- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ২৬, ২০২৬
মঙ্গলাহাটে ফুটপাতের দোকানে নবান্নের নিষেধাজ্ঞা, রুজি-রুটি হারানোর আশঙ্কায় ক্ষোভে ফুঁসছেন ব্যবসায়ীরা
হাওড়ার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলাহাট ঘিরে তীব্র উদ্বেগ। প্রশাসনের নির্দেশে মঙ্গলবার থেকে মঙ্গলাহাট চত্বরে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে আর ব্যবসা করা যাবে না— সোমবার হাওড়া থানায় ডেকে ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের এমনটাই জানিয়ে দিয়েছে হাওড়া সিটি পুলিশ। নবান্নের তরফে এ নির্দেশ এসেছে বলে দাবি পুলিশের। আর এই ঘোষণার পর থেকেই কার্যত চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বস্ত্রবাজারকে কেন্দ্র করে। কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কপালে চিন্তার ভাঁজ। পুনর্বাসনের কোনো আশ্বাস না মেলায় ক্ষোভও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।
মঙ্গলবার ভোর থেকেই মঙ্গলাহাটে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা নিয়ে রাত থেকেই উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে ব্যবসায়ী মহলে। ব্যবসায়ীদের একাংশের বক্তব্য, রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ কার্যত মঙ্গলাহাটের বৃহৎ অংশকেই তুলে দেওয়া। কারণ, হাটের মূল প্রাণই হলো অস্থায়ী দোকানপাট, যেগুলি সপ্তাহে ২ দিন গভীর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত বসে। বহু ছোটো ব্যবসায়ী, যাঁদের স্থায়ী দোকান বা বিল্ডিংয়ের ভিতরে জায়গা নেই, তাঁরাই ফুটপাত ও রাস্তার ধারে পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করেন। তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন বড়ো প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হাওড়া ময়দান সংলগ্ন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় আর কোনো ভাবেই ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। হাওড়া পুরসভা, জেলাশাসকের দফতর, জেলা হাসপাতাল, আদালত, এসডিও অফিস ও থানার সামনে দীর্ঘদিন ধরেই মঙ্গলাহাটের ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছিল। মহাত্মা গান্ধী রোড, ঋষি বঙ্কিম সরণি, নিত্যধন মুখার্জি রোড, চার্চ রোড— সব ক–টি এলাকাতেই ফুটপাত ও রাস্তার উপর অস্থায়ী দোকান বসত। প্রশাসনের বক্তব্য, এর ফলে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছিল। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছিল। সে কারণেই এবার কড়া পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত।
শুধু রাস্তার উপর দোকান বসানোই নয়, দিনের ব্যস্ত সময়ে মঙ্গলাহাটের বিল্ডিংগুলি থেকে মাল নামানো বা রাস্তার উপর মালপত্র ফেলে রাখার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে বলে খবর। প্রশাসনের যুক্তি, সরকারি দফতর, আদালত ও হাসপাতাল ঘেরা এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছিল। আদালতগামী মানুষ থেকে শুরু করে রোগী পরিবহণ— সব ক্ষেত্রেই সমস্যা বাড়ছিল। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি একেবারেই ভিন্ন। তাঁদের বক্তব্য, সপ্তাহে মাত্র ২ দিন বসে মঙ্গলাহাট। রবিবার গভীর রাত থেকে দোকান সাজানো শুরু হয়। সোমবার ও মঙ্গলবার সকাল গড়ানোর আগেই অধিকাংশ ব্যবসা গুটিয়ে যায়। ফলে দিনের ব্যস্ত সময়ে যানজট বা জনভোগান্তির অভিযোগ অতিরঞ্জিত বলেই দাবি তাঁদের। উপরন্তু, এই হাটকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বিশাল অর্থনৈতিক চক্র। শুধু ব্যবসায়ী নন, কাপড় তৈরির কারিগর, সেলাই শ্রমিক, মালবাহী গাড়ির চালক, ঠেলাগাড়ির শ্রমিক, হকার— অসংখ্য মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে মঙ্গলাহাটের সঙ্গে।
ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবি, ফুটপাত ও রাস্তার উপর নির্ভর করে ব্যবসা করেন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষ। হাটের ভিতরে থাকা ১৪টি বিল্ডিংয়ে পাইকারি ও খুচরো ব্যবসা চললেও অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সে সুযোগ নেই। তাঁদের বক্তব্য, রাতারাতি ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে লক্ষাধিক পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। হাওড়া মঙ্গলাহাট ব্যবসায়ী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাজকুমার সাহা বলেন, ‘রাস্তা ও ফুটপাথে বসা ব্যবসায়ীদের সরিয়ে দিলে মঙ্গলাহাটের অস্তিত্বই সংকটে পড়ে যাবে। বহু বছর ধরে এই হাট চলছে। পুনর্বাসনের কোনও পরিকল্পনা ছাড়া এ ভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া মানে হাজার হাজার মানুষের রুজি কেড়ে নেওয়া।’ তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের আসল উদ্দেশ্য ধাপে ধাপে মঙ্গলাহাটকেই তুলে দেওয়া।
একই সুর শোনা গিয়েছে অন্য ব্যবসায়ী নেতাদের মুখেও। মঙ্গলাহাট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মলয় দত্ত বলেন, ‘এত বড়ো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনার প্রয়োজন ছিল। বিকল্প জায়গা বা পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা না দিয়ে উচ্ছেদ চালালে পরিস্থিতি জটিল হবে।’ তবে পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট। হাওড়া সিটি পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, সরকারের নির্দেশ কার্যকর করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ভাবতে পারে, কিন্তু আপাতত রাস্তা বা ফুটপাত দখল করে আর ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না।
এ দিকে, পুলিশের মৌখিক নির্দেশ সত্ত্বেও মঙ্গলবার ফুটপাতেই দোকান বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বহু ব্যবসায়ী। তাঁদের বক্তব্য, জোর করে উচ্ছেদ করতে এলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবেন তাঁরা। জেলাশাসক ও পুলিশ কমিশনারের দফতর ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। ফলে মঙ্গলাহাটকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘাত ঘটে কি না, সেদিকেই নজর হাওড়াবাসীর।
❤ Support Us







