- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৫
ভারত-মার্কিন শুল্কযুদ্ধে কূটনৈতিক সূক্ষ্মতা অবলম্বনের পরামর্শ অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ-এর
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও বৈদেশিক অবস্থান ঘিরে বিতর্ক তীব্রতর হচ্ছে খোদ মার্কিন মুলুকেই। শুল্কনীতি নিয়ে ফের লড়াইয়ে নামছেন আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। এবার লক্ষ্য—দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ভারত-সহ বহু দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়া একাধিক বাণিজ্যিক শুল্ক ইতিমধ্যেই খারিজ করেছে আমেরিকার নিম্ন আদালত। এবার সে রায়কে আমেরিকার সুপ্রিম আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত ট্রাম্প শিবির।
এ আবহে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুল্কনীতিকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের আইনি লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে, বরাবরের মতো তাঁর উত্তর ছিল সংযত কিন্তু স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমি খুব একটা নিশ্চিত নই যে, আমেরিকার শীর্ষ আদালত প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করবে। তারা সাধারণত নির্বাহী সিদ্ধান্তগুলিকে যথেষ্ট সম্মান দেয়।’ তিনি জানান, অতীতেও দেখা গিয়েছে, ট্রাম্প যখনই কোনো পথে বাধা পেয়েছেন, তখনই তিনি বিকল্প রাস্তা খুঁজে নিয়ে নিজের মত কার্যকর করেছেন। তাই কেবলমাত্র আদালতের উপর নির্ভর করে ট্রাম্পের শুল্কনীতি পাল্টে যাবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। তাঁর মতে, ট্রাম্প নিজে যদি সেই নীতি পরিবর্তন করতে না চান, তাহলে অন্য কোনো মাধ্যমের চাপে তা খুব একটা বদলাবে না।
সম্প্রতি তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের একসাথে ছবি দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্ফোরক মন্তব্য করে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ভারত ও রাশিয়াকে হয়তো আমরা চিনের গভীর, অন্ধকার অঞ্চলে হারিয়ে ফেলেছি।’ ট্রাম্পের এহেন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণ, এ ধরনের মন্তব্য যতই চমকপ্রদ হোক না কেন, তার বাস্তবিক প্রভাব সরাসরি বাণিজ্যের উপর পড়বে না। কারণ ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের চরিত্র একেবারেই আলাদা। ভারত চট করে চিনের জায়গা নিতে পারবে না, আবার মার্কিন বাজার থেকেও সহজে সরতে পারবে না। তাই সব দিক বজায় রাখাও ততটাই কঠিন। তবে এই পরিস্থিতিকে ভারতের পক্ষে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবেও দেখছেন অভিজিৎ। তিনি বলেন, ভারত যদি চিন নির্ভরতাকে কিছুটা ছাঁটতে চায়, তা হলে আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বা আরসিইপি—এ যোগ দেওয়ার কথা ফের চিন্তা করা যেতে পারে। যদিও ভারতের বাণিজ্য জোটে প্রবেশ নিয়ে শুরু থেকেই সংশয় ছিল, তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে। আরসিইপি-এ যেমন চিন রয়েছে, তেমনই আছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজ়িল্যান্ডের মতো শক্তিশালী বাণিজ্যসঙ্গী। এ জোটে যোগ দিলে ভারতের ওপর চিনের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পাবে বলেই মনে করেন তিনি।
ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েন নিয়ে নিয়ে অভিজিৎ অকপট। তাঁর জবাব—‘এই অচলাবস্থা ভাঙার কোনো সহজ সমাধান আমার জানা নেই।’ সংবাদমাধ্যমে একটি তত্ত্ব ঘুরপাক খাচ্ছে যে, মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের সময় ট্রাম্প ‘মধ্যস্থতা’ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভারত ওই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। ফলে ট্রাম্প নাখোশ। যদি সেটাই সত্যি হয়, তাহলে কূটনৈতিক পন্থায় তার খুব বেশি সমাধান সম্ভব নয়। আর যদি সেটি গুজবও হয়, তাহলেও এমন অস্বস্তিকর অবস্থান থেকে ভারত সহজে বেরোতে পারবে না। টানাপোড়েন কাটাতে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও ট্রাম্পের মধ্যে সরাসরি ফোন সংযোগের সম্ভাবনা নিয়েও মত প্রকাশ করেন অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘আমার মতে, সব সময়ই যোগাযোগের রাস্তা খোলা রাখা উচিত। ফোন না করার মতো কোনো কারণ নেই। কিন্তু ফোন করলে পরিস্থিতি সহজ হবে, না আরও জটিল হবে, সেটাই আসল প্রশ্ন।’ তাঁর আশঙ্কা, ফোনকলে যদি ট্রাম্প ফের ‘শান্তি স্থাপন’-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন, এবং ভারতকে আবার সেই আলোচনায় টেনে আনতে চান, তা হলে দিল্লির পক্ষে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। সম্ভবত সে কারণেই ভারত সরকার এ মুহূর্তে কোনোরকম হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না।
সব মিলিয়ে, নোবেলজয়ী অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা একটাই, শান্ত মাথায় পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা দরকার। বাণিজ্য নীতি বা কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, প্রয়োজন কৌশলী পরিকল্পনা। একদিকে ট্রাম্পের অনমনীয় মনোভাব, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চিনের আধিপত্য, এই দুইয়ের মাঝখানে ভারসাম্য রেখে চলাই এখন ভারতের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ।
❤ Support Us







