- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ২৫, ২০২৬
‘রাজ্য প্রজাপতি’ বেছে নিতে দেশে প্রথম গণভোট! পরিবেশ সচেতনতায় বিরল দৃষ্টান্ত
গণতান্ত্রিক ভারতে রাজনীতির নানান ক্ষেত্রে নিয়মমাফিক ভোট হয়। কখনো কখনো সরকার বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে, প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনমতের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে ‘রেফারেন্ডাম’ বা গণভোটের নজিরও কম নয়। কিন্তু পরিবেশ সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে, আমজনতার মতামত সরকারের তরফে ভোট করানোর দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। এবার সে পথে পা বাড়াল ছত্তীশগড়। রাজ্যের প্রথম ‘রাজ্য প্রজাপতি’ নির্বাচনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করেছে মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাইয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার। রাজ্যের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রতীক হিসেবে একটি প্রজাপতি প্রজাতিকে স্বীকৃতি দিতে এ বার সরাসরি জনমতের উপরই ভরসা করছে সে রাজ্যের বন ও জলবায়ু পরিবর্তন দফতর। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইন ভোটের মাধ্যমে রাজ্যের বাসিন্দারা তাঁদের পছন্দের প্রজাপতির পক্ষে মত জানাতে পারবেন। জনমত ও বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে ছত্তীশগড়ের প্রথম সরকারি ‘স্টেট বাটারফ্লাই’।
রাজ্যের বনদফতরের দাবি, এ কর্মসূচির লক্ষ্য কেবল একটি নতুন রাজ্য-প্রতীক নির্বাচন নয়, তার থেকেও বড়ো উদ্দেশ্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রজাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরাগবাহীদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। সরকারের মতে, পরিবেশ রক্ষার লড়াই তখনই সফল হবে, যখন সাধারণ মানুষ নিজেদের অংশীদার বলে মনে করবেন। এ কর্মসূচির সূচনা করে বনমন্ত্রী কেদার কাশ্যপ বলেন, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের সমান দায়িত্ব। তাঁর মতে, ‘জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে যদি রাজ্যের প্রাকৃতিক প্রতীক নির্বাচন করা যায়, তবে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে মানুষের আগ্রহ এবং দায়বদ্ধতা দু-ই বাড়বে।’
জানা যাচ্ছে, এই প্রজাপতি নির্বাচনের জন্য ছত্তীশগড়ের বন দফতর একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিল। সে কমিটি বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত নানা মানদণ্ড বিচার করে তিনটি প্রজাপতি প্রজাতিকে চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে ‘কমন ব্যান্ডেড পিকক’— এটি ‘সোয়ালোটেল’ গোত্রের আকর্ষণীয় প্রজাপতি। কালো ডানার উপর সবুজাভ-নীল বা ফিরোজা রঙের ‘ব্যান্ড’ ও লালচে দাগ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। পশ্চিমঘাট, মধ্য ভারত ও কিছু বনাঞ্চলে দেখা যায়। ‘অরেঞ্জ ওকলিফ’— পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর ‘ছদ্মবেশী’ প্রজাপতি। ডানা মেলে ধরলে উজ্জ্বল কমলা, নীল ও কালো রঙের নকশা দেখা যায়। কিন্তু ডানা বন্ধ করলেই দেখতে একেবারে শুকনো পাতার মতো লাগে, যা শিকারিদের চোখ এড়াতে সাহায্য করে। ভারতের বিভিন্ন বনাঞ্চল, বিশেষ করে পূর্ব ও মধ্য ভারতের জঙ্গলে পাওয়া যায়। ‘স্পট সোর্ডটেল’— সাদা বা হালকা হলুদ পটভূমিতে কালো ছোপছোপ নকশা এবং পিছনের ডানায় তলোয়ারের মতো লম্বা লেজ এর বৈশিষ্ট্য। দ্রুত উড়তে পারে এবং ফুলের মধু সংগ্রহে দক্ষ।
বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রজাপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কেবল সৌন্দর্য নয়, একাধিক বৈজ্ঞানিক বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে রাজ্যের সংশ্লিষ্ট প্রজাতির উপস্থিতি, পরিবেশগত গুরুত্ব, সংরক্ষণমূল্য, স্বাতন্ত্র্য, সহজে শনাক্ত করার সুবিধা আর সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা। সব দিক বিচার করেই বিশেষজ্ঞরা তিনটি প্রজাতিকে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান দিয়েছেন। ইতিমধ্যেই, ছত্তীগড়ের বন ও জলবায়ু পরিবর্তন দফতর একটি গুগল ফর্ম-ভিত্তিক অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থা চালু করেছে। রাজ্যের বাসিন্দারা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এ ভোটে অংশ নিতে পারবেন। ভোটগ্রহণ পর্ব শেষ হলে জনমতের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হবে। সে সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশও বিবেচনায় রাখা হবে। দুইয়ের সমন্বয়ে চূড়ান্ত প্রস্তাব তৈরি করে সরকার রাজ্যের প্রথম সরকারি প্রজাপতি ঘোষণা করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করবে।
সরকারের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন রাজ্য ও দেশে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের প্রতীক হিসেবে নির্দিষ্ট প্রাণী, পাখি বা উদ্ভিদকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তার ফলে সংশ্লিষ্ট প্রজাতির সংরক্ষণে জনসচেতনতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনই পরিবেশ শিক্ষার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে ভাবনাকেই সামনে রেখে ছত্তীশগড়ও এ বার নিজস্ব রাজ্য প্রজাপতি নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য রাজ্যের নাগরিকদের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রী, গবেষক, শিক্ষক, প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিও বিশেষ আবেদন জানিয়েছে বন দফতর। একই সঙ্গে যত বেশি সম্ভব মানুষকে ভোটদানে উৎসাহিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে ব্যাপক জনঅংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজ্যের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক নির্বাচিত হয়।
প্রসংগত, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ইতিমধ্যেই রাজ্য প্রজাপতি ঘোষণা করা হয়েছে। মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, তামিলনাড়ু, গোয়া, সিকিম, কেরালা, জম্ম-কাশ্মীড়, ত্রিপুরা, অরুণাচল প্রদেশ-সহ একাধিক রাজ্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের ভিত্তিতে তাদের রাজ্য প্রজাপতি নির্বাচন করেছে। কিন্তু সে সব ক্ষেত্রে জনসাধারণের ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা ছিল না। এ প্রেক্ষাপটে ছত্তীশগড়ের নয়া উদ্যোগ তাঈ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে একমাত্র কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল চণ্ডীগড় ২০২৫ সালে একই ধরনের জনভোটের আয়োজন করেছিল। সেখানে চারটি প্রজাতির মধ্যে ভোটাভুটির পর ‘স্ট্রাইপড টাইগার’-কে রাজ্য প্রজাপতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে কোনো পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগের নজির নেই।
❤ Support Us







