Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৫

জলপাইগুড়ির এবিপিসি ময়দানে মুখ্যমন্ত্রীর জনসভা: নিরাপত্তা, উন্নয়ন, পুনর্বাসন এবং রাজনৈতিক কৌশলের বার্তা। ভাষা ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে কেন্দ্রকে কটাক্ষ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জলপাইগুড়ির এবিপিসি ময়দানে মুখ্যমন্ত্রীর জনসভা: নিরাপত্তা, উন্নয়ন, পুনর্বাসন এবং রাজনৈতিক কৌশলের বার্তা। ভাষা ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে কেন্দ্রকে কটাক্ষ

জলপাইগুড়ির এবিপিসি ময়দানে, গরম ঝকঝকে সকাল থেকে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়ে মুখর। চাতক দৃষ্টির আকাঙ্কা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যথাসময়ে তিনি এলেন। জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ফের একবার স্পষ্ট বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—উন্নয়ন থেমে নেই, মানুষের পাশে আছে সরকার, আর বাংলা চালাবে বাংলা, দিল্লি নয়। জলপাইগুড়ির এবিপিসি ময়দানে আয়োজিত সরকারি সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন একগুচ্ছ প্রকল্প, তুলে দিলেন সহায়তার হাত, আর একই মঞ্চ থেকে কেন্দ্রের দিকে ছুঁড়ে দিলেন রাজনৈতিক তির।

বিশাল এ কর্মসূচির মূল আঙ্গিক ছিল সরকারি সহায়তা প্রদান। মুখ্যমন্ত্রী জানান, উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার ১১,৬০০ পরিবারের হাতে জমির পাট্টা তুলে দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গেও ইতিমধ্যেই ৭ হাজারের বেশি জমির পাট্টা বিলি হয়েছে। মালবাজারে সিকিমের জলোচ্ছ্বাসে ঘর হারা ৯৮টি পরিবারকেও দেওয়া হয় পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি। মঞ্চ থেকেই প্রায় ৪০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ১ লক্ষ ৫৫ হাজার উপভোক্তার হাতে সরকারি পরিষেবাও তুলে দেওয়া হয়। চা বাগান শ্রমিকদের সুরক্ষা নিয়ে সোজাসাপটা বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। জানান, এ বছর চা বাগানে ২০ শতাংশ বোনাস ঘোষণা হয়েছে এবং সে প্রক্রিয়ার উপর রাজ্যের মুখ্যসচিব সরাসরি নজর রাখবেন। সতর্কবার্তায় তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের প্রাপ্য টাকা নিয়ে দুর্নীতি করলে কাউকে রেয়াত করা হবে না।’ পাশাপাশি, জলপাইগুড়ি পুরসভার জন্য ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি পানীয় জল প্রকল্পের ঘোষণা করেন তিনি। জানান, ‘উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এটি। এবার সে দাবি পূরণ হবে।’

শুধু উন্নয়ন প্রকল্প ঘোষণা নয়, একইসঙ্গে রাজ্যের স্বার্থে একের পর এক কৌশলগত রাজনৈতিক বার্তাও তুলে ধরলেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এলো সরকারি সহায়তা, পুনর্বাসন, প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে সরকারের ভূমিকা এবং কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল কটাক্ষ। দিল্লির বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সুরে মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘বাংলা নিজের মতো চলবে। দিল্লি থেকে এসে বাংলা চালানোর চেষ্টা বরদাস্ত করব না।’ অসম থেকে বাঙালিদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের পাঠানো নোটিশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মমতা। ভাষা-রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব হইয়ে সোচ্চারে বলেন, ‘আমরা মাতৃভাষায় কথা বলব, অন্য ভাষাও শিখব। কিন্তু বাংলাকে অসম্মান করতে দেব না।’ জাতপাতভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধেও কড়া ভাষায় বার্তা দেন দলনেত্রী। বলেন, ‘যারা জাতপাত নিয়ে রাজনীতি করে, তারা দেশের নেতা হতে পারে না। গান্ধীজি, নেতাজি, আম্বেদকর—এই মানুষরাই দেশের প্রকৃত নেতা।’

ভিনরাজ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের উপর নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, ‘আমরা ২৪ হাজার পরিযায়ী পরিবারকে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছি। অথচ বাংলায় থাকা ১.৫ কোটি বাইরের রাজ্যের মানুষকে কেন্দ্র কিছু বলে না, কিন্তু বাংলার পরিযায়ী ভাইবোনদের উপরে অত্যাচার করে।’ এনআরসি ও সিএএ রুখে দেওয়ার বার্তাও ছিল তাঁর দৃঢ় কণ্ঠে। বিজেপিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘ভোট এলেই ওরা এনআরসি ক্যা ক্যা করবে। এসব আর বাংলায় চলবে না।’ নেপালের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, তিনি সারা রাত উত্তরকন্যায় ছিলেন পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে। আশ্বাস দেন, ‘যদি কিছু ঘটে, আমরাই আপনাদের রক্ষা করব, চিন্তা নেই। ’নেপালে আটকে পড়া বাঙালি পর্যটকদের উদ্দেশে বলেন, ‘তাড়াহুড়ো করবেন না, আমরা আপনাদের ফেরানোর ব্যবস্থা করছি।’ অন্যদিকে, রাজ্যপাল ড. সিভি আনন্দ বোস ভারত-নেপাল সীমান্তের পানিতানকি পরিদর্শনে যান। বলেন, ‘মানুষের সমস্যার কথা বুঝে তা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে জানাব।’ এসএসবি-র ভূমিকাও এদিন প্রশংসিত হয়, রাজ্যপাল জানান, ‘বিগত বছরে শতাধিক অনুপ্রবেশকারীকে গ্রেফতার করেছে।’

জলপাইগুড়ির সভামঞ্চ থেকে বর্ষা ও বন্যার সময় জল সমস্যা নিয়ে রাজ্যের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, দক্ষিণবঙ্গে ডিভিসি এবং উত্তরবঙ্গে ভুটান যখন খুশি জল ছাড়ে, যার ফলে রাজ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ওরা জল ছাড়বে আর আমরা ডুবব—এভাবে চলতে পারে না।‘ সমাধানের পথ হিসেবে তিনি ইন্দো-ভুটান রিভার কমিশনে পশ্চিমবঙ্গকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কেন্দ্রকে দাবি জানিয়েছেন তিনি। ভাষণে, শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ৩৫ হাজার শূন্য পদের জন্য বিজ্ঞাপন ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে এবং আরো ২১ হাজার পদের প্রক্রিয়া চলমান। কিন্তু পিআইএল করে সব বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘আমি তো চাকরি দিতে চাই, তাহলে বাধা কেন?’

বিহারে ‘এসআইআর’ হয়েছে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলাতেও সে পথে হাঁটতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। সভা থেকে উপস্থিত জনতাকে আধার কার্ড ও ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিষয়ে সতর্ক করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘যাদের আধার নেই, তাঁরা দুয়ারে সরকার শিবিরে গিয়ে অবিলম্বে আধার করান। ভোটার তালিকায় নাম আছে কি না ৬-৭ মাসের মধ্যে দেখে নিন। না হলে এনআরসি করতে পারে।’ এ বক্তব্যে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকার বার্তা ছিল স্পষ্ট। পর্যটন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৪ সালে রাজ্যে ১৯ কোটি পর্যটক এসেছেন। তিনি দাবি করেছেন, যেখানে আজ গোটা বিশ্ব অশান্তির মধ্যে রয়েছে, উল্টোদিকে বাংলা নিরন্তর শান্তির ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। শান্তির এ বার্তা রক্ষা করাই সরকারের লক্ষ্য। তিনি জানান, দুর্গা অঙ্গন গড়ে তোলা হবে জগন্নাথ ধামের আদলে, যা পর্যটনের দিক থেকেও এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্বে মুখ্যমন্ত্রীর উত্তরবঙ্গ সফর বহুমাত্রিক। নিছক সরকারি প্রকল্প ঘোষণা বা উন্নয়ন কর্মসূচি নয়, বরং এক কৌশলগত রাজনৈতিক বার্তাবহ। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের এক সজীব প্রমাণ। একদিকে পুনর্বাসন, অন্যদিকে প্রতিবাদ—এই দুইয়ের মিশেলে উঠে রাজনৈতিক কৌশলগত বার্তা—‘জনগণের পাশে সরকার আছে, আর রাজ্যের স্বার্থে কোনো আপস নয়।’


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!