- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬
টানা বৃষ্টি, পাহাড়-ধসে ফের বিধ্বস্ত দার্জিলিং-সিকিম ! তাকদা হাসপাতালে পাথরের চাঁই, রিম্বিতে ঘরছাড়া বহু পরিবার
টানা বৃষ্টি। তার সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। পাহাড়ের মাটি ইতিমধ্যেই নরম হয়ে রয়েছে। তার মধ্যেই শুক্রবার ভোরে ভয়াবহ ধস নামল দার্জিলিং পাহাড়ে। রঙলি রঙলিওট ব্লকের তাকদহ ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালের উপরেই ধসে পড়ল পাহাড়ের একাংশ। বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই আছড়ে পড়ে হাসপাতালের ছাদ ভেঙে ঢুকে যায় ভিতরে। ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছেন এক জন। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর পরিজন বলে জানা গিয়েছে। তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে স্থানান্তরিত করা হয় দার্জিলিং জেলা হাসপাতালে।
দার্জিলিং শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে তাকদা। রঙলি রঙলিওট ব্লকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র তাকদা ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতাল। স্থানীয় সূত্রে খবর, শুক্রবার ভোর সাড়ে ৩টে নাগাদ আচমকাই হাসপাতাল সংলগ্ন পাহাড়ে ধস নামে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ের মাটি, পাথর এবং ধ্বংসাবশেষ দ্রুত নীচে নেমে এসে হাসপাতাল ভবনের উপর আছড়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে হাসপাতালের একটি অংশ কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
ধসের অভিঘাত এতটাই প্রবল ছিল যে, বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই হাসপাতালের ছাদ ভেঙে সরাসরি ভিতরে ঢুকে পড়ে। যে অংশটি ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে সময় সেখানে কোনো রোগী ছিলেন না। ফলে অল্পের জন্য বড়োসড়ো বিপদ এড়ানো গিয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের অন্য অংশে থাকা কয়েক জন আচমকা ধসের কারণে আটকে পড়েন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সব মিলিয়ে ৬ জন হাসপাতালের ভিতরে আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে রোগীর পরিজন যেমন ছিলেন, তেমনই ছিলেন হাসপাতালের কর্মীরাও। ধস নামার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। কোনোরকমে ৫ জন ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু একজন পাথর এবং কংক্রিটের ধ্বংসাবশেষের নীচে চাপা পড়ে যান।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ এবং উদ্ধারকারী দল। শুরু হয় ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ। বেশ কিছু ক্ষণের চেষ্টার পর উদ্ধার করা হয় ওই ব্যক্তিকে। জীবিত অবস্থাতেই তাঁকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বার করা সম্ভব হয়। ঘটনাস্থলে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে দার্জিলিং জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়। আপাতত সেখানেই চিকিৎসাধীন তিনি। ধসের জেরে হাসপাতাল ভবনের বেশ কিছুটা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ঠিক কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। হাসপাতালের পরিষেবা কতটা ব্যাহত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশাসনের তরফে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে জেলা প্রশাসন।
তাকদার এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। গত কয়েক দিন ধরেই টানা বৃষ্টিতে দার্জিলিং পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ধসের আশঙ্কা বাড়ছিল। শুক্রবার রাতভর বৃষ্টির পর একাধিক জায়গায় মাটি নামার খবর পাওয়া যায়। লেবং কার্ট রোডেও ধস নামে। তবে সিভিল ডিফেন্স এবং সদর ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতায় দ্রুত ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। কার্শিয়াং ব্লকের বাগওড়া-কালিঝোরা রোডের ৭২ ধুরা এলাকাতেও ধসের জেরে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেই পূর্ত দফতর এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে রাস্তা পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন। পরে ওই রাস্তায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। রাম্বি ঝোড়া এবং লাবারবোটেই এলাকাতেও ছোটখাটো ধসের খবর মিলেছে।
শুধু পাহাড়ি রাস্তাই নয়, নদী নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রবল বৃষ্টির জেরে তিস্তার জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নদীর জলস্তর এবং স্রোতের উপর নজর রাখছে প্রশাসন। পাহাড় থেকে নেমে আসা জল এবং লাগাতার বৃষ্টির জেরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে কি না, সে দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। অন্য দিকে, শিলিগুড়ির কাছে দুধিয়াতেও বিপত্তি। বালাসন নদীর প্রবল স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারী যানবাহন চলাচলের জন্য তৈরি বিকল্প সেতু। ফলে ওই সেতু দিয়ে ভারী যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশের বেইলি ব্রিজ দিয়ে আপাতত হালকা যানবাহন চলাচল করছে। ফলে ওই অঞ্চলেও যান চলাচল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে সতর্ক রয়েছে প্রশাসন।
দার্জিলিংয়ের পাশাপাশি লাগাতার বৃষ্টির জেরে ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে প্রতিবেশী সিকিমেও। পশ্চিম সিকিমের গ্যালশিং জেলার ইউকসোম-তাশিডিং এলাকার রিম্বি গ্রামে ভয়াবহ ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক বাড়ি। স্থানীয় সূত্রের দাবি, অন্তত ৫০টি পরিবার ঘরছাড়া হয়েছে। সরকারি আবাসন-সহ বেশ কিছু বাড়ি ধসের কবলে পড়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত প্রাণহানির কোনও খবর পাওয়া যায়নি। গত ২৪ ঘণ্টার টানা বৃষ্টির পর শুক্রবার ভোররাতে রিম্বি এলাকায় পাহাড়ের ঢাল থেকে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও মাটি নীচে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে তা ঢুকে পড়ে বসতি এলাকায়। আতঙ্কে বাসিন্দাদের একাংশ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় সরে যান। ধসের ধ্বংসাবশেষে বেশ কিছু রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, এখনও পাহাড়ের ঢালে মাটির নড়াচড়া রয়েছে। ফলে নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে প্রশাসন। রিম্বির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে রাজ্য সরকার রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট দফতর ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। দুর্গতদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার উপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। ইতিমধ্যেই ধস কবলিত এলাকায় উদ্ধারকাজ ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের তরফে সরেজমিন পরিদর্শন করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে বৃষ্টি পুরোপুরি থামেনি। ফলে নতুন করে কোথাও ধস নামে কি না, সে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। পাহাড়ি রাস্তা, হাসপাতাল এবং জনবসতি সংলগ্ন ঢালগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসনের তরফে সাধারণ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। টানা বৃষ্টির মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ি পথে অপ্রয়োজনে যাতায়াত না করার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। তাকদা হাসপাতালের ধসের ঘটনা ফের এক বার পাহাড়ি এলাকায় সরকারি পরিকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে বৃষ্টির মরসুমে হাসপাতাল, রাস্তা ও বসতিগুলির আশপাশে ধসপ্রবণ এলাকার নিরাপত্তা কতটা সুনিশ্চিত, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে প্রশাসনকে।
❤ Support Us







