- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ২৬, ২০২৬
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ আতঙ্ক! অনুপ্রবেশ রুখতে কড়া অবস্থানে রাজ্য, আইনি সুরক্ষার দাবিতে সরব বিরোধীরা
মালদহ, মুর্শিদাবাদে ‘হোল্ডিং সেন্টার’কে ঘিরে যে আতঙ্কের সূচনা হয়েছে, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি সীমান্তবর্তী জেলায়। সরকারি নথিতে এর নাম ‘হোল্ডিং সেন্টার’ হলেও বিরোধীদের অভিযোগ, কার্যত এটি ডিটেনশন ক্যাম্প। অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে ধৃত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিকদের এখানেই রাখা হবে, তারপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকা মেনে শুরু হবে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই সীমান্ত জেলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক, গুঞ্জন এবং অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম বাদ যাওয়া এবং বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ এখন চরমে। রাজ্য সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির বাস্তবায়ন শুরু হতেই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রশাসনিক নজরদারি বেড়েছে কয়েক গুণ। আর সে সঙ্গে রাজনৈতিক তরজা পৌঁছেছে চরমে।
রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য দফতর ইতিমধ্যেই সমস্ত জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে, সন্দেহভাজন অবৈধ বিদেশি ও মুক্তিপ্রাপ্ত বিদেশি বন্দিদের রাখার জন্য পৃথক ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরি করতে হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গাইডলাইন মেনেই এ পদক্ষেপ বলে জানানো হয়েছে। সরকারি নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত কেন্দ্রগুলিতে রাখা হবে। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, রাজ্যের ২৩টি জেলাতেই ধাপে ধাপে এই ধরনের হোল্ডিং সেন্টার গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রথম দফায় মালদহ ও মুর্শিদাবাদে এ কেন্দ্র চালু হয়েছে। সরকারি সূত্রের দাবি, ইতিমধ্যেই সেখানে ১২ জন সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিককে রাখা হয়েছে। মালদহের কেন্দ্রটিতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসিটিভি নজরদারি, পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ার মোতায়েন করা হয়েছে। ৩ মহিলা ও কয়েক জন নাবালককেও সেখানে রাখা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে মুর্শিদাবাদ। কারণ বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যায় এই জেলা রাজ্যে শীর্ষে। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি নাম খতিয়ে দেখা হচ্ছে মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও উত্তর ২৪ পরগনায়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদেই ১১ লক্ষের বেশি ভোটার বিচারাধীন তালিকায় রয়েছেন। মালদহে সেই সংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ। উত্তর ২৪ পরগনায় প্রায় ৬ লক্ষ ভোটারের নথি যাচাইয়ের আওতায় এসেছে। রাজ্যে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির কাজ শুরু হতেই বনগাঁ, বাগদা, গাইঘাটা, স্বরূপনগর— উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। বিজেপির প্রতিশ্রুত সিএএ কার্যকর হলেও বাস্তবে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা কতটা মিলবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার অবশ্য বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেই তুলে ধরছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসনিক বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ বহু বছর ধরে চলেছে এবং এবার তা রুখতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ঘোষিত নীতি— ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ অর্থাৎ অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে শনাক্ত করা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং শেষে প্রত্যাবাসন। রাজ্য প্রশাসনের একাংশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভুয়ো নথি তৈরি, বেআইনি বসতি এবং ভোটার তালিকায় অনুপ্রবেশকারীদের নাম তোলার অভিযোগ ছিল। এবার সে সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতেও সক্রিয় হয়েছে সরকার। নবান্নে বিএসএফের ডিজি এবং রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তাদের বৈঠকে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দ্রুত সম্পূর্ণ করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও কোচবিহারের একাধিক এলাকায় এখনও সীমান্ত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত নয় বলে প্রশাসনিক রিপোর্টে উঠে এসেছে। সীমান্ত লাগোয়া নদী অঞ্চল এবং চর এলাকাগুলিকেও ‘সংবেদনশীল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু সীমান্ত নয়, রেলস্টেশনগুলিতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। শিয়ালদহ-লালগোলা, মালদহ টাউন, রানাঘাট, বনগাঁ এবং নিউ জলপাইগুড়ি রুটে বিশেষ তল্লাশি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেল পুলিশ, বিএসএফ এবং জেলা পুলিশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে। কয়েকটি জেলায় ইতিমধ্যেই সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেফতার হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত থেকেও সম্প্রতি ৪ বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ ঘিরে মানবাধিকার প্রশ্নও সামনে আসছে। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রশাসনিক অভিযানের আড়ালে সংখ্যালঘু ও দরিদ্র মানুষকে নিশানা করা হতে পারে। প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্য, ‘কাউকে বিদেশি ঘোষণা করার আগে পূর্ণাঙ্গ আইনি প্রক্রিয়া জরুরি। প্রতিটি ব্লকে অ্যাপিল ট্রাইব্যুনাল থাকা উচিত।’ তাঁর দাবি, ‘আমরাও চাই অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ হোক। কিন্তু আইনের শাসন না মেনে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবেই।’ একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন পুলিশি পরিকাঠামো নিয়েও। তাঁর অভিযোগ , ‘রাজ্যে লক্ষ লক্ষ পুলিশ পদ খালি। সিভিক ভলান্টিয়ার দিয়ে প্রশাসন চলছে। এত বড় অভিযানে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত বাহিনী কোথায়?”
তৃণমূলও অভিযোগ করছে, আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটানো হচ্ছে। বহরমপুর-মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলার তৃণমূল সভাপতি অপূর্ব সরকার অভিযোগ করেছেন, ‘রাতারাতি ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করে মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে। হোল্ডিং সেন্টার নাম দেওয়া হলেও এর অপব্যবহারের সম্ভাবনা প্রবল। যাদের বাংলাদেশি বলা হচ্ছে, তারা আদৌ বাংলাদেশের নাগরিক কি না, তা আদালতের মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত।’ আইনজীবীদের একাংশের মতে, শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে আটক বা ডিপোর্ট করার চেষ্টা হলে তাতে সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন উঠতে পারে। নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল, আদালত এবং নথি যাচাইয়ের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অসমের এনআরসি-পরবর্তী অভিজ্ঞতার কারণেই বাংলার সীমান্ত জেলাগুলিতে এখন উদ্বেগ আরও বেশি।
এরই মধ্যে সীমান্তবর্তী গ্রামাঞ্চলে দেখা যাচ্ছে অস্থিরতার ছবি। বহু পরিবার পুরনো ভোটার কার্ড, জমির দলিল, স্কুলের সার্টিফিকেট, রেশন কার্ড, আধার— সব নথি নতুন করে গুছিয়ে রাখছে। আইনজীবীদের চেম্বারে ভিড় বাড়ছে। কোথাও আবার দালালচক্র সক্রিয় হয়ে ভুয়ো নাগরিকত্বের আশ্বাস দিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠছে।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নাগরিকত্ব, অনুপ্রবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা ইস্যুই আগামী দিনে বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে।
❤ Support Us





