- দে । শ
- নভেম্বর ৭, ২০২৬
জম্মু-কাশ্মীরের ঐতিহ্য রক্ষায় ৩০ হাজার চিনার গাছের জিও-ট্যাগিং, তৈরি ডিজিটাল তথ্যভান্ডার
জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য বৃক্ষ চিনার উপত্যকার ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রেম, সাহিত্য, রাজনীতি ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গেও ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঋতুবদলের সাক্ষী থেকেছে এই গাছ। বসন্তে নতুন পাতার সবুজ, গ্রীষ্মে ঘন ছায়া, আর শরতে পাতার রং বদলে লালচে-সোনালি হয়ে ওঠা — চিনারকে ঘিরেই কাশ্মীরের প্রকৃতির এক নিজস্ব সৌন্দর্য। কাশ্মীরের শিল্প ও কারুশিল্পেও চিনারের বিশেষ প্রভাব লক্ষণীয়। কাগজের মণ্ডের কাজ, মৃৎশিল্প, শাল-এ সূচিকর্ম, রুপোর সামগ্রী এবং কার্পেটের নকশায় বারবার ফিরে আসে চিনারের পাতা ও অবয়ব। কিন্তু ক্রমবর্ধমান নগরায়ন, নির্মাণকাজ আর প্রাকৃতিক বাসস্থানের সংকোচনের ফলে কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষের অস্তিত্ব ক্রমশ বিপন্ন হচ্ছে। চিনারের ঐতিহাসিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনা করেই গাছগুলির অবস্থান, বয়স ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে নথিবদ্ধ করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জিও-ট্যাগিং প্রকল্পের মূল লক্ষ্য, কাশ্মীরের জীবন্ত ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত রাখা। উপত্যকা জুড়ে প্রায় ৩০ হাজার চিনার গাছের অবস্থান চিহ্নিত করে তৈরি করা হয়েছে একটি ডিজিটাল তথ্যভান্ডার। সরকারি আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাশ্মীরের ১০ হাজার গুরুত্বপূর্ণ চিনার গাছে ইতিমধ্যেই বসানো হয়েছে কিউআর কোড-যুক্ত ধাতব ফলক। শুধু চিনার নয়, জম্মু অঞ্চলের আরও সাড়ে তিন হাজার বট ও পিপল গাছকেও এ ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে বাকি চিনার, বট ও অশ্বত্থ গাছগুলির জিও-ট্যাগিংয়ের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। গাছ সংরক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালে। সে সময় থেকেই গাছগুলির অবস্থান চিহ্নিত করার পাশাপাশি প্রত্যেকটির জন্য পৃথক কিউআর কোড বরাদ্দের কাজ শুরু করে সরকার। বিশেষ স্প্রিংযুক্ত ধাতব ব্যবস্থার সাহায্যে গাছের গায়ে লাগানো হয়েছে ডিজিটাল ফলক। স্মার্টফোন দিয়ে সেই কিউআর কোড স্ক্যান করলেই সংশ্লিষ্ট গাছটির সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যাবে। কোথায় রয়েছে গাছটি, তার আনুমানিক বয়স কত, শারীরিক অবস্থা কেমন — সমস্ত তথ্যই পাওয়া যাবে ওই ডিজিটাল ব্যবস্থায়। ফলে কোনো গাছ রোগাক্রান্ত হচ্ছে কি না, তার স্বাস্থ্য কতটা খারাপ হচ্ছে কিংবা সংরক্ষণের জন্য কোথায় বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা সহজ হবে বলে মনে করছেন আধিকারিকেরা।
স্থানীয় মানুষের কাছে ‘বুইন’ নামে পরিচিত চিনার গাছের বৈজ্ঞানিক ভাবে ‘প্ল্যাটানাস ওরিয়েন্টালিস’ বা ওরিয়েন্টাল প্লেন। কাশ্মীরের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই দেখা মেলে এ গাছের। উচ্চতায় প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত বেড়ে ওঠা পূর্ণবয়স্ক চিনারের গোড়ার দিকের কাণ্ডের পরিধি হতে পারে ১০ থেকে ১৫ মিটার। পূর্ণাঙ্গ আকার ধারণ করতেও সময় লাগে প্রায় ১৫০ বছর।মনে করা হয়, পারস্য থেকে কাশ্মীরে এসেছিল চিনার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গাছ এমন ভাবে উপত্যকার ভূপ্রকৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছে যে, চিনার ছাড়া কাশ্মীরের পরিচিত দৃশ্যকল্প প্রায় অসম্পূর্ণ। কাশ্মীরের মাটিতেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন চিনার গাছগুলি। মধ্য কাশ্মীরের গান্ডেরবাল জেলায় অবস্থিত উপত্যকার বৃহত্তম চিনারটির উচ্চতা প্রায় ২৭ মিটার। তার কাণ্ডের পরিধি প্রায় ২২.২৫ মিটার, অর্থাৎ ৭৩ থেকে ৭৪ ফুট। অন্যদিকে, মধ্য কাশ্মীরের চাত্তারগাম গ্রামের একটি চিনারকে বিশ্বের প্রাচীনতম চিনার গাছগুলির অন্যতম বলে মনে করা হয়। বয়স প্রায় ৬৫০ বছর। ছয় শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আজও সবুজ পাতায় ভরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে গাছটি। প্রকৃতির প্রতিকূলতা, সময়ের পরিবর্তন এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যেও তার অস্তিত্ব টিকে থাকা বিস্ময়কর।
শ্রীনগরের মুঘল উদ্যানগুলির সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান আকর্ষণও এই চিনার। নিশাত, শালিমার-সহ উপত্যকার ঐতিহাসিক উদ্যানগুলিতে চিনারের উপস্থিতি কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক উদ্যানগুলিতে আসেন। শরতে চিনারের পাতা যখন লাল, কমলা ও সোনালি রং ধারণ করে, তখন উপত্যকার উদ্যানগুলির দৃশ্য হয়ে ওঠে আরও মনোরম। ফলে এ গাছের সংরক্ষণ শুধু পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন নয়, কাশ্মীরের ঐতিহ্য ও পর্যটনের স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালের জম্মু-কাশ্মীর নির্দিষ্ট বৃক্ষ সংরক্ষণ আইনের অধীনে চিনার গাছ সংরক্ষিত প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃত। আইন অনুযায়ী, এই গাছের ডালপালা ছাঁটার ক্ষেত্রেও সরকারি অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু আইন থাকলেই যে সব ক্ষেত্রে সংরক্ষণ নিশ্চিত করা যায়, এমন নয়। গাছের বয়স, স্বাস্থ্য, অবস্থান আর সময়ের সঙ্গে তার শারীরিক পরিবর্তনের তথ্য নিয়মিত নথিবদ্ধ না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সে জায়গা থেকেই জিও-ট্যাগিং ও কিউআর কোডের ব্যবহারকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের মতে, প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিটি গাছের পৃথক পরিচিতি তৈরি হলে সংরক্ষণের কাজে নজরদারি বাড়ানো সম্ভব হবে। আগামী প্রজন্মের কাছে কাশ্মীরের এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
এ উদ্যোগের পাশাপাশি বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপরেও জোর দিচ্ছে জম্মু-কাশ্মীর সরকার। বিশেষ করে হাঙ্গুল হরিণের অস্তিত্ব রক্ষা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশ্বের আর কোথাও এই বিশেষ প্রজাতির হরিণের অস্তিত্ব নেই। ফলে হাঙ্গুলের বিলুপ্তি মানে শুধু একটি বিরল বন্যপ্রাণের হারিয়ে যাওয়া নয়, কাশ্মীরের প্রাকৃতিক পরিচয়েরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশের অবলুপ্তি। বৃহস্পতিবার জম্মুতে প্রধান বন সংরক্ষকের (পিসিসিএফ) দফতরে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বন, পরিবেশ ও বাস্তুবিদ্যা দফতরের মন্ত্রী আলতাফ আহমদ ওয়ানিকে চিনার গাছের জিও-ট্যাগিংয়ের অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হয়। বৈঠকে জম্মু-কাশ্মীর বন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (জেকেএফআরআই) এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ দফতরের কাজকর্মও পর্যালোচনা করা হয়। বন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গবেষণার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞানই সংরক্ষণ প্রচেষ্টার মেরুদণ্ড। তবে গবেষণা কেবল নথিপত্র কিংবা গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তার সুফল পৌঁছতে হবে প্রান্তিক মানুষের কাছে। গবেষণার ফলাফল যাতে স্থানীয় মানুষের আয়বৃদ্ধির পাশাপাশি বন সংরক্ষণেও বাস্তব ভূমিকা নিতে পারে, সে জন্য বন দফতর, কৃষক এবং শিল্পক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বৈঠকে জানানো হয়, বনজ প্রজাতির গাছের বীজ সংরক্ষণের জন্য জম্মু ও শ্রীনগরে দু–টি বীজভান্ডার তৈরি করেছে ‘জেকেএফআরআই’। বীজ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে সংগৃহীত বীজ সেখানে যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি কুঠ, তিলপুষ্পী, মুশকওয়ালা এবং পুষ্করমূল-সহ একাধিক ঔষধি গাছের চাষের পদ্ধতিও তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় কৃষকদের আয়বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব কি না, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত নিয়েও বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি মানুষের জীবনরক্ষাকেও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সংঘাতপ্রবণ এলাকায় দ্রুত র্যাপিড রেসপন্স টিম মোতায়েন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সময়মতো ক্ষতিপূরণ দেওয়া, বিপজ্জনক গ্রামগুলিতে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে পঞ্চায়েতের সহযোগিতায় সচেতনতা শিবির আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে। বন সংরক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কাজের বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করার উপরেও গুরুত্ব দিচ্ছে জম্মু-কাশ্মীর সরকার।
❤ Support Us







