- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ৬, ২০২৬
রাজ্যে ভোটপরবর্তী হিংসায় বলি অন্তত ৪, ভাঙচুর-দখলে উত্তপ্ত রাজ্য। দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারের নির্দেশ কমিশনের, কড়া বার্তা বিজেপির
বিধানসভা ভোটের ফলাফলে তৃণমূলের পরাজয় হয়েছে, অভূতপূর্ব জয়ে নতুন সরকার গঠনের পথে বিজেপি। আর এর সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভোটপরবর্তী হিংসার ঘটনা। পাহাড় থেকে সমতল, পূর্ব থেকে পশ্চিম উত্তেজনা সর্বত্র। একাধিক জেলা থেকে খুন, বাড়িঘর ভাঙচুর, দলীয় কার্যালয় দখল, হামলা, মারধর, এলাকা ছাড়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। বুধবার সকালের মধ্যে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ৪ জনের খুনের ঘটনায় রাজনৈতিক পারদ চড়েছে আরও।
এ আবহে কড়া হুঁশিয়ারি দিল নির্বাচন কমিশন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়ে দিয়েছেন, ভোট-পরবর্তী হিংসা কোনো ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। অশান্তির ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রশাসনকে। একই সঙ্গে রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষকর্তাদের প্রতি কড়া সতর্কবার্তাও পাঠানো হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যসচিব, পুলিশ মহাপরিচালক, কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর ডিরেক্টর জেনারেলকে সর্বক্ষণ পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে বলা হয়েছে। জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এলাকাভিত্তিক ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালিয়ে দ্রুত শান্তি ফেরানোর।
প্রথম দিকে উত্তেজনা সীমাবদ্ধ ছিল দলীয় কার্যালয় দখল, পতাকা বদল, ভাঙচুর, মারধর এবং কর্মীদের এলাকা ছাড়া করানোর মধ্যে। কিন্তু সোমবার গভীর রাত থেকে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত পরিস্থিতি অন্য মাত্রা নেয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার রাতে বেলেঘাটা বিধানসভার নারকেলডাঙা এলাকায় তৃণমূলের এক বুথ এজেন্টের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। সেখানে বিশ্বজিৎ পট্টনায়েক (৩৮) নামে ওই কর্মীকে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃতের পরিবারের অভিযোগ, বিজেপি-আশ্রিত দুষ্কৃতীরাই এই হামলার সঙ্গে জড়িত। বিজেপি অবশ্য অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে, মঙ্গলবার সকালে হাওড়ার মানশ্রীর রামচক গ্রামে যাদব বর (৪৫) নামে এক বিজেপি সমর্থককে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি বিজেপির জয়ের আনন্দে আবির খেলায় অংশ নিয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। ঘটনাটি ঘটেছে উদয়নারায়নপুর বিধানসভার দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৪৮ নম্বর বুথ এলাকায়। বিজেপি অভিযোগের আঙুল তুলেছে তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ দুষ্কৃতীদের দিকে। পুলিশ খুনের মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই এক জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে নিউটাউনের বালিগড়ি এলাকায় ফের উত্তেজনা ছড়ায়। সেখানে মধু মণ্ডল (৪৪) নামে এক বিজেপি কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়। বিজেপির অভিযোগ, তাঁকে রাস্তায় ঘিরে ধরে মারধর করা হয়। ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। সে আঘাতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত তৃণমূল কর্মীর বাড়ি ঘেরাও করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। একই দিন বিকেলে বীরভূমের নানুরের সন্তোষপুর গ্রামে কুপিয়ে খুন করা হয় আবির শেখ (৪৫)-কে। তিনি স্থানীয় আইএনটিটিইউসি-র অঞ্চল সভাপতি ছিলেন। হামলায় গুরুতর জখম হয়েছেন চাঁদু শেখ নামে আরও এক ব্যক্তি। মৃতের পরিবারের দাবি, বিজেপি-আশ্রিত দুষ্কৃতীরাই এই হামলার পিছনে রয়েছে। বিজেপি অবশ্য বলছে, স্থানীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরেই এই মৃত্যু। এখানেই শেষ নয়, বেলেঘাটায় এক তৃণমূল কর্মীর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয়েছে তাঁর বাড়ির সামনে থেকে।
ফলপ্রকাশের ২ দিন পরেও রাজ্যজুড়ে অশান্তি অব্যাহত। মঙ্গলবার রাতে আসানসোল কোর্ট মোড়ে তৃণমূলের একটি দলীয় কার্যালয়ে আগুন লাগানোর ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পাশের একটি কেকের দোকানেও। পাশাপাশি রূপনারায়ণপুর টোল প্লাজা, কুমারপুর, কুলটি, রানিগঞ্জ, জামুড়িয়া, বারাবনি এবং বার্নপুরে তৃণমূলের একাধিক দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। কয়েকটি জায়গায় দলীয় কার্যালয় গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। বিজেপি এই অভিযোগের দায় নেয়নি। নির্বাচনের ফলের দিন থেকেই নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কেরা দাবি করে আসছেন, ঘটনাগুলির সঙ্গে দলের কোনো কর্মী জড়িত নন। তাঁদের বক্তব্য, কিছু দুষ্কৃতী বিজেপির নাম ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃত ভাবে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে। ডোমকলেও নতুন অভিযোগ উঠেছে। সেখানে এক সিপিএম কর্মীকে গলায় গুলি করার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় স্তরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার উত্তর ২৪ পরগনার ন্যাজাটেও সংঘর্ষ নতুন মাত্রা নেয়। দুই দলের সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান ন্যাজাট থানার ওসি ভরত প্রসূন কর। অভিযোগ, একটি বাড়ির ভিতর থেকে আচমকা গুলি চালানো হয়। গুলি লাগে ওসি-র পায়ে। আহত হন আরও এক কনস্টেবলও। পুলিশ সূত্রে খবর, ২ জনকেই কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ শহরবাসীর উদ্দেশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ভোট শান্তিপূর্ণ এবং অবাধ হয়েছে। এখন শান্তি বজায় রাখতে হবে। কেউ গুজবে কান দেবেন না।’ একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিজয়মিছিল করতে হলে আগাম অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া কোনও মিছিল করা যাবে না। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন পুলিশ কমিশনার। তিনি জানিয়েছেন, জেসিবি নিয়ে কোনও মিছিল করা যাবে না। কোনও জেসিবি মালিক রাজনৈতিক মিছিলে গাড়ি ভাড়া দিলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের আশঙ্কা, এই ধরনের ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে উত্তেজনা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। সিপি জানিয়েছেন, বর্তমানে কলকাতায় ৬৫ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। হিংসা বা ভয়ের বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা হলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে উপযুক্ত পদক্ষেপ করবে পুলিশ। তিনি আরও জানান, এখনও পর্যন্ত ৮০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। পুলিশের কর্তব্যে গাফিলতি প্রমাণিত হলেও বিভাগীয় স্তরে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে প্রবল তরজা। তৃণমূলের অভিযোগ, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিজেপি-সমর্থিত দুষ্কৃতীরাই একাধিক জায়গায় হামলা, ভাঙচুর ও দলীয় কার্যালয় দখলের ঘটনায় জড়িত। বিজেপি সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পাল্টা দাবি করেছে, তৃণমূলের পরাজয়ের পরে তাদেরই একাংশ বিজেপির পতাকা হাতে অন্য গোষ্ঠীর উপর হামলা চালাচ্ছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালার কাছে আবেদন জানিয়েছেন, প্রশাসন যেন কোনো রাজনৈতিক রং না দেখে নিরপেক্ষ ভাবে পদক্ষেপ করে। তিনি আরও জানিয়েছেন, বিজেপির কোনও কর্মী হিংসায় জড়িত প্রমাণিত হলে দল তাকে বহিষ্কার করবে। একই সঙ্গে সদ্য তৃণমূল থেকে নিজেদের বিজেপি বলে দাবি করা কিছু ব্যক্তিকে নিয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। তবে অস্থির সময়ের মধ্যেও ভিন্ন ছবিও সামনে এসেছে। রাজ্যের কয়েকটি এলাকায় বিজেপির জয়ী প্রার্থীরা গিয়ে তৃণমূল কর্মীদের আশ্বস্ত করেছেন বলে খবর। কোথাও কোথাও তাঁরা নিরাপত্তার বার্তাও দিয়েছেন। তবে সেই বিচ্ছিন্ন ছবির আড়ালেই সামগ্রিক ভাবে অশান্তির ছায়া ঘন হয়েছে।
❤ Support Us






