Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
  • নভেম্বর ৮, ২০২৬

বহু শতাব্দীর অন্ধকার থেকে

অয়ন মুখোপাধ্যায়
বহু শতাব্দীর অন্ধকার থেকে

পর্ব ২ ♦ খড়্গ আর অম্বিকা

একটি শিশু তার মায়ের কোলে বসে আছে। আরেকজন পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে হাত বাড়াচ্ছে। সেও যেন এখুনি কোলে উঠবে। মা বাঁ হাতে কোলের শিশুটিকে ধরে আছেন। ডান হাতে আমের থোকা। মাথার ওপর আমগাছ, পদ্মের আসনের তলায় সিংহ। আরও ওপরে ছোটো করে খোদাই করা এক ধ্যানমগ্ন মানুষ। নেমিনাথ। ওড়িশার এক কারিগর ধূসর ক্লোরাইট পাথরে এই দৃশ্য খোদাই করেছিলেন আনুমানিক ১১৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। মূর্তিটি এখন লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে। দেবীর নাম অম্বিকা। সন্তানের আশায় জৈন ভক্তেরা তাঁর কাছে মানত করতেন।

অম্বিকা নামটা শুনলেই মনে পড়ে আমদের বাড়ির কাছের শহর কালনার কথা। সেখানকার সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের দরজার সাদা পাথরের ফলকের। তাতে লেখা ‘শ্রী শ্রী অম্বিকা সিদ্ধেশ্বরী মহামায়া’। ভেতরে ঢুকে প্রথমেই চোখ চলে যায় দেবীর পায়ের দিকে। সেখানে শুয়ে আছেন শিবঠাকুর। তাঁর বুকের ওপর দাঁড়িয়ে নিমকাঠের বামাকালী। কালনার মানুষ তাঁকে সিদ্ধেশ্বরী কালী বলেই চেনেন। দরজার ফলকে কালীর নামের আগে লেখা আছে ‘অম্বিকা’, লন্ডনের পাথরের মূর্তিটির সঙ্গে প্রথম মিল চোখে পড়ে দরজাতেই।

অম্বিকা ভ্রু কুঁচকেছেন। কপাল থেকে মুহূর্তে বেরিয়ে এলেন ভয়ংকর মুখের কালী। তাঁর হাতে খড়্গ আর পাশ। পাশ হলো ফাঁসওয়ালা দড়ি, যা দিয়ে কাউকে বেঁধে ফেলা যায়। চণ্ডীর এই দৃশ্যটাকে মনে রেখে আমরা যদি পুরোনো জৈন পুঁথির কাছে চলে যায় তাহলে দেখতে পাই অম্বিকার হাতেও সেই পাশ

চণ্ডীর পাতা খুললে অম্বিকা আর কালীকে একই দৃশ্যের ভেতর পাই। চণ্ড-মুণ্ডের সৈন্যেরা অস্ত্র হাতে দেবীর দিকে এগিয়ে আসছে। অম্বিকা তখন সিংহের পিঠে। সৈন্যদের দেখে তিনি রেগে উঠলেন। তাঁর মুখ কালির মতো কালো হয়ে গেল। সপ্তম অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকে পড়ি— ভ্রুকুটীকুটিলাৎ তস্যা ললাটফলকাদ্দ্রুতম্।

কালী করালবদনা বিনিষ্ক্রান্তাসিপাশিনী॥

অর্থাৎ অম্বিকা ভ্রু কুঁচকেছেন। কপাল থেকে মুহূর্তে বেরিয়ে এলেন ভয়ংকর মুখের কালী। তাঁর হাতে খড়্গ আর পাশ। পাশ হলো ফাঁসওয়ালা দড়ি, যা দিয়ে কাউকে বেঁধে ফেলা যায়। চণ্ডীর এই দৃশ্যটাকে মনে রেখে আমরা যদি পুরোনো জৈন পুঁথির কাছে চলে যায় তাহলে দেখতে পাই অম্বিকার হাতেও সেই পাশ । নেমিনাথ জৈনদের বাইশতম তীর্থংকর। জৈনরা অম্বিকাকে তাঁর সঙ্গে যুক্ত রক্ষাদেবী হিসেবে মানেন। উমাকান্ত প্রেমানন্দ শাহ জৈন পুঁথি থেকে অম্বিকার দুটি ধ্যানের বর্ণনা তুলে এনেছেন। একটিতে দেবীর গায়ের রং কালো। তিনি সিংহাসনে বসে আছেন। তিন হাতে শঙ্খ, চক্র আর পাশ। চতুর্থ হাতটি তুলে তিনি বর দিচ্ছেন। অন্য ধ্যানে দেবীর নাম আম্রকুষ্মাণ্ডিনী। তাঁর আট হাত। সেই আট হাতের দুটিতে খড়্গ আর পাশ।

শিল্প-ইতিহাসবিদ মারুতি নন্দন প্রসাদ তিওয়ারি জৈন অম্বিকার এই রূপগুলি নিয়ে লিখেছেন—‘some features of Sakti were also introduced in Jaina yakṣi Ambikā’ তিওয়ারি দশম থেকে ত্রয়োদশ শতকের পুঁথিতে এ বদলের চিহ্ন দেখেছেন। জৈন অম্বিকার রূপে শক্তি-উপাসনার কয়েকটি চিহ্ন ঢুকেছিল। কোনো ধ্যানে দেবী পাশ ধরেছেন, কোনো ধ্যানে খড়্গ। আবার তিওয়ারি দ্বাদশ শতকের কর্ণাটকে এমন এক মূর্তির কথাও বলেছেন, যেখানে চার হাতের অম্বিকা আমের থোকার সঙ্গে পাশও ধরেছেন। তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে আছে দুই ছেলে। জৈন কারিগর সেখানে একই মূর্তিতে আম আর পাশ রেখেছেন। এই একটি মূর্তিতেই দেওয়া-নেওয়ার কথাটা বেশ বোঝা যায়।

কালনার সিদ্ধেশ্বরীকেও কেউ কেউ জৈন অম্বিকার পরের রূপ বলে মনে করেন। পূর্ব বর্ধমানের সাতদেউলিয়ায় পরেশচন্দ্র দাশগুপ্ত একটি পাথরের ভাস্কর্য পান। তিনি সেটিকে জৈন অষ্টাপদতীর্থের ছবি বলে চিহ্নিত করেন। ঐতিহাসিক বীরেন্দ্রনাথ প্রসাদ আদি মধ্যযুগের পুরুলিয়ায় জৈন ও ব্রাহ্মণ্য মন্দিরের উপস্থিতি নিয়ে লিখেছেন। এই দুই সূত্র ধরে বাংলার ওই সব অঞ্চলে আমরা জৈন উপাসনার চিহ্ন পাই। কালনার সিদ্ধেশ্বরীর পুজোয় জৈন আচার টিকে আছে কি না, সে কথা বলার মতো প্রমাণ আমার হাতে নেই। মন্দিরের দরজায় ‘অম্বিকা’ নামটা তাই একটা প্রশ্নও বটে কালনার কালী কবে থেকে এই নামে পরিচিত হলেন?

মন্দিরের পুরোনো লিপি পড়তে গিয়েও দুটো সাল পাই। শ্যামল কুমার ঘোষ এর লিপিতে ১৬৬১ শক, অর্থাৎ ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দ । তাঁর মতে, বর্ধমানের রাজা চিত্রসেন রায় ওই বছর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। অনেকেই আবার ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দ কে মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো এই পুজো কবে থেকে শুরু হয়েছিল, সে খবর কিন্তু  আমরা কোনো নির্ভরযোগ্য লিপি থেকে পাই নি। বরং কালনার প্রচলিত গল্প হল, অম্বু ঋষি ঘট বসিয়ে দেবীর পুজো করতেন। নিমকাঠের মূর্তি এসেছে তার অনেক পরে। তবে ঘটের কথা এখনো কালনার মানুষ মুখে মুখে ঘোরে।

সিদ্ধেশ্বরী মন্দির থেকে বেরিয়ে রাস্তার উল্টো দিকেই সাধনকালীর মন্দির। সলিল হোড়ের বিবরণ অনুসারে, বিশ শতকের বিশের দশকের গোড়ায় সিদ্ধেশ্বরীর সেবায়েত ভূতনাথ অধিকারী এই মন্দিরটি গড়েছিলেন। পাড়ার লোক তাঁকে ভোদু ঠাকুর বলে ডাকত। গোড়ায় ছিল মাটির ঘর, মাথায় পাতার ছাউনি। পরে ভক্তেরা টাকা দিলেন। সে টাকায় মন্দিরের চেহারা বদলাল, পুজোর জলের জন্য কুয়োও খোঁড়া হলো। হোড় জানিয়েছেন, দাতাদের নাম মন্দিরের সাদা পাথরে খোদাই করা আছে। রাস্তার একদিকে পুরোনো ফলকে বর্ধমানের রাজার নাম। অন্যদিকে পাথরে নাম লিখিয়েছেন সেই সব মানুষ, যাঁদের টাকায় পাতার ছাউনি দেওয়া ঘরটা অবশেষে মন্দির হয়ে উঠল। আর শহরের লোক মোড়টার নাম রেখেছেন সিদ্ধেশ্বরী মোড়।

একই নাম দুই উপাসনায় শুনি। এক পুঁথির দেবীর হাতে যে পাশ দেখি, আরেক পুঁথির দেবীও তা হাতে তুলে নেন। এই দেওয়া-নেওয়ার কথা ভাবতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ভারততীর্থ’-এর দুটো লাইন মনে পড়ে —

‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে —

এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।’

তাই কালনার মন্দিরের দরজায় ‘অম্বিকা’ নামটার কথা ভাবলে লন্ডনের পাথরের মূর্তিটির কথা মনে পড়ে যায়, যেখানে মায়ের এক হাতে আমের থোকা। অন্যহাতে তিনি একটি শিশুকে ধরে আছেন। পায়ের কাছে যে শিশুটি হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার দিকে তাকিয়ে নজরুলের শ্যামাসংগীতের শেষ কথাটাও মনে পড়ে, ‘আদর ক’রে কোলে নিতে তুই ছাড়া বল্ আছে কে মা॥’

♦–♦•♦–♦ ♦–♦•♦–♦ ♦–♦•♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!