Advertisement
  • দে । শ
  • নভেম্বর ৭, ২০২৬

সীমান্তে সম্প্রীতির আলো ! বাংলার কালীমন্দিরে সারা বছর বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেয় ভুটান

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সীমান্তে সম্প্রীতির আলো ! বাংলার কালীমন্দিরে সারা বছর বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেয় ভুটান

মানচিত্রে আলাদা দু–টি দেশ। মাঝখানে আন্তর্জাতিক সীমানা। অথচ ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য আর মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনে সীমান্ত যেন এখানে অর্থহীন। ভারতের মাটিতে থাকা কালীমন্দিরের আলো জ্বালিয়ে রাখতে সারা বছর বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে প্রতিবেশী দেশ ভুটান। শুধু
তা-ই নয়
, কালীপুজোর আগে মন্দিরের সংস্কার ও মেরামতির জন্য সিমেন্ট, রং-সহ প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রীও পাঠান ভুটানের বাসিন্দারা। ভারত-ভুটান সীমান্তের আলিপুরদুয়ারের মাকরাপাড়া কালীমন্দিরকে ঘিরে দু–দেশের মানুষের অনন্য এ সম্পর্ক নতুন নয়। প্রায় সাড়ে সাত দশক ধরে চলে আসছে বহমান সম্প্রীতির ধারা।

১৯৫০ সালে এ মন্দিরে প্রথম কালীপুজো হয়। মাকরাপাড়া চা-বাগানের বাসিন্দা ও ভুটানের ব্যবসায়ীদের যৌথ উদ্যোগেই শুরু হয়েছিল শ্যামাদেবীর আরাধনা। দেখতে দেখতে সে পুজো ৭৬ বছরে পা দিয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মন্দিরের পুজোর দায়িত্ব সামলাচ্ছে এক পরিবার। সীমান্তের ওপারের ভুটানের বাসিন্দারাও মন্দিরের সঙ্গে নিজেদের আত্মিক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট-বীরপাড়া ব্লকের লঙ্কাপাড়া গ্রামের মাকরাপাড়া চা-বাগানের জমিতে অবস্থিত এ মন্দির। ভারত-ভুটান সীমান্তের একেবারে ‘জিরো পয়েন্টে’। কাছেই ভুটানের গোর্মু শহর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দু–দেশের মানুষের যাতায়াত আর যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। সে সূত্রেই মাকরাপাড়া কালীমন্দির হয়ে উঠেছে সীমান্তপারের মানুষের মিলনক্ষেত্র। ভুটানের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা কয়েক দশক ধরে এখানে পুজো দিতে আসেন। নেপাল থেকেও বহু ভক্তের সমাগম হয়।

৫১ সতীপীঠের স্মরণে ৫১ সিঁড়ি। গর্ভগৃহে দেবী পূজিত হন দক্ষিণাকালিকা রূপে। কারও কাছে এ মন্দির মানত পূরণের জায়গা, কারও কাছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিশ্বাসের আশ্রয়। আবার অনেকের কাছে সীমান্তের দুই দেশের মানুষের নিবিড় সম্পর্কের জীবন্ত নিদর্শন। মন্দিরের পুরোহিত সন্দীপ চক্রবর্তী জানান, ‘৫০ সালে যখন এ পুজোর সূচনা হয়েছিল, আমার ঠাকুরদা ছিলেন মন্দিরের প্রথম পুরোহিত। এখন আমাদের পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম সে দায়িত্ব পালন করছে।’ কালীপুজোর দিন সকাল থেকেই শুরু হয় দেবীর আরাধনা। চণ্ডীপাঠ, মন্ত্রোচ্চারণ আর বিভিন্ন প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সারা রাত ধরে চলে পুজো। মন্দিরের পুজোর অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্বলন। প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে মন্দির চত্বর। দেবীর ভোগেও রয়েছে বিশেষত্ব। কালীপুজোর দিনই কেবল বোয়াল মাছ দিয়ে তৈরি বিশেষ পদ নিবেদন করা হয় দেবীকে। বছরের অন্য কোনো সময়ে এ পদ ‘ভোগ’ দেওয়া হয় না।

এক সময়ে পুজোতে পশুবলির প্রথা চালু ছিল। তবে সাত বছর আগে সে প্রথা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে এখন দেবীকে নিবেদন করা হয় এক জোড়া ডাব বা ‘জোড়া ডাব’। মন্দির কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, পশুবলির পরিবর্তে এ নিবেদনই এখন পুজোর অঙ্গ। সন্দীপ চক্রবর্তী জানান, শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে ভক্তরা এখানে আসেন। মাদারিহাট, কালচিনি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, রাঙামাটি, ধুমপাড়া, বানারহাট, নাগরাকাটা সহ অনেক জায়গা থেকে বহু মানুষ পুজো দিতে আসেন। ভুটানের পারো, থিম্পু, গেলেফু, সাৎসে থেকেও ভক্তদের সমাগম হয়। নেপালের কাঠমান্ডু ও পোখরা থেকেও অনেকে আসেন দেবীর দর্শনে।

মাকরাপাড়া কালীমন্দিরের সঙ্গে ভুটানের সম্পর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক অবশ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ। ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থিত এ মন্দিরে সারা বছর বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেয় ভুটানের গোর্মুতে অবস্থিত এক সিমেন্ট কারখানা। মন্দিরের আলো, পাখা সহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক প্রয়োজন মেটাতে ওই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। কালীপুজো ও দীপাবলির সময়ে মন্দিরে বিশেষ আলোকসজ্জার আয়োজন করা হয়। তখন বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়। প্রতিবেশী দেশের এই সহযোগিতা পুজোর আয়োজন ও মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণে বড়ো ভূমিকা নেয়। মন্দির কমিটির সভাপতি জানান, ‘প্রতি বছর মাকরাপাড়া চা-বাগান কর্তৃপক্ষের পরিচালনায় এই পুজোর আয়োজন করা হয়। পুজো উপলক্ষে মন্দির রং করা-সহ বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কালীপুজোর সময়ে মন্দিরে প্রচুর আলো ও পাখার ব্যবস্থা রাখতে হয়। ভুটান থেকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়ায় মন্দির পরিচালনার কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।’

তবে, মাকরাপাড়া কালীমন্দিরের আকর্ষণ শুধু ধর্মীয় আচার কিংবা পুজোর ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আন্তর্জাতিক সীমান্তের দু–পারে বসবাসকারী মানুষের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সহযোগিতাই এই মন্দিরকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। ভুটানের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে দেবী কালীর আরাধনা হয়তো তাঁদের নিজস্ব ধর্মাচারের অংশ নয়, কিন্তু দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও সম্পর্ক তাঁদের এই মন্দিরের সঙ্গে জুড়ে রেখেছে। উৎসবের প্রস্তুতিতে তাঁদের অংশগ্রহণও সে সম্পর্কেরই প্রতিফলন। যেখানে, দেশের সীমানা, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব — কোনো কিছুই যে মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, মাকরাপাড়া কালীমন্দির তারই এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ৭৬ বছর ধরে কাঁটাতার ছাপিয়ে যাওয়া আলোর মেলবন্ধনেই বেঁচে রয়েছে মাকরাপাড়ার ঐতিহ্য।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!