Advertisement
  • খাস-কলম প্রচ্ছদ রচনা
  • মে ১৬, ২০২২

কাশ্মীরে মেকি জাতীয়তাবাদের নিম্নচাপ

শরণার্থী শিবিরে জঙ্গিদের হুমকি চিঠি। গোয়েন্দা নজরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।ভোটের দিকে তাকিয়েই ওমরের সীমান্ত সফর। বারান্দা থেকে ময়দানে, অঙ্কে ব্যস্ত সব দল।

লালন বাহার
কাশ্মীরে মেকি জাতীয়তাবাদের নিম্নচাপ

গ্রাফিক্স: টিম আরম্ভ

ঝিলাম উপত্যকার নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমশই বাড়ছে উদ্বেগ। একদিকে বদগামে জঙ্গিদের হাতে সরকারি কর্মচারি, কাশ্মীরি পন্ডিত রাহুল ভাটের মৃত্যুকে ঘিরে উত্তাল শ্রীনগর, নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় বিক্ষোভে সামিল কাশ্মীরি পন্ডিতরা । নাগরিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে, লেফ্টানেন্ট গভর্ণর প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিতেই কাশ্মীরি পন্ডিতদের শরণার্থী শিবিরে উড়ে এল হুমকি চিঠি । লস্কর-ই-ইসলামের সরাসরি ঘোষণা, নিরাপত্তার নামে উগ্র হিন্দুত্ববাদকে আশকারা দিলেই, উপত্যকায় জঙ্গি বেয়নেটের নিশানা হবেন শরণার্থী আর আরএসএস কর্মীরা ।

জনপ্রিয় অধ্যাপক কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক মুহাম্মদ হুসেন পন্ডিতকে বহিষ্কার করায় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ক্রমশই ক্রমশই পূঞ্জিভুত হচ্ছে ক্ষোভ। গত শুক্রবার, পন্ডিত সহ একজন পুলিশ কনস্টেবল এবং স্কুল শিক্ষককে বহিষ্কার করার নির্দেশ দিয়েছেন জম্মু কাশ্মীরের লেফ্টানেন্ট গভর্ণর মনোজ সিনহা । কেন্দ্রীয় সরকারের তদন্তকারী দলের গোপন রিপোর্টের ভিত্তিতে, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এঁরা রাষ্ট্রবিরোধী, স্বাধীন কাশ্মীরের দাবিতে যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁদের মদত দিচ্ছেন ।

আগামী মাসের শেষ দিকে উত্তর ভারতে, অমরনাথ যাত্রাকে ঘিরে শুরু হবে পুর্ণার্থীদের জমায়েত। তারপরেই, সম্ভবত অক্টোবরে ঝিলাম তীরে বিধানসভার নির্বাচন । এই পরিসরেই কি উপত্যকার পরিবেশ অশান্ত করে নিজেদের রাজনৈতিক সমীকরণের সাফল্য সুনিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর সব পক্ষ?

ন্যাশেনাল কনফারেন্সের প্রেসিডেন্ট ওমর আবদুল্লা এই মুহুর্তে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু কাশ্মীরের পুঞ্চ এলাকায় সফররত। ইতিমধ্যেই বিধানসভা এবং লোকসভা কেন্দ্রের ভৌগলিক সীমানা রদল বদলের যে সুপারিশ করেছিল ডিলিমিটেশন কমিটি, তাতে শিলমোহর দিয়েছেন অমিত-মোদি জুটি । তাই নির্বাচনের আগে, নতুন করে জনসমর্থনের অঙ্ক কষতে, রাজনৈতিক ময়দানে নেমেছে ন্যাশেনাল কনফারেন্স, পিডিপি সহ উপত্যকার সবকটি রাজনৈতিক দল ।ওমর আবদুল্লা পির পাঞ্জল, পুঞ্চ এবং রাজওরি জেলায় সফর করছেন । রবিবার এনসি প্রেসিডেন্ট সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, মোদি সরকারের মাথায় রাখা উচিত, কাশ্মীরের ভারতভূক্তির বিষয়টির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল রাষ্ট্রপূঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে, সে চুক্তি অনুযায়ী কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কখনো স্থায়ী হতে পারেনা । এটা কেন্দ্রের একপেশে সিদ্ধান্ত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়, জনমতকে গুরুত্ব না দিয়ে মোদি সরকার এই কাজ করেছেন, এবিষয়ে গণভোট করার প্রস্তাবকেও আমল দেননি। তিনি বলেছেন, গ্রীষ্ম অবকাশের পরই দেশের প্রধান বিচারপতি এই বিষয়ে শুনানির আবেদন খতিয়ে দেখবেন বলে অশ্বাস দিয়েছেন। প্রসঙ্গত, এই বিশেষ ধারা ফিরিয়ে আনার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে ইতিমধ্যেই একডজনেরও বেশি মামলা হয়েছে । ন্যাশেনাল কনফারেন্সের সদস্য, লোকসভার দুই প্রতিনিধি মহম্মদ আকবর লোন এবং হাসনিন মাসুদিও কেন্দ্রীয় সরকারের ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিরোধিতা করে মামলা করেছেন ।

কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের পর থেকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা নজরদারি চালাচ্ছে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের ওপর । সম্প্রতি তাদেরই প্রকাশিত এক রিপোর্টের দাবি, কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের একাংশ সরাসরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদত দিচ্ছেন। এই অভিযোগে,কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক এবং শিক্ষাকর্মীদের বহিষ্কারে সিদ্ধান্তে ফুঁসছে কাশ্মীরের ছাত্রসমাজ । অধ্যাপক মুহাম্মদ হুসেন পন্ডিতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানপন্থী প্রাক্তন হুরিয়াত নেতা আলি শাহ গিলানির ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল । পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে, আজাদির স্লোগানকে মুখরিত করতেও তাঁর নাকি প্রত্যক্ষ মদত আছে। রাজ্যের লেফ্টানেন্ট গভর্ণর মনোজ সিনহা রিপোর্ট খতিয়ে দেখেই তিন সরকারি কর্মচারীদের তাদের কাজ থেকে বহিষ্কার করেছেন।

শুধু জনপ্রিয়, গুণী অধ্যাপক হুসেনেই নন, কাশ্মীরি শিক্ষক সংগঠনের (কুটা) অনেকেই নাকি কেন্দ্রীয় সংস্থার সন্দেহ তালিকায় রয়েছেন। যাদের ওপর যখন তখন নেমে আসতে পারে বহিষ্কারের খর্গ । পাশাপাশি কুটার আইনি বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ওই তদন্তকারী সংস্থা । শিক্ষাসংগঠনটি সরকারি ভাবে নথিভূক্ত না হয়েও, নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত । তারা ছাত্রদের মধ্যে ভারতবিরোধী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে, তাদের প্রভাবিত করছে। রয়েছে আইএসআই যোগ । পাশাপাশি তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের আর্থিক লেনদেনও স্বচ্ছ নয়। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিষ্কৃত অধ্যাপক। তাঁর বিরুদ্ধে সংগঠনের তহবিল তছরূপের অভিযোগও করা হয়েছে কেন্দ্রের গোপন তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্টে।

৩৭০ ধারা বিলোপের আগে, ফি বছরই প্রাক অমরনাথ যাত্রার মরসুমে অশান্ত হয়ে উঠত কাশ্মীর উপত্যকা । পাকসীমান্তবর্তী রাজ্যে দাপট বাড়ত বিচ্ছিন্নতাকামীদের, তারই পাল্টা সক্রিয় হয়ে উঠত সামরিক প্রশাসন। বিশেষ অধিকারের আইন বিলোপ করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হওয়ার পরও সেই ট্রাডিশনে বদল নেই। ইমরান সরকারের পতনের পর এখনো বেসামাল পাকভূমি, সামরিক প্রশাসনের দাপট কি আবারও অশান্ত করবে সীমান্ত ? এরকম আচেই কি আবারও হাওয়া দিতে ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠছে রাজনৈতিক মেরুকরণের বহুচর্চিত তত্ত্ব। উত্তরপ্রদেশ ভোটের প্রাকমুহূর্তে, গেরুয়া বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ঠান্ডাযুদ্ধের অন্তস্রোতকে ঢাকতে,সক্রিয় হয়ে ওঠেছিল প্রপাগান্ডা গণসংযোগের সবকটি স্তর।কন্টেন্টের মুঠোবন্দী মগজধোলাইয়ে ক্রমশই শক্তিশালী আকার নিয়েছে মেকি জাতীয়তাবাদের নিম্নচাপ । কোভিড সংক্রমণের ধোঁয়াশা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রুশ ইউক্রেন যুদ্ধের সুড়সুড়িতে আবারও বেশামাল উপমহাদেশের অর্থনীতি, থমকে সব পরিসরের সার্বিক পরিকাঠামোর উন্নয়ণ। সে শূণ্যতাকে ঢাকতেই কি রাষ্ট্র পরিচালকদের আস্তিন থেকে উঁকি দিচ্ছে নতুন কোনও তাস?


❤ Support Us
error: Content is protected !!