- এই মুহূর্তে
- নভেম্বর ৬, ২০২৬
দৈনন্দিন শরীরচর্চা নিয়ে ‘হু’-র সমীক্ষায় উদ্বেগ
মানুষের শরীরই তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। অথচ সেই শরীরের যত্ন নেওয়ার প্রশ্নেই আধুনিক সভ্যতার অদ্ভুত উদাসীনতা। প্রযুক্তির অভাব নেই, বিনোদনের বিকল্প অগণিত, যাতায়াতের ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক উন্নত। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে হাঁটাচলা, খেলাধুলো, দৌড়ঝাঁপের মতো স্বাভাবিক শারীরিক ক্রিয়াকলাপ। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের জীবনযাত্রায় এ পরিবর্তন আগামী দিনের জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) সাম্প্রতিক সমীক্ষা সেই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। সমীক্ষা বলছে, বিশ্ব জুড়ে প্রতি চার জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে এক জন সপ্তাহের কোনো দিনই ৬০ মিনিট শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকে না। ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সি প্রায় ২৪ কোটি কিশোর-কিশোরীর ক্ষেত্রে এমন ভয়াবহ ছবি দেখা গিয়েছে। গড়ে সপ্তাহে মাত্র ২.৭ দিন শারীরিক কসরত করে তারা। সপ্তাহের সাত দিনই শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকে মাত্র ১৪ শতাংশ। ১৪০টি দেশ ও অঞ্চলের ৩২ লক্ষেরও বেশি কিশোর-কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন গবেষকেরা। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ’ পত্রিকায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, গত ১৫ বছরে পরিস্থিতির প্রায় কোনো উন্নতিই হয়নি। অর্থাৎ, প্রযুক্তির অগ্রগতি, জীবনযাত্রার পরিবর্তন কিংবা স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে এত প্রচার সত্ত্বেও কিশোর প্রজন্মকে নিয়মিত শরীরচর্চায় অভ্যস্ত করে তোলা যায়নি। বরং ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে তাদের দৈনন্দিন জীবন। প্রশ্ন ওঠছে, শরীরচর্চা কি শুধুই ব্যক্তিগত অভ্যাস, না কি এর সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজেরও দায় রয়েছে? ‘হু’-র সমীক্ষা দ্বিতীয় প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার দায় কেবল কিশোর-কিশোরীদের উপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। কোনো শিশু বা কিশোর কতটা শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার চারপাশের পরিবেশের উপর। তার স্কুলে খেলার মাঠ আছে কি না, বাড়ির আশপাশে নিরাপদে হাঁটাচলার জায়গা রয়েছে কি না, সাইকেল চালানোর উপযুক্ত রাস্তা আছে কি না, কিংবা অবসর সময়ে বাইরে খেলতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, তাঁদের উৎসাহিত করা হচ্ছে কি না — এই প্রতিটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে শহুরে জীবনযাত্রায় সমস্যার গভীরতা আরও বেশি। বহুতল আবাসন, ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা খেলার মাঠ, যানজট, দূষণ, নিরাপত্তার অভাব শিশু-কিশোরদের বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। স্কুলের পড়াশোনা, কোচিং, পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতার চাপে তাদের অবসরও ক্রমশ কমছে। যে সময়টা মাঠে কাটতে পারত, তার বড়ো অংশ চলে যাচ্ছে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার কিংবা অন্য কোনো পর্দার সামনে। বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু তার সঙ্গে বদলে গিয়েছে শরীরের ব্যবহারও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা এখন অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাস। অথচ শরীরচর্চা কেবল রোগ প্রতিরোধের উপায় নয়, মানুষের সামগ্রিক বিকাশেরও অন্যতম শর্ত। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে, পেশি ও হাড়ের গঠন মজবুত করতে, বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি মানসিক চাপ কমানো, ঘুমের গুণমান উন্নত করা, আত্মবিশ্বাস, নিয়ামানুবর্তিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা রয়েছে। শৈশব ও কৈশোরে তৈরি হওয়া অভ্যাসই অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এ বয়সে শরীরচর্চার অভাব ভবিষ্যতে হৃদ্রোগ, টাইপ-২ ডায়াবিটিস এবং কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোটো বয়স থেকেই নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস তৈরি করা গেলে পরবর্তী জীবনে একাধিক অসংক্রামক রোগের আশঙ্কা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কমতে পারে বিভিন্ন রোগের কারণে বিশ্ব জুড়ে স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর বাড়তে থাকা চাপ। তাই কিশোর বয়সে শারীরিক সক্রিয়তা নিশ্চিত করাকে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বলে মনে করছে ‘হু’।
প্রখ্যাত গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিসের একটি বহুল প্রচলিত উক্তি রয়েছে, ‘Walking is man’s best medicine.’ অর্থাৎ, হাঁটাই মানুষের অন্যতম সেরা ওষুধ। কথাটির মধ্যে কোনো জটিল চিকিৎসাবিজ্ঞান নেই, রয়েছে জীবনযাপনের এক সহজ সত্য। সুস্থ থাকার জন্য সব সময় দামি জিম, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত হাঁটা, দৌড়নো, সাইকেল চালানো, সাঁতার কিংবা খেলাধুলোও শরীরকে সক্রিয় রাখতে পারে। কিন্তু সেই সাধারণ সুযোগটুকুও যদি দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যায়, তা হলে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়। ‘হু’-র সমীক্ষায় কিশোর ও কিশোরীদের মধ্যে শারীরিক সক্রিয়তার ব্যবধানও বিশেষ ভাবে উদ্বেগজনক। ২৮ শতাংশ কিশোরী অনেক সপ্তাহের কোনো দিনেই শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকে না। ছেলেদের ক্ষেত্রে এ হার ২২ শতাংশ। সপ্তাহের সাত দিনই শরীরচর্চা করে মাত্র ১১ শতাংশ কিশোরী। ছেলেদের ক্ষেত্রে এই হার ১৭ শতাংশ। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ ও অঞ্চলে এ ব্যবধানের প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।
উদ্বেগজনক এ পরিসংখ্যানের পিছনে রয়েছে সামাজিক বাস্তবতাও। অনেক পরিবারে মেয়েদের বাইরে খেলতে যাওয়া এখনো ছেলেদের মতো স্বাভাবিক ভাবে দেখা হয় না। নিরাপত্তার অভাব, সামাজিক বিধিনিষেধ, স্কুলে উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব, খেলাধুলোর সুযোগের অসম বণ্টন কিশোরীদের শারীরিক সক্রিয়তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শরীরচর্চার প্রশ্নটি শুধু স্বাস্থ্য সচেতনতার নয়, লিঙ্গসাম্যেরও। মেয়েদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ, ক্রীড়া পরিকাঠামো ও অবাধ চলাফেরার সুযোগ নিশ্চিত না করে এই ব্যবধান দূর করা সম্ভব নয়। ‘হু’-র ডিরেক্টর জেনারেল টেড্রস আধানম ঘেব্রেইসাস যথার্থই বলেছেন, গত ১৫ বছরে তরুণ প্রজন্মকে শারীরিক ভাবে সক্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বিশ্ব প্রায় কোনো অগ্রগতিই করতে পারেনি। তাঁর বক্তব্য, কিশোর-কিশোরীদের আরও বেশি শরীরচর্চা করতে বলাই সমাধান নয়। বরং এমন স্কুল, রাস্তা এবং সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে খেলাধুলো ও শারীরিক সক্রিয়তা নিরাপদ এবং স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
এ বক্তব্যের গুরুত্ব এখানেই যে, শরীরচর্চাকে ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় হিসাবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শহর পরিকল্পনায় খেলার মাঠ, পার্ক, হাঁটার রাস্তা কিংবা সাইকেল চলাচলের পরিসরকে অপরিহার্য হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। স্কুলে খেলাধুলোকে পড়াশোনার বাইরের কোনো অতিরিক্ত কার্যকলাপ হিসাবে না দেখে শিক্ষারই অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলতে হবে। পরীক্ষার ফলাফল কিংবা শ্রেণিকক্ষের সাফল্যের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক বিকাশের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সন্তানকে শুধু পড়াশোনায় ভালো করার প্রতিযোগিতায় ঠেলে না দিয়ে খেলাধুলো ও বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিত করানো দরকার। তবে সে দায়িত্ব পালনের জন্য অভিভাবকদেরও উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে প্রশাসনকে। একটি এলাকায় যদি খেলার মাঠ না থাকে, হাঁটার রাস্তা যদি নিরাপদ না হয়, তা হলে শিশু-কিশোরদের বাইরে বেরিয়ে সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ কতটা কার্যকর হবে?
মানুষের প্রথম সম্পদ তার স্বাস্থ্য। অথচ সেই সম্পদ রক্ষার প্রাথমিক শর্তগুলিই আজ ক্রমশ অবহেলিত হচ্ছে। উন্নয়নের মাপকাঠি যদি কেবল অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, প্রযুক্তির প্রসার কিংবা নগরায়ণের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে, তা হলে সমাজের প্রকৃত সুস্থতার ছবি অধরা থেকে যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষা তাই নিছক পরিসংখ্যানগত সতর্কবার্তা নয়। আধুনিক জীবনযাত্রার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রশ্নচিহ্ন। যে উন্নয়ন শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ থেকে সরিয়ে পর্দার সামনে বসিয়ে দেয়, যে নগরায়ণ মানুষের হাঁটার জায়গা ক্রমশ কমিয়ে আনে, যে শিক্ষাব্যবস্থা শারীরিক বিকাশের চেয়ে পরীক্ষার ফলাফলকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়, সেই উন্নয়নের ধারণা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। শরীরচর্চা বিলাসিতা নয়, বিশেষ শ্রেণির মানুষের জন্য সংরক্ষিত অভ্যাসও নয়। এটি সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত। কিশোর বয়সে যে শরীর মাঠে দৌড়বে, খেলবে, প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হবে, সে শরীরই আগামী দিনে সুস্থ সমাজ গড়ার ভিত্তি হয়ে উঠবে। তাই আগামী প্রজন্মকে আরও বেশি শরীরচর্চার উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিসর তৈরি করাই এখন রাষ্ট্র ও সমাজের প্রধান দায়িত্ব। কারণ, সুস্থ প্রজন্ম গড়ে ওঠে ওঠে স্কুলের মাঠে, পাড়ার পার্কে, নিরাপদ রাস্তায় আর প্রতিদিনের জীবনযাপনের মধ্যেই। ‘হু’-র মতে, সমস্যার সমাধান কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিক্ষা, পরিবহণ, নগর পরিকল্পনা, ক্রীড়া ও স্বাস্থ্য — প্রতিটি ক্ষেত্রকে একযোগে কাজ করতে হবে।
❤ Support Us








