- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ১৪, ২০২৫
‘সশস্ত্র সংগ্রাম ভুল ছিল’— ৬০ জন সঙ্গীকে নিয়ে আত্মসমর্পণ কিষেণজির ভাই, শীর্ষ মাওবাদী নেতা বেণুগোপালের
ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় পলিটব্যুরোর অন্যতম প্রধান সদস্য, মল্লোজুলা বেণুগোপাল রাও ওরফে ‘সোনু’ সোমবার গভীর রাতে মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করলেন। সঙ্গে ছিলেন ৬০ জন মাওবাদী ক্যাডার। নিহত মাওবাদী শীর্ষনেতা কিষেণজির ভাই বেণুগোপাল বহু দশকের লড়াইয়ের পর অস্ত্র ছাড়লেন— এই ঘটনায় মাওবাদী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর, পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলে কিষেণজির মৃত্যুর পর মাওবাদী নেতৃত্বের বড়ো অংশের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বেণুগোপাল। সেই থেকেই ছিলেন দলের সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলের অন্যতম মুখ। তার সেই দীর্ঘ যুদ্ধের জীবন থেকে বিদায় এখন দেশের মাওবাদ বিরোধী লড়াইয়ে এক যুগান্তকারী মোড়।
আকস্মিক আত্মসমর্পণ নয়, গত এক বছর ধরেই এমন সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিয়ে চলেছেন বেণুগোপাল। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব যায় তাঁর নামেই। তার পরেই হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত এক পলিটব্যুরো বৈঠকে অস্ত্রবিরতি ও আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরে একটি প্রেস বিবৃতিতে তিনি লেখেন, ‘দলকে বাঁচাতে সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধ করার সময় এসেছে।’ বিভিন্ন মহলে তখন থেকেই গুঞ্জন চলছিল, ‘সোনু’ খুব শীঘ্রই মূল স্রোতে ফিরে আসবেন। সোমবার রাতের ঘটনা সমস্ত জল্পনাকে বাস্তবতার রূপ দিল।
বয়সে সত্তরের কোঠায় পৌঁছে যাওয়া বেণুগোপাল ওরফে রাজন ওরফে ভূপতি ওরফে ‘সোনু’, আদর্শগতভাবে মাওবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পিপল্স ওয়ার গ্রুপে যোগ দিয়েছিলেন আশির দশকে। ২০১০ সালে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব নেন। কিষেণজির মৃত্যুর পর ছত্তিশগঢ়, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং মহারাষ্ট্রে মাওবাদী অভিযানের দায়িত্ব পড়ে তাঁর উপর। সংগঠনের অভ্যন্তরে প্রভাবশালী মুখ হিসেবে পরিচিত এই নেতার আত্মসমর্পণ নিছকই একটি প্রশাসনিক সাফল্য নয়— বরং আদর্শগত ভাবে দলের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। তাঁর আত্মসমর্পণের ঠিক ১০ মাস আগে নিরাপত্তাবাহিনীর চাপে অস্ত্র নামান তাঁর স্ত্রী বিমলা চন্দ সিদাম ওরফে তারাক্কা। দণ্ডকারণ্যের জ়োনাল কমিটির নেত্রী এবং পিএলজিএ-এর কমান্ডার হিসেবে তিনিও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ পদে। তখনই ধারণা করা গিয়েছিল, বেণুগোপালের মনোভাবেও পরিবর্তন এসেছে। সেপ্টেম্বরে প্রকাশ্যে আসা এক চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘আমি কমরেডদের বলেছি, নিজেদের রক্ষা করুন। নিঃসার আত্মবলিদান করে কোনো বিপ্লব হয় না। বারবার নেতৃত্বের ভুল আমাদের এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে।’ এ চিঠি মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে মাওপন্থীদের মধ্যে। কেউ বলেন, তিনি ‘বিশ্বাসঘাতক’, কেউ আবার তাঁর বক্তব্যে ভবিষ্যতের শান্তির আলো দেখতে পান।
বিগত কয়েক মাস ধরে একের পর এক সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন মাওবাদী শীর্ষনেতারা— সাধারণ সম্পাদক বাসবরাজু, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বিবেক, প্রমুখ। একাধিক জেলায় টানা যৌথ অভিযান চালিয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন, ২০২৬ নয়, ২০২৫-এর ৩১ মার্চের মধ্যেই দেশকে ‘মাওবাদীমুক্ত’ করতে হবে। বেণুগোপালের আত্মসমর্পণ সেই প্রক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, মাওবাদী দলের উত্তর ও পশ্চিম সাব-জোনাল ব্যুরোর অনেকে তাঁর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে এবং মূল স্রোতে ফেরার আগ্রহ দেখিয়েছে।
গড়চিরোলিতে যখন শান্তির বার্তা, তখন ছত্তিশগঢ়ের বিজাপুরে ফের রক্তাক্ত করল মাওবাদীরা। সোমবার রাতে এলমিডি এলাকায় মাওবাদীদের হাতে খুন হয়েছেন স্থানীয় বিজেপি কর্মীরা সত্যম পুনেম। পুলিশ জানিয়েছে, বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর করে তাঁকে হত্যা করা হয়। মৃতদেহের পাশে পাওয়া গিয়েছে মাওবাদীদের লেখা একটি হাতে লেখা পোস্টার। তাতে লেখা— ‘পুলিশের চরবৃত্তি করছিল পুনেম। একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। কর্ণপাত না করায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল।’ মাডেড এরিয়া কমিটি-র নামে ওই পোস্টার ছড়িয়েছে এলাকায় আতঙ্কের বাতাবরণ। এ নিয়ে চলতি বছরেই বস্তারের ৭টি জেলায় মাওবাদী হামলায় মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৪০ জনের। গত দুই বছরে একাধিক বিজেপি নেতা ও কর্মী খুন হয়েছেন। বিজাপুরের বিজেপির প্রাক্তন মণ্ডল সাধারণ সম্পাদক বীরজু তরামও প্রাণ হারিয়েছিলেন একইভাবে। বিজেপির অভিযোগ, তারা বারবার নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে, কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ করা হয়নি। মাওবাদীদের ‘চরবৃত্তি’র অজুহাতে একের পর এক রাজনৈতিক হত্যা এখন দক্ষিণ বস্তার জুড়ে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।
❤ Support Us







