুননির্বাচনে এরকম সাফল্যের ছবি দেখছে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি। সিপিসির শতবর্ষের ইতিহাসে আমৃত্যু ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন মাওসেতুং। ৭৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা আর দুষ্ট চতুষ্টয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব প্রশ্ন ক্রমশঃ চাপা পড়ে যায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের আড়ালে। পুঁজিবাদকে, সাংস্কৃতিক আগ্রসনকে আমল দেননি মাও সেতুং। পুঁজির সামাজিক ব্যবহারকে উড়িয়ে দেননি। গত শতাব্দীর সত্তর দশকেই চিনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডেং ঘোষণা করেন, ধন সংগ্রহ অন্যায় নয়, ইট ইজ প্রাউড টু বি রিচ। এই মতাদর্শকে রূপান্তরিত কৌশলে বরণ করে নেয় কমিউনিস্ট পার্টি। ইউরোপীয় এবং দক্ষিঁপূর্ব এশিয়ার কমিউনিস্টরা প্রথম দিকে চিনের পুঁজি বিকাশের ধারাকে মেনে নিতে পারেননি। পরে দলগতভাবে অনেকেই স্বীকার করে নেন, চিনের উন্নয়নের পথে ভুল নেই। অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ হয়ে ওঠার প্রয়াস নেই তাঁর। পশ্চিমি কুৎসা তখন অন্যদিকে মোড় নেয়। সিপিসির সংগঠিত ঐক্যকে আরোপিত স্বৈরশাসন বলে অখ্যায়িত করতে থাকে। এই অপপ্রচারকে আমল দেয়নি কমিউনিস্ট পার্টি। মাও এর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনকে আশ্রয় করে, আরও বেশি গুরুত্ব দেয় অর্থনৈতিক বিকাশকে। পুঁজির মালিকানাকে স্তব্ধ করেননি মাও এর উত্তরাধিকারী জিং জিনপিং।সুদৃঢ় ব্যক্তিত্ব। সম্মেলিত নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিতে জানতেন। তাঁর আমালেই ১৯৮২ সালে, সিপিসির দ্বাদশ সম্মেলনে মতাদর্শগত অভিমুখ গৃহীত হয়, মাও দর্শনের অনুসারী নেতৃত্ব গ্রহন করে এমন একটি শাসন কাঠামো, যেখানে দল সমর্থিত প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের মূল্য সর্বোচ্চ এবং মুক্ত অর্থনীতি পরিত্যাজ্য নয়। জিনপিং ওই আদর্শকেই আরও সম্প্রসারিত করেছেন।
চিন তাঁর ঘরের খবর বাইরে বের করতে অভ্যস্ত নয়। নিয়মতান্ত্রিকতা মেনে চলে। নিয়মতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র একজিনিস নয়। সর্বোচ্চ নেতা দলের কঠোর কাঠামোকে কঠোরতর করে তোলর পাশাপাশি, দলীয় সমর্থন নিয়েই আর্থ সমাজিক অবস্থানে বরাবর সুদৃঢ়।গত দশ বছরের বর্হিমুখী কূটনীতি ও অর্থনীতিতে ব্যক্তিতন্ত্রের দৃষ্টান্ত কোথায় ? পশ্চিম জিনপিং এর ভূমিকায় স্বৈরতন্ত্রের পদধ্বনি শুনছে। এশিয়া দেখছে অন্যচোখে। ব্যক্তিপ্রতিভার বিকাশ ও ক্রমোত্থানে ঐতিহ্যের মূল্য নগণ্য নয়। ব্যক্তিপুঁজির বিকাশ আর সমাজিক বিত্ত একইপাতের খাদ্য হতে পারে না। ব্যক্তিপুঁজি নিজের অহং আর ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করে। অনেক সময় আত্মসর্বস্ব হয়ে ওঠে। সমাজিক পুঁজি সর্বস্তরে তাঁর প্রয়োগ নিয়ে চিন্তিত। দারিদ্র, অবক্ষয়কে সে যাদুঘরে পাঠাতে চায়। চিন আর আমেরিকার দারিদ্র সূচিতে চোখ বোলালেই ধরা পড়ে যায় সমুদ্রতুল্য্ পার্থক্য। চিনে না খেয়ে, বৈষ্যমের শিকার হয়ে অগণিত মৃত্যুর দৃষ্টান্ত বিরল। পার্টি নিয়ন্ত্রিত কন্ঠরোধ অবশ্যই আছে, যা ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখানে প্রেসিডেন্ট জিনপিং এর সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের তফাৎ নেই। সবাইকে পার্টির নিয়মতন্ত্রকে মান্যতা দিতে হয়। চিনের কমিউনিস্ট পার্টি এক শতক জুড়ে এ নিয়মে অভ্যস্ত। চিন এখনও বিশ্বাস করে, বন্দুকের নল নয়– জনগণই ক্ষমতার উৎস। এ উৎসের অন্যতম কান্ডারী জিনপিংকে সম্ভবত মাথায় ধরে রাখবে সিপিসি। গত দশবছরে তাঁর ক্ষমতাময় উত্তরণ বিস্ময়কর। শুরুতেই দুর্নীতি আর অর্থের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব এবং বিদেশনাতির পুনর্বিন্যাসের আরম্ভ। ধীরে ধীরে আরও শাণিত হয়ে ওঠে দল সমর্থিত ব্যক্তিক অবস্থান। বিদেশে স্বচ্ছ বিনিয়োগ, আর্থিক উন্নয়ণের সহযোগী এবং বহির্বাণিজ্যের সম্প্রসার তৈরি করে যে অভিমুখ, সেটাই চিনকে বিশ্বের দ্বিতীয় বড়ো অর্থশক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। এখানেই জিনপিং এর দক্ষতা সুস্থাপিত , এখানে তিনি ঐতিহ্যপ্রবণ আর আধুনিক চিনের অন্যতম স্থপতি। চিন তাঁকে ব্যক্তিপুজোর আসনে বসায়নি। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিপ্রতিভাকে মর্যাদা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আসন্ন পার্টি কংগ্রেস তাঁর নেতৃত্বের যোগ্যতাকে যথাযথ সম্মান জানাবে।
❤ Support Us







