- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- নভেম্বর ১৯, ২০২৫
‘এসআইআর’-এর চাপে দিশেহারা বুথ লেভেল কর্মকর্তারা, বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৩, রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ। ‘অপরিকল্পিত পদক্ষেপ’, কমিশনের সমালোচনা মুখ্যমন্ত্রীর
কেরালা, রাজস্থান ও পশ্চিমবঙ্গ, বিভিন্ন রাজ্যে চলমান ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন ঘিরে ভোটারদের পাশাপাশি চাপ বাড়ছে বুথ-স্তরের কর্মকর্তাদের উপরেও। অতিরিক্ত কাজের চাপ ও দীর্ঘসময় ধরে কাজ করবার পরিস্থিতিতে বাড়ছে আত্মহত্যা ও মৃত্যুর ঘটনা। পশ্চিমবঙ্গে কয়েকদিন আগেই পূর্ব-বর্ধমানের এক বিএলও মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যান। মৃত্যু ঘিরে শুরু হয় প্রবল রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত। এরই মধ্যে জলপাইগুড়িতে একজন মহিলা বিএলও-র ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হওয়ায় আবার তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
জয়পুরের সরকারি স্কুল শিক্ষক ও বিএলও মুকেশ জাংগিদ (৪৫) রবিবার ট্রেনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হন। তাঁর পরিবারের দাবি, ব্যাপক কাজের চাপ ও এসআইআর-এর লক্ষ্য পূরণের জন্য তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তিনি দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ করতেন। আত্মহত্যার নোটে মুকেশ উল্লেখ করেছেন, রাতের ঘুম হারানোর পাশাপাশি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। কেরালার কন্নুরেও আনিশ জর্জ নামের এক স্কুলে অফিস অ্যাটেন্ডেন্টের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবার বলেছে, আনিশ রাতভর কাজ করতেন। যদিও কন্নুর জেলা প্রশাসন বলছে, তাঁর মাত্র ২২.৫৪% কাজ বাকি ছিল। ‘এসআইআর’-এর সঙ্গে মৃত্যুর সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়, বিএলও এবং সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলো ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার স্থগিতকরণ দাবিতে বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি শুরু করেছে।
বাংলাতে ‘এসআইআর’ ঘিরে মৃত্যুমিছিল অব্যাহত, গত সপ্তাহে পূর্ব বর্ধমান জেলার বিএলও নামিতা হংসদা মস্তিষ্কে স্ট্রোকের শিকার হয়ে মারা যান। তিনি ছিলেন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, পাশাপাশি বিএলও-এ কাজের দায়িত্ব বর্তে ছিল তাঁর উপর। পরিবারের দাবি, বাড়ি বাড়ি ফর্ম বিতরণের অতিরিক্ত চাপের কারণে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। বিএলও ফোরাম ৫০ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। এর ইমধ্যে আজ, বুধবার সকালে জলপাইগুড়ির মালবাজার এলাকায় বাড়ির উঠোন থেকে মহিলা বিএলও শান্তিমুনি এক্কা-এর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁকে তড়িঘড়ি হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। শান্তিমুনিও মূলত অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ছিলেন। তিনি বাংলা লিখতে-পড়তে পারতেন না। পরিবার সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রতিদিনের কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি বাড়ি ফিরে প্রায়শই মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন। শান্তিমুনি মালবাজার ব্লক প্রশাসনের কাছে কাজ থেকে অব্যাহতিও চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর অনুরোধ গ্রাহ্য হয়নি। পরিবারের দাবি, ‘এসআইআর’ সংক্রান্ত কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন। রাজ্যের আদিবাসী কল্যাণ বিভাগের মন্ত্রী ও মালবাজারের বিধায়ক বুলুচিক বড়াইক মৃতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে বলেন, ‘এসআইআর আতঙ্কে অনেক ভোটার আত্মঘাতী হয়েছেন। আজ একটি সুখী পরিবার নষ্ট হলো। এর দায় নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে।’ পুলিশ ইতিমধ্যেই অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে।
প্রসঙ্গত, ৪ নভেম্বর শুরু হওয়া ১২টি রাজ্যের ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ায় বিএলওদের কাজ হলো ভোটারদের মধ্যে এনারুমারেশন ফর্ম বিতরণ, সংগ্রহ এবং ডিজিটাল রেকর্ডে সংরক্ষণ। এক বুথে প্রায় ১,০০০-১,২০০ ভোটার থাকায় একজন বিএলওকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। পাশাপাশি ফর্ম ঠিকমতো জমা না হওয়া পর্যন্ত তিন-চারবার করে ভোটারদের কাছে যেতে হচ্ছে তাঁদের। এই বুথ লেভেল অফিসাররা মূলত সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে স্কুলশিক্ষক। নির্বাচন প্রক্রিয়ার কাজ তাদের মূল দায়িত্বের বাইরে। বিভিন্ন রাজ্যের বিএলও ফোরাম ও বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নগুলি এই তীব্র চাপের কারণে কাজ বর্জনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াটির পুনর্বিবেচনার দাবী তুলেছে। তামিলনাড়ুর ‘ফেডারেশন অব অ্যাসোসিয়েশনস অব রেভিনিউ এমপ্লয়িজ’ জানিয়েছে, তাঁরা ১৮ নভেম্বর থেকে রাজ্যব্যাপী ‘এসআইআর’ কর্মসূচি বর্জনের ঘোষণা দিচ্ছে। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে বুথ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপর চাপ কমানো হোক, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক, অতিরিক্ত কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হোক এবং এক মাসের বেতনের সমমূল্যের সম্মানী দেওয়া হোক।
রাজ্যে এসআইআর কে ঘিরে নাগরিক এবং বিএলও কর্মীদের একের পর এক মৃ্ত্যুতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী । সমাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, এসআইআর করার ক্ষেত্রে তিন বছরের করার কাজ দুমাসে বিএলওদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে কমিশন । বিএলওদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ছে । অবিলম্বে এই অপরিকল্পিত অভিযান বন্ধ করা আহ্বান জানিয়েছেন তিনি ।
❤ Support Us






