- খাস-কলম
- ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২২
‘মাতৃকোষে রতন’: বাঙালির ভাষা সচেতনতা, বাঙালির অভিধান কথা
অভিধান গ্রন্থের প্রতি এককালে আমাদের মাস্টারমশাইদের একটা বিরাট সম্ভ্রম ছিল। কিন্তু সেটা ছাত্র বা অন্যান্য পাঠকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনি। এটাই আমাদের ট্র্যাজেডি।
সাহিত্যের এক ছাত্র একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে এসেছিল। হাতে ছিল একটা পাণ্ডুলিপি। কয়েকটি বানান বিভ্রম দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কোন অভিধান ব্যবহার করো?’ তাঁকে থতমত করতে দেখে বললাম—‘তোমার কোন ডিকশনারি?’ আমতা মামতা করে জানালো একটা এ, টি দেব আছে তাঁর বাড়িতে । আমি জিজ্ঞেস করলাম— ‘এটা কি ই-টু বি, মানে ইংরেজি-বাংলা অভিধান?’ প্রত্যাশিত উত্তর এল—‘হ্যাঁ তা-ই।‘ আমি বললাম—‘এ ডিকশনারি তো তোমাকে বাংলা শব্দের হদিশ দেবে না, এর লক্ষ্য তো ভিন্ন। তোমার চাই বি-টু বি, মানে বাংলা থেকে বাংলা অভিধান।’ এবারে একেবারে আক্ষরিক অর্থেই আমাকে ভিরমি খাইয়ে দিয়ে ওদিক থেকে উত্তর এল—‘না-না, বাংলা শব্দ নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই। ভগবানের আশীর্বাদে আমার বাংলা বানান ভুলও হয় না।’
হায়! হায়! ভগবান এ অধমকে তাঁর কৃপা থেকে সত্যিই বঞ্চিত করে রেখেছেন। আমার যে বিস্তর বানান ভুল হয় এবং এ থেকে উত্তরণের জন্য ঈশ্বর নয়, একাধিক অভিধানের শরণাপন্ন হতে হয় আমাকে। সামান্য টুকটাক লেখালিখি করতেও আমাকে সব সময় অভিধানের পাতা উল্টাতে হয়। একখানা দীর্ঘ প্রবন্ধ কিংবা বইয়ের প্রুফ দেখা শেষ হলে প্রায় অবশ্যকৃত্য হিসেবে আমার অভিধানগুলো মেরামতের দরকার হয়ে পড়ে। পাতায় পাতায় সেলো টেপ দিয়ে পুলটিস, মলাটে গদের আঁঠা লাগানো আরও কত কি…। ইতিপূর্বে বার কয়েক আমার অভিধানগুলো বাঁধাইকর্মীর কাছে পাঠিয়ে ঠিক করিয়েও এনেছি। বার বারই যে বইটি খুলতে হয়।
প্রমিত বানান ব্যবহার করতে গিয়ে আমাদের খটকা লাগে বই কি। আর যুৎসই প্রতিশব্দ, বিপরীত শব্দ খুঁজতে হলে, শব্দের প্রয়োগ দেখতে হলে কিংবা মনে কোনো সন্দেহ জাগলে শব্দকোষ দেখতেই হয়। (এই শব্দকোষ বানান নিয়েও সমস্যা আছে। আকাদেমি বানান অভিধানে বানানটি আছে ‘শব্দকোশ’ এটাও এখানে উল্লেখ থাক) তাছাড়াও দেখতে হয় প্রয়োগ অভিধান।পরিভাষা ব্যবহার করতে গেলে হাতের কাছে পরিভাষা-কোষও রাখতে হয়। হরিচরণের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ নাড়াচাড়া করা বেশ কষ্টকরও বটে। রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’ দিয়ে দৈনন্দিন কাজ চলে যায়, কিন্তু মাঝে মাঝে জ্ঞানেন্দ্রমোহন বা হরিচরণের সাহায্যপ্রার্থী হতেই হয়। আর দেখতে হয় আঞ্চলিক অভিধানও। এত সাবধানতা অবলম্বন করেও দেখি নিজের কোনো লেখাই নিখুঁত করতে পারলাম অদ্যাবধি।
এত অভিধান ব্যবহার করার সুপারিশ দেখে কেউ আমার বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতেই পারেন। বানান তো আছেই, লিখনশৈলীর নানা খুঁটিনাটি বিষয়ের জন্যও অভিধান ঘাঁটা প্রয়োজন। বাংলায় কয়েকটি ব্যবহারিক নির্দেশ সম্বলিত কিছু বই বেরিয়েছে বেশ কিছু দিন হল। লক্ষ্য করেছি এদিকেও আমাদের সচেতনতা জাগেনি।নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘বাংলা কী লিখবেন, কেন লিখবেন’, সুভাষ ভট্টাচার্যের ‘লেখক সম্পাদকের অভিধান’, বিরতি চিহ্ন ইত্যাদির সঠিক প্রয়োগ দেখতে ‘তিষ্ট ক্ষণকাল’ (সব ক’টিই আনন্দ পাবলিসার্সের)—এসব বই হাতের কাছে না থাকলে লেখা যে মাঝে মাঝেই পণ্ডশ্রম হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ থেকেও এধরনের বেশ কিছু বই বেরিয়েছে। অভিধান এবং লিখন বিষয়ক বইগুলো না থাকলে যে এক এক জন লেখকতো আসলে ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’।
বলছি, আমাকে ভগবান তাঁর কৃপা থেকে বঞ্চিতই করেছেন। তাই কিছু লিখতে গেলে মাঝে মাঝে হাত আটকে যায়—বই কি/ বই কী/ বৈকি/বৈ কী –কোনটা লিখব? ‘আমগাছ’ লিখতে কি আমের সঙ্গে গাছকে জোড়া লাগিয়ে দেব? আর ‘জারুল গাছ’ লিখতে হলে কি দুটো শব্দের মধ্যে একটা দূরত্ব রাখব? বাঙালি লিখব না বাঙালী লিখব? নাকি বাঙ্গালী বা বাঙ্গালি– কোনটা লিখব? এসব ক্ষেত্রে প্রমিত অভিধান ছাড়া আর কার উপর নির্ভর করব ? লিখন কর্মের এতসব খুঁটিনাটি দিকগুলোর প্রতি সচেতন না থাকলে প্রেসকপি ঠিক মতো তৈরি করা সম্ভব নয় আর তা না করলে মুদ্রিত হয়ে এলে লেখায় এসব খুঁটিনাটি ভ্রান্তিগুলো কেমন ভ্যাংচি কাটে। ছাপাখানের ভূতের ঘাড়ে এ ভুলের দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে পার পাওয়া যাবে না।
মনে পড়ে আকাশবাণী শিলচরের প্রোডাকশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক স্বস্তিকরঞ্জন সেন আমার একটা কথিকার স্ক্রিপ্ট দেখে বললেন—’তোমাকে লিখতে হবে ‘দেখিনি’ (দেখি নি লিখলে মাইক্রফোনের সামনে বিব্রত হতে হবে।)’। কিন্তু স্ক্রিপ্টে ‘দেখিনা’ কদাপিও হবে না, এখানে ‘না’-কে আলাদা করে রাখতে হবে। (কারণ ‘না’ একটি স্বতন্ত্র শব্দ, সে নিজেই একটা অর্থ ধারণ করছে। কিন্তু ‘দেখিনি’ শব্দটিতে ‘নি-র অবস্থান-খি-র লেজুড় হিসেবেই থাকা–এটা অনেক পরে বুঝেছি)। বুঝতে পারছি রেকর্ডিংয়ের সূত্রে তাঁকে নানা ধরনের পাণ্ডুলিপি ঘাঁটতে হত। পাণ্ডুলিপির দোষে যে উচ্চারণ বিভ্রম ঘটে এগুলোকে এড়িয়ে শব্দধারণ যন্ত্রের সাহায্যে প্রচারিত কথিকা বা নাটকের সংলাপ শ্রোতার কানে যথাযথ ভাবে পৌঁছে দেওয়ায় তাঁর জুড়ি ছিল না। বুঝলাম শ্রাব্য মাধ্যমের পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে হলেও বিশেষ যত্নবান হওয়ার প্রয়োজন। রেকর্ডিং যন্ত্রের সামনে স্ক্রিপ্ট পাঠকরার সময় যদিও কমা, দাঁড়ি, উদ্ধৃতি চিহ্ন, কোলন, ড্যাশ এগুলো অনুক্ত থাকে কিন্তু অভিজ্ঞ পাঠকের উচ্চারণে এগুলো শ্রোতার চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে। শ্রুতি মাধ্যমের জন্য তৈরি স্ক্রিপ্টেও কত যে খুঁটিনাটি বিষয়ে মনোযোগী হতে হয় এটা কি আমরা জানি? লিখে নেওয়া কর্মটির সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিস্তর অনুপুঙ্খ সচেতনতা, অর্থাৎ টেকনিক্যাল ডিটেলসের জ্ঞান।এসব শেখার উপযুক্ত বই তো আমাদের কাছে সহজলভ্য নয়, কিংবা যা আছে তাও যৎসামান্য। (বিনীত ভাবে বলি, বর্তমান লেখক এ নিয়ে একটা প্রয়াস নিয়েছেন, ‘কী ক’রে লিখব’ বইটি সম্প্রতি আসামের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পঠন পাঠনেও গৃহীত হয়েছে)
আমাদের ভাষা অনুরাগের পেছনে তেমন কোন ভাষাতাত্ত্বিক সচেতনতা নেই। অভিধান গ্রন্থের প্রতি এককালে আমাদের মাস্টারমশাইদের একটা বিরাট সম্ভ্রম ছিল। কিন্তু সেটা ছাত্র বা অন্যান্য পাঠকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনি। এটাই আমাদের ট্র্যাজেডি।
অভিধান যে একটা জাতীয় জীবনের দর্পণ এদিকে অবশ্য উনিশে মে’র উত্তরাধিকারীদের খুব সচেতনতা নেই। আসলে আমাদের ভাষা অনুরাগের পেছনে তেমন কোন ভাষাতাত্ত্বিক সচেতনতা নেই। অভিধান গ্রন্থের প্রতি এককালে আমাদের মাস্টারমশাইদের একটা বিরাট সম্ভ্রম ছিল। কিন্তু সেটা ছাত্র বা অন্যান্য পাঠকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনি। এটাই আমাদের ট্র্যাজেডি।
সাধারণ্যে এটাই ধারণা, অভিধান হল শব্দার্থের সমাহার। অনেকের ধারণা ইংরেজি শব্দের বাংলা মানে জানার জন্যই অভিধান। এবং এ জন্যই আমাদের ঘরে ঘরে ‘ইংলিশ টু বেঙ্গলি বাই এ টি দেব’ এর অধিষ্ঠান।বাঙালি শিক্ষিতজনের ক’জনই আর বাংলা অভিধানের খবর রাখেন? নয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির ‘বানান অভিধান’(১৯৯৭), অতঃপর ‘বিদ্যার্থী অভিধান’ (২০০৯) মুষ্ঠিমেয় বাঙালির ভাষা, বিশেষ করে বানান নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করেছে তা স্বীকার করতে হবে। তবে এটা বলতে হয়, অভিধানের পরিশিষ্টে যে ‘বানান বিধি’র পাঠটি নিয়মিতভাবে মুদ্রিত হয় এ দিকে যাবার অবকাশই আমাদের হয় না। আর যারা এ বিষয়ে কিঞ্চিত সচেতনতা অর্জন করেছেন, এদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি নিরন্তর চর্চার মধ্যে না থাকলে ধীরে ধীরে আগের জায়গায় ফিরে যান, যেমন সম্প্রতি হচ্ছে। লক্ষ্য করছি ইদানীং সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, পাঠ্যপুস্তক, দেওয়াল লিখন, টিভির পর্দা সর্বত্র ভুল বানানের মিছিল। শুধু শুধু বানানই নয়, লিখন পদ্ধতির মধ্যেও রয়েছে অসংলগ্নতা।
এ তো গেল একটা দিক, এ ছাড়াও অভিধানের কত যে রকমফের আছে এটাও আমাদের জানা হয়ে ওঠেনি। উচ্চারণ অভিধানের কথা বললে অনেকে হাঁ করে তাকান। টিভি চ্যানেল, এমনকি আকাশবাণীর কেন্দ্রতে দুছত্র বাংলা বাক্য, লিখিত কাগজ দেখে শুদ্ধ করে পাঠ করতে সক্ষম ছেলেমেয়ে পাওয়া আজকাল বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে আকাশবাণী-দূরদর্শনের কর্তৃপক্ষ নিরন্তর সমস্যার মুখোমুখি হন। ভাষিক আগ্রাসনের প্রভাবে নয়, শিক্ষিত বাঙালির অজ্ঞতার জন্যই এ কেন্দ্রগুলোর গঙ্গাপ্রয়াপ্তি ঘটতে চলেছে।
উচ্চারণের ক্ষেত্রে ঋষিদাস সংকলিত, পবিত্র সরকারে ভূমিকা সম্বলিত ‘উচ্চারণযুক্ত’ আধুনিক বাংলা অভিধান’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৯২) এখনও একমাত্র নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ এ খবর আমরা ক’জন রাখি? সম্প্রতি বিশিষ্ট লেখক, বাচিক শিল্পী ও কবি সুকুমার বাগচি বাংলা উচ্চারণ নিয়ে একটি বই লিখেছেন, ‘বাংলা উচ্চারণের নিয়মাবলি’। আশা করি বাংলা ভাষা চর্চায় প্রাণ সঞ্চার করবে এ বই।
ইদানীং আরেকটি সমস্যা দেখা দিয়েছে—বাজারে প্রামাণিক অভিধানের বাড়ন্ত। সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস প্রাণীত অভিধান অনেকদিন অমুদ্রিত; নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা নিয়েও বাংলা আকাদেমির যে ‘বানান অভিধান’ আমাদের লেখক গবেষক, এমনকী মাস্টারমশাইদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল সেটাও এক দশক থেকে আউট অব প্রিন্ট। ‘চলন্তিকা’র কিছু পাইরেটেড সংস্করণ আগে বাজারে ছিল এখন সেটাও পাওয়া যাচ্ছে না। সাহিত্য অকাদেমি হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ পুনঃপ্রকাশ করেছিলেন, এখন বইটি বাজারে আছে কি না জানি না, তবে বৃহদায়তনের এ কোষগ্রন্থ প্রাত্যহিক ব্যবহারের জন্য খুব সুবিধের নয়। অনেক সময় ছাত্রছাত্রীরা অনুযোগ করে বাজারে অভিধান নেই। কথার সত্যতা যাচাই করে দেখেছি সত্যিই দীর্ঘদিন থেকে বাংলা অভিধান মুদ্রণই হচ্ছে না। অতএব যাঁরা পাঠ্যপুস্তক লেখেন এদেরও অভিধান ছাড়াই কাজ করতে হয়। আর যারা মোবাইল টিপে বানান ঠিক করে নিয়ে ভাবেন এই তো বেশ, অভিধানে আর কাজ কি– এরা জানেন না, অনেক ক্ষেত্রেই ইন্টারন্যাট খুব একটা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান নয়।বেসিক গ্রন্থ না দেখে কোনও কিছুর সত্যাসত্য নিরূপণ করা সত্যিই কঠিন। তবে এদের কে বোঝাবে? এ প্রসঙ্গে কথা বললে সে হবে আরেক সাতকাহন।
অভিধান পুনর্মুদ্রণের ক্ষেত্রে এখন আমাদের সামনে অনেক সমস্যা।এর সঙ্গে রাজনৈতিক কারণও জড়িত। আমরা জানি এ ধরনের বই নতুন করে ছাপাতে হলে এতে সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন প্রয়োজন। ফটোকপি করে নবসংস্করণ বলে বাজারে হাজির করলে সেটাকে পাইরেটেড সংস্করণ বলা অসঙ্গত হবে না। মুখে বলছি নতুন ‘সংস্করণ’, কিন্তু ভেতরে কোন ‘সংস্কার’ নেই। এটা বিদেশে অকল্পনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে সবই চলে, তাই বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে আজ এ ভয়াবহ খরা। বাংলা আকাদেমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক, ভাষা বিজ্ঞানী– এরা পশ্চিমবঙ্গে আপাতত রাজনৈতিক ক্ষমতার বৃত্তের কিছুটা বাইরে রয়েছেন। আর যে অবশিষ্ট রয়েছেন ক্ষমতার কাছাকাছি যাদের বিচরণ এরা রাজনীতিতে যতটা এগিয়ে থাকেন, বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে ততটা নন।
বিষয়টা তো এক দিনের কম্ম নয়, জীবনভর সাধনালব্ধ। মূল্যবান একটা গ্রন্থকে পদ্ধতিগত ভাবে সম্পাদনা করে, একটা সুচিন্তিত ভূমিকা লিখে নিখুঁতভাবে বাজারে হাজির করা– নেতা মন্ত্রীদের বশংবদদের এটা রপ্ত করার অনেক বাকি রয়েছে। আর এটা তো ঠিক উচ্চমানের পণ্ডিত, গবেষকরা কিছুটা স্বাভিমানীও হয়ে থাকেন। অতএব এ বাংলায় সরকারি উদ্যোগে অভিধান প্রকল্প আপাতত ফিতেয় বন্দি। বেসরকারি তেমন কোন উদ্যোগের খবরও নেই। বাংলা ভাষার আর যে ভুবনগুলো রয়েছে, এর মধ্যে বরাক উপত্যকায় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা তো সুদূরপরাহত। যেখানে বাংলাভাষা বা বাঙালির রাষ্ট্রীয়বৈধতা এবং বাঙালির ভাষিক অধিকারই বিপন্ন, সেখানে এ নিয়ে কে ভাববে? অতএব এক কথায় বলা চলে বাংলা অভিধানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
বাংলা ভাষা, ভাষাতত্ত্ব চর্চার প্রাণকেন্দ্র কলকাতা রসেই গৌরবময় বৌদ্ধিক পরিবেশ কি আজ আর আছে? ব্যক্তিগত স্তরে কিছু চিন্তাচর্চা হলেও ভাষার উৎকর্ষ সাধনের ক্ষে্ত্রে সেটা কার্যকরী হতে পারছে না। এখন ভাষাতত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রটি সরে গেছে ওপার বাংলা, মানে একুশে ফেব্রুয়ারির ভূমি বাংলাদেশে। পশ্চিমবঙ্গের ভাষাবিজ্ঞানী, ভাষা চিন্তকদের ওখানেই নিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া হয়েছে। ‘বাংলা একাডেমি’র (ঢাকা) ‘প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ (২০১১) প্রকল্পে আমন্ত্রণ করে নিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পবিত্র সরকার এবং নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে, এসবের খবর এদিকে সেরকম ভাবে আসছেই বা কোথায়?
বরাক উপত্যকায় ভাষা নিয়ে, বিশেষ করে আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে যা-ও কিছুটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিন্তা চর্চা শুরু হয়েছিল, সম্প্রতি এটাও শেষ হওয়ার পথে। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে যে কয়েকখানা মাত্র আঞ্চলিক বাংলার অভিধান রচিত হয়েছিল, এ ক্ষেত্রে বরাক উপত্যকা একটা বিশেষ অবদান রেখেছে। জগন্নাথ চক্রবর্তী এবং আবিদরাজা মজুমদারের (২০১১) হাত দিয়ে আমরা পেয়েছি দুখানা অঞ্চলিক বাংলার অভিধান, যা এ ভুবনের ভাষাতত্ত্ব চর্চায় মাইল ফলক বিশেষ।বলে নেওয়া প্রয়োজন, মূলস্রোত বাংলা ভাষা ও ভাষাতত্ত্বে অঞ্চলিক ভাষা চর্চার একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, কারণ অঞ্চলিক ভাষাই একটি মান ভাষার প্রাণরস প্রদায়িনী ফিডার ল্যাঙ্গুয়েজ। কিন্তু আমাদের ভূমিতে এ পথ দিয়েই যে আবার একধরনের আত্মঘাতী প্রবণতার লক্ষণ পরিস্ফুট। সিলেটি উপ-ভাষা নাকি একটি স্বতন্ত্র ভাষা, এটা বলছেন একদল। বাংলার উপভাষা হিসেবে সিলেটিকে মানতে এরা গররাজি। এর পেছনে রয়েছে সংকীর্ণ রাজনীতি যার বিস্তার ঘটেছে কাছাড়, সিলেট পেরিয়ে লন্ডন আমেরিকা অবধি। বলা বাহুল্য নয়, এসব কর্মে কতিপয় বরাকমূলীয় সুযোগ সন্ধানী, সীমান্তের ওপারে কতিপয় হতাশ এবং বিত্তবান সিলেটি সন্তানও সক্রিয় রয়েছেন। এদের পেছনে অবশ্য কতিপয় ইউরোপীয় ভাষাবিজ্ঞানীদের উপস্থিতিও রয়েছে। আর, কে না জানে সাদা চামড়ার প্রতি আমাদের বিরাট দুর্বলতা!
বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের দূর-শিক্ষাকেন্দ্র একেবারে প্রাথমিক ভাবে ‘অভিধানতত্ত্ব, অভিধান পাঠ ও ব্যাবহার’ বিষয়কে বাংলা পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি এযাবৎ প্রাতিষ্ঠানিক বাংলা পঠনপাঠনে অন্তর্ভুক্তি লাভ করেনি। নেই নেই করেও এখন পর্যন্ত যে অভিধানগুলো আমাদের হাতে রয়েছে এগুলোর ব্যাবহার পদ্ধতি অন্তত রপ্ত করিয়ে রাখলে ভবিষ্যতে সুফল ফলবে আশা করা যায়।
পরিশেষে বলব, লিখন কর্মটি একটি শ্রমসাধ্য বিষয়, একটা দীর্ঘকালীন মনন প্রক্রিয়া, নিছক একটি সৌখিন সাহিত্য বিলাস নয়, বাঙালির পক্ষে এ বিলাস তো আত্মঘাতী — এ সচেতনতা না জাগলে সামাজিক মাধ্যমের দৌলতে, এবং মুদ্রণ প্রযুক্তির বিস্ফারের ফলে বাংলা লেখালিখির বহর বাড়বে কিন্তু বাংলা লেখালিখির মান কি সে মাত্রায় বাড়বে, একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটিতে এ প্রশ্ন পাঠকদের কাছে রাখলাম।
❤ Support Us








