- এই মুহূর্তে স | হ | জ | পা | ঠ
- এপ্রিল ২৭, ২০২৬
হিমালয়ে দু-দশকের সর্বোচ্চ তুষার ঘাটতি, জলসংকটের আশঙ্কায় ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ
হিমালয়ের মাথায় জমে থাকা তুষারে দু-দশকের সর্বোচ্চ তুষার ঘাটতি। এর অভিঘাত পৌঁছতে পারে বিস্তৃত সমতলের প্রতিটি জীবনে। সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই গভীর উদ্বেগের ছবি, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে এ বছরের শীতে তুষারের স্থায়িত্ব নেমে এসেছে গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে। গড়ের তুলনায় প্রায় ২৭ থেকে ২৮ শতাংশ কমেছে তুষারের উপস্থিতি। যার জেরে আগামী দিনে নদীর জলপ্রবাহ, কৃষি, পানীয় জল; প্রায় সব ক্ষেত্রেই তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কাঠমাণ্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘আইসিআইএমওডি’-এর তরফে প্রকাশিত ‘হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের তুষার পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন ২০২৬’ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়কালে হিন্দুকুশ-হিমালয় জুড়ে তুষারের স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ‘স্নো পারসিস্টেন্স’ বা তুষারের স্থায়িত্ব বলতে বোঝায় তুষারপাতের পর সেই তুষার কতদিন মাটিতে টিকে থাকে। এ সূচকই আসলে পাহাড়ি অঞ্চলের শীতকালীন ‘স্বাস্থ্য’ নির্ণয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। আর সূচকেই যখন এমন বিপুল পতন, তখন তা নিছক মৌসুমী ওঠানামা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আশঙ্কার সংকেত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হিমালয়কে ‘এশিয়ার জলের টাওয়ার’ বলা হয়। এখানকার তুষার ও হিমবাহ এক বিশাল প্রাকৃতিক জলাধার। শীতকালে জমে থাকা তুষার ধীরে ধীরে গলে গ্রীষ্মকালে নদীগুলিকে জল জোগায়। এ প্রক্রিয়া এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, হিন্দুকুশ-হিমালয় থেকে উৎসারিত ১২টি প্রধান নদী অববাহিকার মোট বার্ষিক জলপ্রবাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশই নির্ভর করে তুষার গলনের উপর। ফলে তুষারের ঘাটতি মানেই নদীর জলের ঘাটতি, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষি, পানীয় জল সরবরাহ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপর। বরফগলা জলে পুষ্ট নদীগুলির বিস্তার বিশাল—আফগানিস্তানের কাবুল থেকে ভারতের কলকাতা, আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু অঞ্চল পর্যন্ত এর প্রভাব ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে হিমালয়ের শীর্ষে যে পরিবর্তন ঘটছে, তার ঢেউ এসে লাগবে সমতলের শহর ও গ্রামজীবনে।
তবে এহেন তুষারহ্রাস সর্বত্র সমান নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেকং নদী অববাহিকায় তুষারের ঘাটতি সবচেয়ে তীব্র, গড়ের তুলনায় ৫৯.৫ শতাংশ কম। তিব্বতি মালভূমিতে ঘাটতি ৪৭.৪ শতাংশ। হলুদ নদী, আমু দরিয়া এবং সালউইন অববাহিকাতেও তুষারের উল্লেখযোগ্য পতন লক্ষ্য করা গেছে। এই অসম বণ্টন ভবিষ্যতের জলপ্রবাহে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে আপাতত কিছুটা স্বস্তির খবর মিলেছে গঙ্গা অববাহিকায়। গত শীতে তুষারের স্থায়িত্ব গড়ের তুলনায় ১৬.৩ শতাংশ বেশি। একইভাবে ইরাবতী অববাহিকাতেও গড়ের চেয়ে বেশি তুষার রেকর্ড করা হয়েছে, ২১ শতাংশেরও বেশি। তবে গবেষকদের মতে, এই আংশিক স্বস্তি বৃহত্তর সংকটকে ঢাকতে পারে না। কারণ, এই পরিস্থিতি শুধু এক বছরের ব্যতিক্রম নয়। এ নিয়ে টানা চতুর্থ বছর হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে তুষারের পরিমাণ স্বাভাবিকের নিচে রয়েছে। ২০০৩ সালের পর থেকে অন্তত ১৪টি শীতে একই ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। তার উপর, ২০২৫ সালে যেখানে তুষারের ঘাটতি ছিল ২৩.৬ শতাংশ, সেখানে ২০২৬ সালে তা আরও বেড়ে ২৭ শতাংশেরও বেশি হয়েছে, যা ক্রমাগত অবনতির দিকেই ইঙ্গিত করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা, হিমবাহের দ্রুত গলন। আইসিআইএমওডি-এর আগের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের তুলনায় এখন হিমবাহ গলার হার প্রায় দ্বিগুণ। গত ৫০ বছরে হিমালয় অঞ্চলে বরফের স্তর প্রায় ছয়তলা বাড়ির উচ্চতার সমান কমে গেছে। শুধু তাই নয়, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিমবাহ সঙ্কোচনের হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করছে। এমত অবস্থায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে গ্রীষ্মের শুরুর সময়কে ঘিরে। ওই সময় তুষার গলনের জলই নদীগুলির প্রধান ভরসা। কিন্তু তুষার কম থাকলে সে জোগানও কমে যাবে। ফলে নদীর প্রবাহ কমে যেতে পারে, বিশেষ করে বসন্তে বৃষ্টিপাত যদি স্বাভাবিকের নিচে থাকে। এর ফলশ্রুতিতে বাড়তে পারে ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরতা, যা দীর্ঘমেয়াদে জলস্তর হ্রাসের ঝুঁকি বাড়াবে।
গবেষণা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, ‘ঋতুভিত্তিক তুষারের এমন ধারাবাহিক হ্রাস নদীর প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিতে পারে, যা পরোক্ষভাবে খরা পরিস্থিতি তৈরি করবে এবং জলসম্পদের উপর চাপ বাড়াবে।’ বিশেষ করে নিম্ন অববাহিকার বাসিন্দাদের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, তাঁদের জলপ্রাপ্তি অনেকাংশেই নির্ভর করে উজানের তুষার গলনের উপর। সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় গবেষকরা অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপের উপর জোর দিচ্ছেন। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ঋতুভিত্তিক জল সংরক্ষণ বৃদ্ধি, কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতের মধ্যে সমন্বয় সাধন, এসবই এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে আমু দরিয়া, হেলমান্দ, সিন্ধু ও তারিমের মতো তুষারনির্ভর পশ্চিমাঞ্চলীয় অববাহিকাগুলিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলকে ‘তৃতীয় মেরু’ও বলা হয়, ৮টি দেশে বিস্তৃত একটি বিশাল উচ্চভূমি অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার। এখানে রয়েছে ৬০ হাজারেরও বেশি হিমবাহ এবং প্রায় ৬,০০০ ঘন কিলোমিটার বরফের ভাণ্ডার। আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিকার বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো বরফ ও তুষারের আধার এ অঞ্চলই। এখান থেকেই উৎপন্ন হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবনধারণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা ১০টিরও বেশি প্রধান নদী। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলে জল ব্যবস্থাপনা এখনো সমতলভূমির তুলনায় অনেক দুর্বল। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে হিমবাহ দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের জলনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে। ফলে, হিমালয়ের তুষারহ্রাস আর নিছক পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং বৃহত্তর মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটেরই পূর্বাভাস।
❤ Support Us






