- দে । শ
- এপ্রিল ২৭, ২০২৬
কোঙ্কনে ‘হাপুস’ বিপর্যয়: জলবায়ুর ছোবলে ৮০% ফলনহানির আশঙ্কা, আন্দোলনের পথে মহারাষ্ট্রের আমচাষিরা
গ্রীষ্ম মানেই আমজনতার অপেক্ষা, কখন পাওয়া যাবে সোনালি রঙের, মোলায়েম শাঁসের ‘হাপুস’ আম। এ বছর সে অপেক্ষার জন্য দুসংবাদ। এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রের কোঙ্কন অঞ্চলে আবহাওয়ার চরম প্রতিকূলতার কারণে আলফোনসো (হাপুস) আম উৎপাদনে প্রায় ৮০% পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আকস্মিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে আম ও কাজু চাষীরা চরম সংকটে পড়েছেন। নজিরবিহীন ফসলহানির মুখে পড়ে রত্নগিরি-সিন্ধুদুর্গর আমচাষিরা বলছেন, ‘এমন খারাপ বছর সারা জীবনে কখনো দেখিনি।’
এ বিপর্যয় কেবল কৃষির নয়, কোঙ্কনের সামগ্রিক অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। এক সময় এ এলাকা ‘মানি-অর্ডার অর্থনীতি’ হিসেবে পরিচিত ছিল। পুরুষেরা মুম্বইয়ে কাজ করে বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। নব্বইয়ের দশক থেকে বদলে যেতে শুরু করে পরিস্থিতি। ‘হাপুস’ আম আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আমের আন্তর্জাতিক বাজার, সঙ্গে মৎস্য, পর্যটন ও কাজুবাদাম চাষ— সব মিলিয়ে এ অঞ্চল হয়ে ওঠে কর্মসংস্থানের কেন্দ্র। অন্য রাজ্য ও নেপাল থেকে শ্রমিক এখানে কাজ করতে আসতে শুরু করেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা, দীর্ঘদিনের ভুল কৃষি পদ্ধতির ফলে উন্নয়নের ভিতেই ধরেছে ফাটল।
সিন্ধুদুর্গের দেবগড় তালুকার জামসান্দের চাষি ইন্দ্রনীল ঠাকুর জানিয়েছেন, ‘আগে ৫৫০টা গাছ থেকে যেখানে বছরে ৩-৪ হাজার বাক্স আম উঠত, সেখানে এ বছর ২০০ বাক্সও পাওয়া মুশকিল।’ তাঁর অভিযোগ, আমের স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়েছে। ফুল ধরার সময় তাপমাত্রা বেড়ে ২৯ ডিগ্রিতে পৌঁছনোয় বেশিরভাগ ফুলই ঝরে গিয়েছে। উল্টোদিকে ন্যূনতম তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় পরাগায়নকারী পোকামাকড় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। একই ছবি দেবগড়ের আর এক চাষি জয়বন্ত লাডের ক্ষেতেও। প্রায় ৪০০ গাছ থাকলেও এ বছর তাঁর ফলন নামতে পারে ১৫০ বাক্সে, গত বছরের এক হাজার বাক্স থেকে সরাসরি পতন। সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা, মরসুমের প্রথম দফার ফলন পুরোপুরি ব্যর্থ। ফেব্রুয়ারি-মার্চের সে আমই বাজারে সবচেয়ে বেশি দাম পেত।
তবে এ বিপর্যয় শুধু চাষের ক্ষেতেই আটকে নেই। পুরো সাপ্লাই চেনটাই ভেঙে পড়েছে। আম সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ থেকে পরিবহণ, সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়েছে। কম ফলনের কারণে পরিবহণে বোঝাই কম, অথচ জ্বালানি ও শ্রমিক খরচ বেড়েই চলেছে। তার উপর বাণিজ্যিক এলপিজি-র ঘাটতি নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। ‘হাপুস মাওয়া’র মতো বেশকিছু খাদ্যদ্রব্য পণ্য গ্যাস ছাড়া তৈরি করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা আমের দাম কমিয়ে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠছে।
আম চাষিদের একাংশ, বাগানে বাদরের আক্রমণ ও আশপাশের তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের দূষণকেও বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করছেন। আবার কেউ সমস্যার মূলে দেখছেন গবেষণার অভাব। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কাছ থেকে সঠিক সাহায্য না পাওয়া, অন্য ফসলের সার ও রাসায়নিক আমচাষিদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো অভিযোগও সামনে আসছে। কীটনাশকের ব্যবসাও সংকটে। এসব অঞ্চলে প্রায় ৬০ শতাংশ বিক্রি বাকিতে হয়, যা সাধারণত ফসল ওঠার পর শোধ করা হয়। কিন্তু এ বছরের পরিস্থিতিতে সে পাওনা আদায় নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
কোঙ্কনের আম-কাজু চাষিদের ক্রমবর্ধমান দুর্দশা হতাশা আর চাপা ক্ষোভের গণ্ডি পেরিয়ে আন্দোলনের চেহারা নিতে শুরু করেছে। যার প্রভাব পড়েছে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতেও। রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি হর্ষবর্ধন সাপকাল জানিয়েছেন, কৃষক নেতা রাজু শেট্টীর নেতৃত্বে চলমান আন্দোলনের পাশে সর্বোতভাবে থাকবে কংগ্রেস। একই সঙ্গে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন মহাযুতি সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগে তাঁর অভিযোগ, জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত চাষিদের প্রতি সরকার উদাসীন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা দিতে ব্যর্থ রাজ্য সরকার।সূত্রের খবর, মুম্বইয়ে সাপকালের সঙ্গে বৈঠক করেছেন রাজু শেট্টী। সেখানে প্রস্তাবিত আন্দোলনের রূপরেখা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। বৈঠকে শিবসেনা (ইউবিটি)-র নেতাদের উপস্থিতি বিরোধী শিবিরের বৃহত্তর ঐক্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
এদিন, চাষিদের আর্থিক সঙ্কটের যে ছবি রাজু তুলে ধরেছেন, তা ভীষণই উদ্বেগজনক। তিনি জানান, একটি আমগাছের
কলম-চারা রক্ষণাবেক্ষণে বছরে খরচ পড়ে প্রায় ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ টাকা। দৈনিক শ্রমিকের মজুরি প্রায় ৮০০ টাকা। অথচ ক্ষতিপূরণ বাবদ গাছপিছু মেলে মাত্র ২০০ টাকার কাছাকাছি, যা ‘অত্যন্ত অপ্রতুল’ বলেই মন্তব্য তাঁর। উপরন্তু, বীমা সংস্থাগুলির তরফে সময়মতো প্রাপ্য অর্থ না মেলায় সমস্যার গভীরতা আরও বাড়ছে। রাজ্য সরকারের তরফে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় দুর্যোগ ত্রাণ তহবিল থেকেও সাহায্য নিশ্চিত করতে হবে। দাবি পূরণে সরকার সাড়া না দিলে মুম্বইয়ের গিরগাঁও থেকে মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘বর্ষা’ পর্যন্ত বিশাল মিছিল সংগঠিত করা হবে। সেই আন্দোলনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যেই আগামী ১৮ এপ্রিল রত্নাগিরিতে কৃষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়েছে, যেখানে পরবর্তী কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে।
❤ Support Us






