- খাস-কলম
- আগস্ট ২, ২০২৪
স্বতঃস্ফূর্ত বিজ্ঞান দিবস চাই
আজ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়-এর ১৬৪তম জন্মদিন । বাংলা ও বাংলার বাইরে, এদিন উনিশ শতকীয় ঘরানার প্রবাদপ্রতিম রসায়নবিদ, শিক্ষাবিদ আর শিল্পোদ্যোগীকে, তাঁর জীবনবোধ ও বিজ্ঞানতত্ত্বের ব্যবহারিক প্রাসঙ্গিকতাকে কতটা স্মরণ করা হবে, এসব তথ্য আমাদের জানা নেই । তবে আমরা এইটুকু জানি, ২ আগস্ট সন্ধ্যায় সাড়ম্বরে, কথায় গানে, গুণিজনকে সংবর্ধনা জানিয়ে একালের সামাজিকস্তরে ‘প্রায় উপেক্ষিত’ আচার্যের আমৃত্যু, ইহজাগতিক আদর্শ ও কর্মকাণ্ডের বৃত্তান্ত শোনাবে নবজাগরণ । ১৯৯৯ সাল থেকে, ২৫ বছর জুড়ে, নবজাগরণ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রকে এভাবেই ফিরে দেখছে । মোদ্দা কথা, নবজাগরণ-এর ধ্যান আর ধারণার উৎস আচার্যের স্বতঃস্ফূর্ত, সংযত ভাবাবেগ এবং সংগঠনের বিস্তারেও জড়িয়ে আছেন তিনি।
গোড়াতেই, বাঙালির সামাজিকতার আধুনিকায়নে আচার্যের অনুপস্থিতি নিয়ে আক্ষেপ করতে হচ্ছে কেন রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নজরুল ইসলাম, বিধানচন্দ্র রায়কে নিয়ে বাঙালির ইতিহাসে, বাঙালির চিন্তা ভাবনায় যে উৎসাহ দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণে, নামকরণে যে আবেগ ও যুক্তি ছড়িয়ে থাকে, দুর্ভাগ্যজনক সত্যের মতো আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের শিক্ষাজীবন, বিদেশে ও দেশে রসায়নশাস্ত্র নিয়ে তাঁর সাড়া জাগানো গবেষণা, বেঙ্গল কেমিক্যালের মতো মঙ্গলপ্রসূ প্রতিষ্ঠান স্থাপনাকে ঘিরে প্রফুল্লচন্দ্রের সমূহ স্বপ্নচারিতা এবং বাস্তব স্বপ্নের প্রয়োগ নিয়ে আমাদের নীরবতা আজ এক রুগ্মজাতির অন্যতম লক্ষণ হয়ে উঠেছে । ব্যক্তিকে পুজোর আসনে বসিয়ে তাঁকে ভুলে যাওয়া খুব সহজ । এ আসন থেকে নামিয়ে, জনস্তরের পরিসরে তাঁর ব্যক্তিত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা শুরু হলে বিস্মরণের অভ্যাস হয়তো থমকে যাবে । হয়তো আমরা বলতে শিখব, মৃত্যুর অনেক অনেক পরেও তিনি স্বপ্ন দেখাতে অভ্যস্ত, মানুষের চিন্তা ও পরিশ্রমী নিষ্ঠার বন্ধলে এখনও স্থাপত্য রচনা করছে তাঁর জাগ্রত স্মৃতি । ভাববাদের সঙ্গী যে-কোনও মনীষার চিন্তা-বিচিন্তার চাইতে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের জীবনবোধের প্রাসঙ্গিকতা, এই মুহূর্তে, বাঙালির যাপনে, সমস্ত কর্মে অধিকতর প্রয়োজন । একারণে একটি দাবি পেশ করতে ভাল লাগছে, সরকারি বেসরকারি উৎসাহে, ২ আগস্ট ‘প্রফুল্ল দিবস উদ্যাপিত হোক । এরকম আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন খুবই জরুরি ।
আজ নানাদিক থেকে বাঙালি আক্রান্ত । ছলে, কৌশলে, অপবাদে, বঞ্চনায় তার দ্বিখণ্ডিত ভুবনকে ক্রমশ ক্ষুদ্র করবার লাগাতার চেষ্টা হচ্ছে । এ চেষ্টা বিফল হবে, হতে বাধ্য, কেন না বাঙালির জাতিসত্তা যেমন স্পর্শকাতর, যেমন ভাবপ্রবণ, তেমনি মিলনের ঐক্য বাড়িয়ে তুলতে ক্ষুদ্রতর অভ্যাসের পূজারিদের গলা চেপে ধরতে জানে । এটা বাঙালির অন্তর আর বাইরের ধর্ম । ভারতবর্ষীয়তা এবং বিশ্বনাগরিকতাবোধেরও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ । এরকম বৈশিষ্ট্যের সমবেত প্রয়াসে, আপসহীনতার সমূহে বাঙালির আবহমান রুচি, রুচির তীক্ষ্ণতার চর্চায় রাজা রামমোহনবিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ, মাইকেল মধুসূদন, লালন ফকির, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম যেমন অপরিহার্য, তেমনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়-এর চিন্তা ও চিন্তার বাস্তবতা সমানভাবে প্রযোজ্য। শিল্পের নির্মাণ, বিজ্ঞানের গবেষণা, তাঁর ব্যবহারিক সত্যকে আরও বেশি কার্যকর করে তুলতে হলে, আধুনিক শিল্পের নির্মাণে, শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রফুল্লচন্দ্রের বিজ্ঞানচর্চার প্রয়োগিক দর্শনের দ্বারস্থ হতেই হবে আমাদের । কেবল বেদিতে বসিয়ে, তাঁর স্মৃতিফলক তৈরি করে, বছরে নাম-কা-ওয়াস্তে একবার তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আনুষ্ঠানিকতার ধর্ম পালিত হতে পারে । এ ধর্ম প্রাণহীন এবং কর্মহীন। কর্মের পরিধিকে সর্বদা চঞ্চল, সর্বদা নির্মাণ আর বিনির্মাণের সঙ্গী করা দরকার । এক্ষেত্রে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র অবশ্য, অতি অবশ্যই বাঙালির অন্যতম উজ্জ্বল আশ্রয় । বিজ্ঞানের পাঠ্য বইয়ে, গোটাকয়েক প্রতিষ্ঠানের নামে, বিগ্রহ স্থাপনে, কলকাতার একটি জনপথের নামকরণে কেন তিনি বন্দি হয়ে থাকবেন? তাঁর সমগ্রজীবন নিয়ে গ্রন্থিত বইয়ের সংখ্যাও কম, কেন তাঁর আত্মচরিতের পুনর্মুদ্রণ নেই? কেন তাঁর সমূহ রচনাসংগ্রহ দুষ্প্রাপ্য হয়ে থাকবে ? কেন রসায়ন নিয়ে তাঁর আলোড়ন তোলা আবিষ্কার জনসাধারণের অবগতির বাইরে থেকে যাবে ? ১৯২০ সাল পর্যন্ত, রসায়নশাস্ত্র নিয়ে ১০৭টি গবেষণাপত্র লিখেছিলেন আচার্য, এসবের সংগ্রহ এখন কোথায় ? চর্চালোকের ভেতরে না বাইরে? কেন তাঁর নামে সর্বভারতীয় মর্যাদার কোনও রাসায়নিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে উঠল না ? এসব প্রশ্ন সচরাচর ওঠে না । যদিও উঠেও থাকে, কেবল আক্ষেপে বিলীন হয়ে যায়, ঢেউ তোলে না আমাদের কর্মে ও মর্মে । এসব কারণে বলতে হল, পঠন পাঠনের বাইরে, বিস্তৃত পরিসরে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র উপেক্ষিত ।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর যে-সব বাঙালির বিত্ত আর চিত্ত ফুলেফেঁপে উঠেছিল, বৃহত্তর যশোরের, আজকের খুলনার কাঠিয়াপাড়ার রায় পরিবারও তার অন্যতম । পূর্বজ উত্তরাধিকারকে অগ্রাহ্য করে প্রফুল্লচন্দ্র আমৃত্যু অতিসাধারণের জীবনচর্যা বেছে নিয়েছিলেন । সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য, প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখাদ বিদ্যাদাতা, সামাজিক কর্মেও ছাত্রদের উৎসাহদাতা এবং ভারতের শিল্প আন্দোলনের অন্যতম এই দিশারী ব্রাহ্মসমাজ, গরিব ছাত্রছাত্রী, বিভিন্ন স্কুলকে নিয়মিত সাহায্য করতেন । তাঁর বয়স তখন ৭৫, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদ থেকে অবসর নিয়েই পনেরো বছরের বেতনের (৬০ থেকে ৭৫) সব টাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে দিয়েছিলেন । উদ্দেশ্য কী কলকাতা সায়েন্স কলেজের পঠন পাঠনের নবায়ন আর উন্নয়ন । আধা সামন্তবাদী পরিবারের সন্তান হলেও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর জাগরণ যেমন ব্যক্তিগত, তেমনি স্বদেশি বিপ্লবীদের আবেগে সঞ্চারিত। স্বদেশিদের গোপনে সাহায্য করতেন। বিদ্যাদাতা আর বিজ্ঞানীর আড়ালে তিনি ছিলেন প্রশ্নহীন বিপ্লবী, এই বিপ্লবচেতনার সাক্ষী তাঁর বিলাসিতাহীন জীবনযাপন এবং জাতিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার সরব আগ্রহ। সমাজের নানারকম সংস্কারে, বিজ্ঞান চিন্তার প্রসারে প্রফুল্লচন্দ্র চিরপ্রফুল্ল হয়ে থাকবেন। অনিঃশেষ তাঁর পদাঙ্ক। নিঃসময়ের যাত্রায় তিনি মৃত্যুহীন, অক্লান্ত পথিক।
❤ Support Us








