- বৈষয়িক
- এপ্রিল ২৭, ২০২৬
ভারত-নিউজিল্যান্ডের মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত। হাজারো পণ্যে শুল্ক মাফ, তরুণদের কাজের সুযোগ বাড়বে!
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। অবশেষে স্বাক্ষরিত হলো ভারত-নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। সোমবার রাজধানীর ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ও নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মন্ত্রী টড ম্যাকক্লে আনুষ্ঠানিকভাবে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। প্রায় এক দশকের ওঠানামা পেরিয়ে, গত ডিসেম্বরে চূড়ান্ত হওয়া এ চুক্তি নতুন করে অর্থনৈতিক সম্পর্কের দরজা খুলে দিল দুই দেশের মধ্যে।
কেন্দ্রের বক্তব্য, এ চুক্তি কার্যকর হলে আগামী ৫ বছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। বর্তমানে যা প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। তবে কার্যকর হওয়ার আগে নিউজিল্যান্ডের সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে চুক্তিটিকে— ফরেন অ্যাফেয়ার্স, ডিফেন্স অ্যান্ড ট্রেড কমিটির পর্যালোচনা, জনমত গ্রহণ এবং ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট অ্যানালিসিস’-এর পর চূড়ান্ত অনুমোদন মিলবে।
এদিন, দ্বিপাক্ষিক এই চুক্তির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন একে আখ্যা দিয়েছেন ‘এক প্রজন্মে একবারের সুযোগ’ হিসেবে। তাঁর মতে, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে ভারতের উত্থান নিউজিল্যান্ডের রপ্তানিকারকদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। চুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। এটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিউজিল্যান্ড তাদের ৮,২৮৪টি ট্যারিফ লাইনের প্রতিটিতেই ভারতীয় পণ্যের জন্য শতভাগ শুল্ক প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থাৎ বস্ত্র, চামড়া, প্লাস্টিক, ওষুধ, যন্ত্রাংশ-সহ বহু ক্ষেত্রে ভারতীয় পণ্য এবার কোনো শুল্ক ছাড়াই পৌঁছে যাবে নিউজিল্যান্ডের বাজারে। আগে যেখানে ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপিত হতো, সেখানে এ চুক্তিতে ভারতীয় রপ্তানি এক ধাক্কায় অনেক বেশি এগিয়ে যাবে।
শুধু পণ্য বাণিজ্য নয়, পরিষেবা ক্ষেত্রেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে এটি। পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা, গবেষণা ও উন্নয়ন, পর্যটন— বহু ক্ষেত্রে সহযোগিতার নয়া দিগন্ত খুলছে। বিশেষ করে আইটি, আর্থিক পরিষেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রে ভারতীয় পেশাদারদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বছরে ৫,০০০ ভারতীয় পেশাদারের জন্য বিশেষ ভিসা এবং অতিরিক্ত ১,০০০ ‘ওয়ার্ক অ্যান্ড হলিডে’ ভিসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে ৩ বছরের জন্য নিউজিল্যান্ডে কাজ করার সুযোগ পাবেন বহু তরুণ। এমনকি যোগ প্রশিক্ষক, ভারতীয় রন্ধনশিল্পী বা সঙ্গীত শিক্ষকদের মতো পেশাতেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হবে।
সোমবার স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বার্তা পড়ে শোনান পীযূষ গোয়েল। সে বার্তায় এ চুক্তিকে প্রধানমন্ত্রী ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ বলে উল্লেখ করে বলেন, এটি শুধু অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নয়, বরং মূল্যবোধ, আস্থা ও অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। কৃষক, কারিগর, যুবসমাজ, উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, সব কিছুর জন্যই নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। নিজের বক্তব্যে পীযূষ গোয়েল জোর দিয়ে জানান, মাত্র ৯ মাসে কোনো চুক্তি সম্পন্ন হওয়া দু–দেশের পারস্পরিক আস্থা ও দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণের প্রমাণ। তাঁর মতে, ‘এটি উন্নত বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততার আরেকটি যুগান্তকারী ধাপ।’ তিনি আরও জানান, গত ৩ বছরে ভারতের সপ্তম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এটি এবং খুব শীঘ্রই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকার সঙ্গে আরও চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, টড ম্যাকক্লে এ চুক্তিকে নিউজিল্যান্ডের রপ্তানিকারকদের জন্য ‘অভূতপূর্ব সুযোগ’ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এর ফলে হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হবে ও ভারতীয় বাজারে নিউজিল্যান্ডের বিশ্বমানের পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে। পাশাপাশি, চলমান ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও মজবুত হবে, নতুন অংশীদারিত্বের সম্ভাবনাও বাড়বে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বড়ো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নিউজিল্যান্ড। আগামী ১৫ বছরে ভারতে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ বিনিয়োগ শিল্প, পরিকাঠামো, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নতুন গতি আনবে বলে মনে করছে কেন্দ্র সরকার। এমনকি চুক্তিতে একটি ‘রিব্যালান্সিং ক্লজ’ রাখা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগ বাস্তবায়নে কোনো ঘাটতি হলে তা পুনর্বিবেচনা করা যায়।
তবে সুযোগের সদ্ব্যবহারের পাশাপাশি সতর্কতাও বজায় রেখেছে ভারত। দুধ, কৃষি, চিনি, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ, ডাল, রত্ন ও অলঙ্কার, এধরনের একাধিক সংবেদনশীল ক্ষেত্রকে চুক্তির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, এর লক্ষ্য দেশীয় কৃষক ও উৎপাদকদের বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করা। যদিও নিউজিল্যান্ডের আপেল, কিউই বা মধুর মতো কিছু পণ্যে নির্দিষ্ট আমদানি বিধি প্রযোজ্য থাকবে। একই সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে, যেমন উল, কয়লা, কাঠ, সামুদ্রিক পণ্য যা দেশের উৎপাদনশীল শিল্পে কাঁচামালের জোগান সহজ করবে। ফলে একদিকে যেমন রপ্তানি বাড়বে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচও কমবে।
❤ Support Us








