Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • মে ২৬, ২০২৬

গুরুত্বপূর্ণ খনিজে চিনের একচেটিয়া দাপট ভাঙতে ভারত-আমেরিকার ঐতিহাসিক চুক্তি। নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ার বার্তা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
গুরুত্বপূর্ণ খনিজে চিনের একচেটিয়া দাপট ভাঙতে ভারত-আমেরিকার ঐতিহাসিক চুক্তি। নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ার বার্তা

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর ভিত দাঁড়িয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা উপাদানের উপরেই। বৈদ্যুতিক গাড়িসেমিকন্ডাক্টরনবীকরণযোগ্য শক্তিকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাএমনকি উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সম্পদের উপর। আর সে কারণেই গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক লড়াই। এ আবহেই মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে কোয়াড বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের মাঝে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক কাঠামো চুক্তিতে স্বাক্ষর করলযার মূল লক্ষ্য— গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকার সরবরাহ শৃঙ্খলকে নিরাপদস্থিতিশীল এবং বহুমুখী করে তোলা।

ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও-এর নেতৃত্বে স্বাক্ষরিত হলো ঐতিহাসিক চুক্তি। কূটনৈতিক মহলের মতেএ চুক্তি নিছক বাণিজ্যিক বা প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নয়বরং এর অন্তর্নিহিত বার্তা অনেক গভীর। বিরল মৃত্তিকা উপাদান এবং কৌশলগত ধাতুর প্রক্রিয়াকরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চিনের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিকল্প জোট গড়ে তোলার দিকেই এগোচ্ছে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন। সাম্প্রতিক সময়ে বেজিং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিকা উপাদানের রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় উদ্বেগ বেড়েছে পশ্চিমি দুনিয়ায়। কারণআধুনিক প্রযুক্তি শিল্পের বহু স্তরই এখনো চিনের উপর নির্ভরশীল। ফলে, আমেরিকা  তার মিত্র দেশগুলি বুঝতে পারছেআধুনিক প্রযুক্তি শিল্পের ভিত্তি যদি একক কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়তা হলে ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

চুক্তি স্বাক্ষরের পরে জয়শঙ্কর বলেন, ‘এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমরা শুধু দ্বিপাক্ষিক ভাবে নয়কোয়াডের মতো বৃহত্তর মঞ্চেও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকার নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাই।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সরবরাহ শৃঙ্খলের নতুন কূটনীতির প্রসঙ্গও। তিনি জানানএ কাঠামোর আওতায় খনি অনুসন্ধানখনিজ প্রক্রিয়াকরণপুনর্ব্যবহারপ্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুদেশ আরও ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করবে। জয়শঙ্করের মতে, “স্থিতিস্থাপক  বহুমুখী সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে প্রকল্পে অর্থায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের কার্যকর ব্যবস্থাপনাও এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য।’

মার্কো রুবিওর বক্তব্যেও উঠে আসে নয়া ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত। তিনি বলেন, ‘ভারত ও আমেরিকার মতো উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি কোনোভাবেই এই শিল্পগুলির মৌলিক উপাদানকে একক উৎসের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের হাতে ছেড়ে দিতে পারে না। কারণতা শুধু সংঘাতের সময় নয়কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার হতে পারে।’ রুবিও স্পষ্ট করেনএই চুক্তি নিছক অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়বরং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বেরও বাস্তব প্রতিফলন। তাঁর মতে, এই অংশীদারিত্ব ভারত ও আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

ওয়াশিংটনের তরফে জানানো হয়েছেগুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত করতে ইতিমধ্যেই ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগঋণ এবং বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। বেসরকারি ক্ষেত্রের অংশীদারিত্বে এ উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জবরদস্তিমূলক বাণিজ্য নীতি’ এবং একক উৎসনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যৌথ অবস্থান নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে মার্কিন সমর্থিত ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগ। গত ডিসেম্বর মাসে চালু হওয়া এই কর্মসূচির লক্ষ্যগুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের জন্য নিরাপদ ও উদ্ভাবননির্ভর সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করা। রুবিও জানানফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে আয়োজিত ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ফোরাম’-এ ভারতের অংশগ্রহণের পর থেকেই এই সহযোগিতার ভিত আরও মজবুত হতে শুরু করে।

বিশ্লেষকদের মতেএ চুক্তির প্রভাব শুধু বাণিজ্য বা প্রযুক্তি শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতের ভূ-রাজনীতিতে জ্বালানিব্যাটারি প্রযুক্তিপ্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর শিল্পের নিয়ন্ত্রণ যেহেতু অনেকাংশে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উপর নির্ভর করবেতাই এই চুক্তিকে বৃহত্তর কৌশলগত সমীকরণের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।  মাত্র দুমাস আগেই ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিয়ো গোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। মার্চ মাসে তিনি বলেছিলেন, ‘নির্ভরযোগ্য এবং বহুমুখী গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থা এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত।’


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!