- দে । শ
- মে ২৬, ২০২৬
বাড়ছে গরম, বাড়ছে এসির ব্যবহার : ভারতে বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কা !
‘এসি লাক্সারি নয়, নেসেসিটি’! বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যের তীব্র দহনে পুড়তে পুড়তে আজকাল এ কথাটা প্রায়ই শোনা যায় চারপাশে। অনেকেই বলছেন, ভালো-মন্দ একটু কম খেলেও চলবে, কিন্তু বাড়িয়ে অন্তত একটা এসি লাগানো চাইই চাই। বিশেষ করে যাদের বাড়িয়ে বয়স্ক ব্যক্তি বা শিশুরা আছে, তাঁরা নিজেদের সাধ্যের বাইরে গিয়েও শীততাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মাসের শেষে ইলেক্ট্রিক বিল দেখে অবশ্য কারো কারো বুকের বাঁ-দিকে চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে বইকি…
জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণের জেরে তাপপ্রবাহ এখন ভারতের নতুন ‘স্বাভাবিক’। এপ্রিল পেরোতেই দেশের শহরজুড়ে একটাই শব্দ, এসি-র গুনগুন। কিন্তু সে আরামের যন্ত্রই আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ পরিকাঠামিকে বিপজ্জনক সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিতে পারে, এমনটাই সতর্ক করল ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলের ‘ইন্ডিয়া এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট সেন্টার’-এর একটি নতুন গবেষণা। গবেষকদের আশঙ্কা, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত না বাড়ালে ২০২৮ সালের মধ্যেই ভারতে বিদ্যুতের ঘাটতি প্রকট হতে পারে। ক্রমবর্ধমান শীতলীকরণ-নির্ভর চাহিদা সামাল দিতে হিমশিম খেতে পারে জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থা।
‘বিটিং দ্য হিট: হাউ এয়ার কন্ডিশনার এফিসিয়েন্সি স্ট্যান্ডার্ডস হেল্প ইন্ডিয়া অ্যাভার্ট পাওয়ার শর্টেজেস অ্যান্ড কাট কনজিউমার বিলস’ শীর্ষক ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঘরের এসি থেকেই দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার সময়ে ৬০ থেকে ৭০ গিগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ দেশের মোট ডিমান্ডের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখন নির্ভর করছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের উপর। কিন্তু আগামী দশকে দেশে আরও ১৩ থেকে ১৫ কোটি নতুন এসি বসতে পারে। বাড়তে থাকা আয়, মধ্যবিত্তের প্রসার এবং তীব্রতর গরমের জেরে এসি এখন আর বিলাসিতার প্রতীক নয়, বরং বহু পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। আর সেখানেই ভবিষ্যতের বিপদ দেখছেন গবেষকরা ।
রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, বর্তমান গতিতে এসির ব্যবহার বাড়তে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু এসি চালাতেই বিদ্যুতের চাহিদা পৌঁছতে পারে ১২০ গিগাওয়াটে। ২০৩৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১৮০ গিগাওয়াটে, যা দেশের সম্ভাব্য সন্ধ্যাকালীন সর্বোচ্চ চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এ চাহিদা তৈরি হচ্ছে মূলত সূর্যাস্তের পরে, যখন সৌরবিদ্যুতের জোগান কমে আসে। ফলে গ্রিডের উপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। গবেষণার প্রধান লেখক নিকিত অভ্যঙ্কর বলেছেন, ‘এসি ইতিমধ্যেই ভারতের সর্বোচ্চ ডিমান্ডের সময় ৬০ থেকে ৭০ গিগাওয়াট অতিরিক্ত যোগ হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় বিদ্যুৎ পরিকাঠামো তৈরি বা উৎপাদন বৃদ্ধির হার কম। ফলে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ব্ল্যাকআউট বা ব্যয়বহুল জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হতে পারে।’ তাঁর মতে, সঠিক নীতিনির্ধারণ করলে এ সঙ্কটই আবার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে গ্রাহক, শিল্প ও গ্রিড; তিন ক্ষেত্রেই।
বার্কলের গবেষকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কা এড়াতে হলে দেশের ‘মিনিমাম এনার্জি পারফরম্যান্স স্ট্যান্ডার্ডস’ বা এমইপিএস আরও কড়া করতে হবে। বর্তমানে এসির শক্তি দক্ষতার যে উন্নতি বছরে ২ থেকে ৩ শতাংশ হারে হচ্ছে, তা বাড়িয়ে ৬ থেকে ৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের প্রস্তাব, ২০২৮ সালের মধ্যে ‘ইন্ডিয়ান সিজনাল এনার্জি এফিসিয়েন্সি রেশিও’-এর ন্যূনতম সীমা ৪.৩ করতে হবে। ২০৩০ সালে তা বাড়িয়ে ৫.৩ এবং ২০৩৩ সালে ৬.৭-এ নিয়ে যেতে হবে। গবেষকদের দাবি, দেশের বাজারেই ইতিমধ্যে এমন বহু মডেল রয়েছে যা এই মান ছুঁয়ে ফেলেছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ধারাবাহিক শক্তি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে এসি-চালিত পিক ডিমান্ড ৪৭ গিগাওয়াট পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এর ফলে প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকার নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন পরিকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন এড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে বছরে ৮৬ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হবে, যা প্রায় ৪৫ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের সমতুল্য। শুধু গ্রিড নয়, লাভ হবে গ্রাহকদেরও। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, উচ্চ দক্ষতার এসির দাম প্রথমে কিছুটা বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল কমায় গ্রাহকেরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। হিসাব অনুযায়ী, যন্ত্রগুলির আয়ুষ্কাল ধরে ভারতীয় গ্রাহকেরা সম্মিলিত ভাবে ৯১ হাজার কোটি থেকে ২.৪৮ লক্ষ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারেন।
এখানেই উঠে এসেছে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্র মানেই আকাশছোঁয়া দাম— এ ধারণাকে কার্যত খারিজ করেছেন গবেষকেরা। তাদের দাবি, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় শক্তি দক্ষতার মান বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতি সমন্বিত এসির দাম বরং কমেছে। ভারতে ২০০৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসির শক্তি দক্ষতা ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বাস্তব দামে এসি প্রায় অর্ধেক সস্তা হয়েছে। এখানেই, ভারতীয় উৎপাদকদের জন্যও বড়ো সুযোগের ইঙ্গিত রয়েছে। গবেষণার সহ-লেখক হোসে ডোমিঙ্গেজ বেনেট বলেছেন, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া এবং পিএলআই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন, কম খরচের এসি উৎপাদনে বিশ্বমানের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’ গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে বাজারে এক হাজারেরও বেশি ইনভার্টার এসি রয়েছে, যেগুলি পাঁচ-তারা দক্ষতার সীমাও অতিক্রম করেছে। ব্লু স্টার, ডাইকিনের মতো সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই ৬.০-এর বেশি আইএসইইআর রেটিংয়ের মডেল বিক্রি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে আর একটি সমীক্ষার তথ্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ব্যুরো অফ এনার্জি এফিসিয়েন্স’ এবং ‘ক্ল্যাস্প’-এর যৌথ সমীক্ষা বলছে, বর্তমানে ভারতের গৃহস্থালির মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৪০ শতাংশই যাচ্ছে পাখা, কুলার এবং এসির মতো শীতলীকরণ যন্ত্রে। ২০টি রাজ্যের ৪,৩২১টি পরিবারের উপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে, শহুরে পরিবারগুলিতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রধান চালিকাশক্তিই এখন ‘কুলিং ডিমান্ড’। শহরে যেখানে ১৭ শতাংশ পরিবারে এসি রয়েছে, গ্রামে তা মাত্র ৪ শতাংশ। তবে গবেষকদের মতে, গ্রামের এ সংখ্যা আগামী দশকে বিস্ফোরক হারে বাড়বে। বিদ্যুৎ মন্ত্রক এবং কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে। সম্প্রতি দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া হিট সামিট’-এ কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের মুখ্য প্রকৌশলী বিজয় মেংঘানি জানান, ২০২৪ সালের ৩০ মে এবং ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল— দুই দিনই দুপুরের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আচমকা প্রায় ২০ গিগাওয়াট চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। সে সময় দেশের পিক ডিমান্ড ২৫৬ গিগাওয়াট ছুঁয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, ‘দেশে এয়ার কন্ডিশনিং ক্ষমতা বছরে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। একই সঙ্গে ডেটা সেন্টার এবং শিল্পক্ষেত্র থেকেও অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বডড়ো সঙ্কট তৈরি হবে সন্ধ্যার পরে। দিনে সৌরবিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দিলেও রাতের গরম বাড়ার ফলে রাতেও এসি-র ব্যবহার তীব্র হবে। ফলে এখন আর শুধু কত বিদ্যুৎ লাগবে সেটাই প্রশ্ন নয়, কখন লাগবে সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে ব্যাটারি স্টোরেজ, পাম্পড হাইড্রো, স্মার্ট গ্রিড এবং শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্র ইত্যাদি ব্যবহারের দিকে মানুষকে সচেতন করা সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
❤ Support Us






