- এই মুহূর্তে দে । শ
- এপ্রিল ২৭, ২০২৬
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিসি নির্বাচনে জয়ী বাম-স্বাধীন সংগঠনের নারী প্রতিনিধিরা
দীর্ঘ আন্দোলনের পর, রাজ্যের উচ্চ-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রথম অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি বা আইসিসি নির্বাচন হয়েছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সোমবার দুপুরে, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হতেই পুরনো দূর্গের, পুরনো রীতিই বজায় থাকল। আর ছাত্ররাজনীতির সমীকরণে মহিলা প্রতিনিধিদের জয়, আরও একবার তীব্রভাবে সামনে আনল লিঙ্গসাম্যের দাবিকে।
২ মাস আগেও এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে, সংগঠনগুলির দ্বন্দ্বে উত্তাল হয়েছিল যাদবপুর ক্যাম্পাস। আক্রান্ত হয়েছিলেন অধ্যাপকরাও। সে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ভাবে সম্পন্ন হওয়ায়, এটিকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য বলেই দেখছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।ফলাফলে, কলা বিভাগে নিজেদের প্রভাব অটুট রেখেছে এসএফআই। স্নাতকে সানিয়া ঘোষ এবং স্নাতকোত্তরে দিশা ঝা বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। বিজ্ঞান বিভাগে দুটি স্তরেই জয় পেয়েছে ‘উই দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ (ডব্লিউটিআই)। স্নাতক স্তরে নির্বাচিত হয়েছেন দীপশিখা কর রায়, স্নাতকোত্তরে জয়ী অদ্রিকা সাহা। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে জয়ী ডিএসএফ। স্নাতকে জয়ী মেহুলী সরকার, স্নাতকোত্তরে জয় পেয়েছেন খুরশিদা বানু (খুশি)।
কলা বিভাগের স্নাতক স্তরে মোট ১২২৯টি ভোটের মধ্যে ৮৫০টি পেয়েছে এসএফআই। লেফট অ্যালায়েন্স পেয়েছে ১৪৪, আফসা ১৩৮, ডিএসও ২৬, এবিভিপি ১৭ ভোট। নোটা ৫১ এবং বাতিল হয়েছে ৩টি ভোট। স্নাতকোত্তর স্তরে মোট ১০৯১ ভোটের মধ্যে এসএফআই পেয়েছে ৬৪১ ভোট। তৃণমূল পেয়েছে ৯৫, ডিএসও ৯৪, আফসা ৮১, লেফট অ্যালায়েন্স ৮০, আইএসইউ ২৬ এবং এবিভিপি ১৮ ভোট। নোটা পড়েছে ২৮টি, বাতিল ১৪।
বিজ্ঞান বিভাগে ছবিটা কিছুটা ভিন্ন। স্নাতক স্তরে মোট ৫৭৯ ভোটের মধ্যে ডব্লিউটিআই পেয়েছে ৩০৮ ভোট, এসএফআই ২২৮ এবং এইডিএসও ১৫ ভোট। নোটা ২৬, বাতিল ২। স্নাতকোত্তরে মোট ৩৯৯ ভোটের মধ্যে ডব্লিউটিআই এগিয়ে ২৬১ ভোট নিয়ে, এসএফআই পেয়েছে ১২৮ এবং এইডিএসও ১০। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে আবার অন্য সমীকরণ। স্নাতক স্তরে মোট ২৬৭৪ ভোটের মধ্যে ডিএসএফের ঝুলি সবচেয়ে ভারী—১৬৮৯ ভোট। এসএফআই পেয়েছে ৪২৩, এনএসএফ ২৩৯, এবিভিপি ১০০, টিএমসিপি ৩৯ ভোট। নোটা ১৩৯ এবং বাতিল ৪৫। স্নাতকোত্তর স্তরে ডিএসএফ পেয়েছে ২৬৭ ভোট, এসএফআই ১৭৪।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দফায় আয়োজিত হয়েছিল এই নির্বাচন। ৮ এপ্রিল কলা ও ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের দিবা ও সান্ধ্য শাখায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের পড়ুয়ারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। পরে ২১ এপ্রিল বিজ্ঞান বিভাগের পড়ুয়ারা একই প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। নির্ধারিত সময়সূচি মেনেই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে গবেষকদের নির্বাচন হয়েছিল আলাদা করে। তবে, এই শান্তিপূর্ণ ভোটের নেপথ্যে রয়েছে এক তিক্ত স্মৃতি। গত ফেব্রুয়ারিতে আইসিসি নির্বাচন ঘিরেই অশান্ত হয়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের এক অনুষ্ঠান শেষে সায়েন্স-আর্টস মোড়ের কাছে ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে জখম হন দুই অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিংহ এবং ললিত মাধব। পরে তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সতর্কতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরের একাংশের মতে, ২ দিন ধরে নির্বিঘ্নে ভোটপর্ব সম্পন্ন করাটাই ছিল অরবিন্দ ভবনের কাছে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ভোট মিটে যাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে ক্যাম্পাসে।
প্রসঙ্গত, আইসিসি-র কাঠামো অনুযায়ী বিজ্ঞান, কলা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, এই ৩ বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে একজন করে প্রতিনিধি থাকেন, মোট ৬ জন। এর পাশাপাশি একজন পিএইচডি গবেষক প্রতিনিধি থাকেন, যিনি আগেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। সোমবারের ফল ঘোষণার মাধ্যমে বাকি ৬ জন নির্বাচিত হওয়ায় কমিটির পূর্ণাঙ্গ গঠন সম্পন্ন হলো। তবে নির্বাচন ঘোষণার আগে থেকেই আইসিসি-র কাঠামো ও কর্মপদ্ধতিতে বেশ কিছু পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছিল এসএফআই, ডিএসএফ (আর্টস), তৃণমূল ছাত্র পরিষদের মতো সংঠনগুলি।
উল্লেখ্য, আইসিসি বা ইন্টারনাল কমপ্লেন্টস কমিটি বা অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি দেশের প্রায় প্রতিটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-কর্মক্ষেত্রে বহুচর্চিত একটি বিষয়। যৌন, শারিরীক-মানসিক হয়রানির অভিযোগ গ্রহণ, তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াই এই কমিটির প্রধান কাজ। কেন্দ্রীয় আইনের আওতায় বাধ্যতামূলক এই কমিটি এখন প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপরিহার্য অঙ্গ। কোনো ছাত্রী বা কর্মী যদি যৌন হেনস্তার শিকার হন, তাঁর প্রথম আশ্রয় এটি। অভিযোগ শোনার পাশাপাশি সাক্ষ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে সুপারিশ পেশ করাই আইসিসি-র কাজ। পাশাপাশি সাংবিধানিক লিঙ্গসাম্যের অধিকার, বৈষম্য রোধ, সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির মতো কাজ করে এটি। ফলে, এটি কেবল প্রশাসনিক কাঠামো নয়, বরং নিরাপদ ও সমানাধিকারের পরিবেশ নিশ্চিত করার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোয় সাধারণত শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মী, পড়ুয়া প্রতিনিধি এবং বাইরের বিশেষজ্ঞ, সব পক্ষের উপস্থিতিতেই গড়ে ওঠে এই কমিটি।
❤ Support Us







