Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
  • নভেম্বর ৭, ২০২৬

বহু শতাব্দীর অন্ধকার থেকে

অয়ন মুখোপাধ্যায়
বহু শতাব্দীর অন্ধকার থেকে

চিত্রকর্ম : রবীন মণ্ডল । বোর্ডে অ্যাক্রেলিক এবং তেল রং । ১৯৯৪

পর্ব ১ ♦ মন্দির মিথ মানুষ

আগামীকাল কালীপুজো । ফেসবুকের কনটেন্ট নির্মাতা থেকে ইউটিউবার, সকলেই মন্দির আর পুরনো পুজো বাড়ির লোকেশন খুঁজতে ব্যস্ত । কেউ অন্য রকম প্রতিমার রিল করতে চাইছেন, কেউ খুঁজছেন কিংবদন্তি । দর্শক-পাঠকও সেই খোঁজের শরিক । তবে আজকাল ফোনে নাম লিখলেই রাস্তা বেরিয়ে পড়ে । ক্যামেরা দেবীর মুখের কাছ অব্দি পৌঁছে যায় । লাল জিভ, খোলা চুল, জবার মালা । লোকেশন সেভ । এ বছর না হলে পরের বছর । অথচ এত কাছে পৌঁছেও ইতিহাস থেকে দূরে থাকি কেন ? দার্শনিকের ভাষায়, “কিছুই স্বতঃসিদ্ধ নয়। কিছুই তৈরি অবস্থায় মেলে না । সবই নির্মাণ করতে হয় ।” সুতরাং ইতিহাস জানতে গেলে আজকের দিনে আমাদের কে সেই পুরনো প্রশ্নগুলো কি বারবার করতে হবে । ফলে ঠাকুরের কাছে যাওয়ার রাস্তা জানলেই কি তাঁকে চেনার পথ সহজ হয়ে যায় ? এর উত্তর জানা নেই ।

তবে বলাগড় ও তার পার্শ্ববর্তী কালী পুজোগুলো কে কেন্দ্র করে আমি কোন পথ খুঁজছি নাকি রাস্তা খুঁজছি, সেটাও জানা নেই । তবে সেই খোঁজার মধ্যে আছে একের মধ্যে অনেক না অনেকের মধ্যে এক সেটাও হয়তো আমি ভালো করে বলতে পারব না তবে এটা নিশ্চিত যাত্রা পথের আনন্দ গানে আমি আমি হয়তো কালী সংস্কৃতির মধ্যে এক অনন্য কে খুঁজতে চাইছি । তাই যেতে যেতে অম্বিকা কালনার অম্বিকা কালী থেকে সুখড়িয়ার আনন্দময়ী, গুপ্তিপাড়ার দেশকালী, মশালকালী, সেনবাড়ির পুজো, কালিয়াগড়ের বলয়পিঠ, মন্দিরতলা, সিদ্ধেশ্বরীতলার কথা আসবে । শুনব গল্প, মিলিয়ে দেখব ঘটনার সত্যতা। কোথায় মিথ, কোথায় ইতিহাস, কোথায় দুয়ের মেলামেশা, তা বোঝার চেষ্টা করব ।

মুণ্ডক উপনিষদে অগ্নির সাত জিহ্বার একটির নাম ‘কালী’। কিন্তু এই উল্লেখ থেকেই পরবর্তী দেবীর পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না । আনুমানিক পঞ্চম – ষষ্ঠ শতকের দেবীমাহাত্ম্যে অম্বিকার কপাল থেকে কালী বেরিয়ে চণ্ড–মুণ্ডকে বধ করেন, চামুণ্ডা নাম পান । সেই কাহিনি কিন্তু আবার তাঁর আগের সমস্ত উপাসনার খবর দেয় না । মধ্যযুগে শৈব –শাক্ত তন্ত্র ও লোকায়ত সাধনায় তাঁর নানা রূপ আছে । কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের তন্ত্রসার পূর্ববর্তী গ্রন্থ থেকে কালীর ধ্যান ও পূজাবিধি সংকলন করে; তাঁর কালনির্ণয়ে মতভেদ আছে 

ঐতিহাসিক মার্ক ব্লখ কোনো কিছুর উৎপত্তিকেই তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা ধরে নেওয়ার বিপদ সম্পর্কে আমাদের সাবধান করেছেন । সুতরাং প্রতিষ্ঠাতার নাম ও সাল জানলেই অনুসন্ধান কি ফুরোয় ? না, কখনওই তা ফুরোয় না । মন্দির, প্রতিমা ও পুজোর বয়স আলাদা হতে পারে । পরের প্রজন্ম পুরনো উপাসনার নতুন মন্দির গড়েন, আয়োজন বদলান। দলিল ও স্মৃতি মিলিয়ে সেই বদলটাকে আমাদের বুঝতে হবে ।

সুতরাং কালীর দীর্ঘ ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও এই সতর্কতা জরুরি । মুণ্ডক উপনিষদে অগ্নির সাত জিহ্বার একটির নাম ‘কালী’। কিন্তু এই উল্লেখ থেকেই পরবর্তী দেবীর পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না । আনুমানিক পঞ্চম – ষষ্ঠ শতকের দেবীমাহাত্ম্যে অম্বিকার কপাল থেকে কালী বেরিয়ে চণ্ড–মুণ্ডকে বধ করেন, চামুণ্ডা নাম পান । সেই কাহিনি কিন্তু আবার তাঁর আগের সমস্ত উপাসনার খবর দেয় না । মধ্যযুগে শৈব –শাক্ত তন্ত্র ও লোকায়ত সাধনায় তাঁর নানা রূপ আছে । কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের তন্ত্রসার পূর্ববর্তী গ্রন্থ থেকে কালীর ধ্যান ও পূজাবিধি সংকলন করে; তাঁর কালনির্ণয়ে মতভেদ আছে । অষ্টাদশ শতকে কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতা এবং রামপ্রসাদের গান বাংলায় কালীভক্তির প্রসারে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল । রামপ্রসাদের গান মা–সন্তানের সম্পর্ককে ঘন করে । উনিশ শতকে রামকৃষ্ণের সাধনা ও পরবর্তী প্রচার মাতৃভক্তিকে সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে আরও ছড়িয়ে দেয় । আজ পারিবারিক মন্দির, পাড়ার পুজো ও ফোনের পর্দায় আমরা সেই ইতিহাসের নানা রূপ দেখতে পাই ।

বৌদ্ধতন্ত্রের সঙ্গে কিছু আচার ও মূর্তির মিলও আছে । বজ্রযোগিনীর হাতেও কপালপাত্র থাকে । কিন্তু মিল মানেই কালীর বৌদ্ধ উৎপত্তির প্রমাণ নয় । অনেকে বৌদ্ধতন্ত্রে শৈব সাধনপদ্ধতি গ্রহণের সাক্ষ্য দেখিয়েছেন । আবার কেউ কেউ বৌদ্ধ তারার ধ্যানবর্ণনা শাক্ত গ্রন্থে গ্রহণের প্রমাণ দিয়েছেন । কিছু শাক্ত কাহিনিতে বশিষ্ঠ বুদ্ধের কাছে তারাসাধনা শেখেন । অনেকেই আবার এই আখ্যানের বৌদ্ধ সংযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন । তবে কাহিনিটি বাস্তব ভ্রমণের দলিল নয়। কোনও স্থানীয় মন্দিরের বৌদ্ধ অতীতের দাবি যাচাই করতে সেখানকার মূর্তি, লিপি, প্রত্নসাক্ষ্য ও প্রাসঙ্গিক পাঠ আমাদের মিলিয়ে দেখতে হবে ।

কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও গবেষণার প্রশ্ন হতে পারে । কিন্তু সেই ব্যাখ্যা কিংবা কৃষ্ণানন্দের রূপদর্শনের কিংবদন্তি দিয়ে বলাগড়ের প্রতিটি পুজোর ইতিহাস বোঝা যাবে না । চাই স্থানীয় সাক্ষ্য। ঐতিহাসিক ডি. ডি. কোসাম্বী তাঁর Myth and Reality গ্রন্থে দেবী ও লোকাচারের মধ্যে সমাজের ইতিহাস খুঁজতে শেখান । তাই প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের পাশাপাশি পুরোহিত, প্রতিমাশিল্পী, ভোগরাঁধুনি ও গ্রামবাসীর কথা আমাদের অবশ্যই শুনতে হবে। পুজোর খরচ কে জুগিয়েছেন, জমি কে দিয়েছেন, শ্রম দিয়েছেন কারা, এই সবই খুঁজব ।

মশাল শোভাযাত্রা থেকে কালীপুজোয় ডাকাতের গল্প কীভাবে জুড়ল ? পারিবারিক স্মৃতি কোথায় বারোয়ারির পুজোর সঙ্গে মিশে গেল ? রঘু ডাকাত, ডাকাতকালীর নিয়ম, পোড়া মাছের ভোগ, গান শুনে ডাকাতের মন বদলের কাহিনিও আসবে। প্রতিটি রঘুকে একই মানুষ ধরব না। গল্পের প্রমাণ যেমন খুঁজব, মানুষ কেন গল্পগুলি মনে রেখেছেন, তার কারণও আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে ।

রবীন্দ্রনাথের বাল্মীকিপ্রতিভায় দস্যুরা গায়, “কালী কালী কালী বলো রে আজ”। তারাই বালিকাকে বলি দিতে আনে; তার আর্তিতে বাল্মীকির করুণা জাগে । নাটকটি স্থানীয় ইতিহাসের কোনো প্রমাণ আমাদের দেয় না । তবে দেবীর নামে নরবলি দেওয়ার মতো মানুষের কাজকে কীভাবে বিচার করব, তা নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন তোলে । সুতরাং ডাকাতকালী ও নরবলির গল্প একসঙ্গে নিয়ে মানুষের গল্পকেই খুঁজতে হবে । তাই মার্ক ব্লখের ইতিহাসচেতনার সূত্র ধরে বলা যায়, “ইতিহাসবিদরা যেখানেই মানুষের গন্ধ পান, সেখানেই নিজের শিকার খুঁজে পান ।”

পরিশেষে বলি, ইতিহাস চর্চা করার জন্য উত্তরকে আগে পকেটে পুরে নিয়ে কোনো গ্রামে যাব না । হিসাবের খাতা দেখব, লিপি পড়ব, স্মৃতি শুনব । অমিলও রাখব । রিল থেকেই অনুসন্ধান শুরু হতে পারে । দার্শনিকের ভাষায়, “যা কিছু কখনো ঘটেছে, তার কোনো কিছুকেই ইতিহাসের জন্য হারিয়ে গেছে বলে গণ্য করা উচিত নয় ।” নামফলকের বাইরের মানুষগুলিকেও এই যাত্রায় চাই ।

ঈশোপনিষদে আছে, “হিরণ্ময়েন পাত্রেণ সত্যস্যাপিহিতং মুখম্”— সোনার পাত্র সত্যের মুখ ঢেকে রেখেছে । আধ্যাত্মিক উচ্চারণটি থেকে আবরণ সরানোর আহ্বানটুকু নিই । শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন —

মানুষের মধ্যে নেই মিলেমিশে থাকার সভ্যতা
জন্তুদের মধ্যে আছে মিলেমিশে থাকার সভ্যতা
মন্দিরের থেকে বহু শতাব্দীর অন্ধকার আজ
বেরিয়ে পড়েছে পথে, ইঁদুর ছুঁচোর মতো পথে ।

কিন্তু এই কবিতা দিয়ে আমাদের চারপাশের পুজোগুলোর আগাম কোনো বিচার করব না । বরং দেখব, পুজো মানুষকে কোথায় একত্র করেছে; কোথায় জাত, অর্থ বা পারিবারিক অধিকারের প্রশ্নে মানুষকে আলাদা করে দিয়েছে । উপনিষদের শান্তিমন্ত্র বলে, “পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং”— ওটিও পূর্ণ, এটিও পূর্ণ । ইতিহাসে আমরা সেই পূর্ণতা দাবি করতে পারি না । তবু দেবীর সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলোকে চিনে নিয়ে দেবীর আরও পূর্ণ পরিচয়ের দিকে যেতে পারি । এটাই এই যাত্রাপথের স্পিরিট । তাই আজকের সময়ের দাবি মেনে অজানাকে শূন্য ভেবে ছেড়ে দিলে বহু শতাব্দীর অন্ধকারে আমাদের নিজেদের মুখও আমাদের কাছে বড্ড অচেনা লাগবে । কারণ, পুজোর ইতিহাসে আমরা কাকে মনে রেখেছি আর কাকে ভুলেছি, সেই বাছাইয়ের মধ্যেও সমাজ হিসেবে আমাদের পরিচয় ধরা থাকে । এই সিরিজে তাই দেবীর পরিচয়ের সঙ্গে সেই স্মৃতি ও বিস্মৃতির হিসাবও খুঁজব ।

♦–♦•♦–♦ ♦–♦•♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!