Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জানুয়ারি ৯, ২০২৬

কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর : এমএসপি-সহ একাধিক দাবিতে ফের লং মার্চের ডাক কৃষক সংগঠনের, দিল্লিতে মহাপঞ্চায়েত

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর : এমএসপি-সহ একাধিক দাবিতে ফের লং মার্চের ডাক কৃষক সংগঠনের, দিল্লিতে মহাপঞ্চায়েত

কৃষকদের অধিকার ও ন্যূনতম সমর্থন মূল্য বৈধকরণের দাবিতে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হতে চলেছে কৃষকদের আরো একটি ঐতিহাসিক লং মার্চ। সংযুক্ত কিষান মোর্চার জাতীয় সমন্বয়ক জগজিৎ সিং ধল্লেওয়াল জানিয়েছেন, এ যাত্রা কন্যাকুমারী থেকে শুরু হয়ে কাশ্মীর পর্যন্ত চলবে। শেষে, ১৯ মার্চ দিল্লির রামলিলা ময়দানে মহাপঞ্চায়েতের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে।

ধল্লেওয়াল জানিয়েছেন, এ যাত্রার মূল উদ্দেশ্য দেশের গ্রামীণ স্তরে ‘কিষান পঞ্চায়েত’ আয়োজন করে কৃষকদের দাবিকে জনগণের সামনে তুলে ধরা। তিনি বলেন, ‘আমরা কোটি কোটি গ্রামস্তরের প্রস্তাবনা সংগ্রহ করে প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করব। এটি হবে কৃষকদের দাবিকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট পদক্ষেপ।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, এর আগে বৈধ এমএসপি-এর জন্য তিনি পাঞ্জাবে ১৩২ দিনের উপবাস করে দৃঢ় সংকল্পে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন। এবার তিনি বলছেন, ‘এটি শুধুমাত্র প্রতীকী প্রতিবাদ নয়, দেশের কৃষক জাগরণের অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত।’

এর আগে সংযুক্ত কিষান মোর্চার প্রতিনিধিদল সুপ্রিম কোর্ট-নির্ধারিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির সঙ্গে বৈঠকের জন্য পঞ্চকুলায় যাচ্ছে। বৈঠকের পর তাঁরা সংসদের কৃষি স্থায়ী কমিটির সঙ্গে বৈঠক করবেন। এসকেএম নেতারা সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীর মন্তব্যেরও তীব্র সমালোচনা করেছেন। কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বলেছিলেন, ফসলের ফলন বৃদ্ধিই কৃষকের সমৃদ্ধি নির্দেশ করে। কিন্তু কৃষক নেতাদের মত ভিন্ন। তাঁরা মনে করেন, ভারতের কৃষকরা ঋণের চক্রে আটকে আছেন। খরচ সামলাতে ও ঋণ পরিশোধ করতে উৎপাদন বাড়ানো বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মুনাফা লুটছে মহাজন, ফড়ে-দালালরা। ধল্লেওয়াল জানান, ‘উৎপাদন বৃদ্ধি কোনোদিনই কৃষকের সমৃদ্ধির মানদণ্ড হতে পারে না। কৃষকরা তাদের ফসলের জন্য ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, ফলে বেশি উৎপাদন তাদেরকে আরো আর্থিক সংকটে ফেলছে।’

আসন্ন ‘কিষান যাত্রা’র সময় কৃষকদের মধ্যে বৈধ এমএসপি, ঋণমুক্তি, ভারতের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা থেকে বের হয়ে যাওয়া এবং জমি অধিগ্রহণ আইন বাতিলের দাবির বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা হবে। ধল্লেওয়াল অভিযোগ করেন, কেন্দ্র সরকার প্রস্তাবিত নয়া ‘বীজ বিল’-এর খসড়া অনুযায়ী, বিদেশি, জেনেটিকালি পরিবর্তিত ফসলের বীজ ভারতের কৃষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, কৃষকরা বাড়তি উৎপাদনের আশায় এসব বিদেশি বীজ কিনবেন, কিন্তু শেষমেষ তারা ঋণের ফাঁদে আটকা পড়বেন। আরেক কৃষক নেতা অভিমন্যু লোহার জানান, তাঁরা আশাবাদী, দীর্ঘ যাত্রার সমাপ্তিতে রামলিলা ময়দানে অনুষ্ঠিত মহাপঞ্চায়েতে দেশের লক্ষ লক্ষ কৃষক জমায়েত করবেন। আশাকরি প্রশাসনের তরফে সভার প্রয়োজনী অনুমতি মিলবে। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, গত বছর আগস্টে দিল্লির যন্ত্ররমন্তরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শেষ মুহূর্তে অনুমোদিত হয়েছিল। কৃষকদের অদমনীয় স্পর্ধার কাছে প্রশাসন মাথা নত করেছিল। কৃষক নেতারা জানান, তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ভারতীয় কৃষকরা যাতে আর্থিকভাবে বঞ্চিত না হন, তারা যাতে শস্যের উপযুক্ত দাম পান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নীতিমালার কারণে তাদের উপর কোনো চাপ বা শোষণ না থাকে। ‘সংযুক্ত কিষান মোর্চার ডাকে এই কর্মসূচী দেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলেই মনে করছেন অনেকে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের কিষাণ লং মার্চ থেকে আজ প্রায় এক যুগের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় কৃষক সমাজ আবারো গণআন্দোলনের মঞ্চে সক্রিয়। সেই মার্চে প্রায় ৬০,০০০–৭০,০০০ কৃষক নাসিক থেকে মুম্বাই পর্যন্ত ৬ দিনে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ‘ঋণমুক্তি’, ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্যসহ বহু দাবিতে মহারাষ্ট্র বিধানসভা ঘেরাও করে। মিছিল শেষ ,সরকার যে আশ্বাস দিয়েছিল তা বাস্তবে না পালিত হওয়ায় ২০১৯ সালের শেষ দিকে ফের কৃষক আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। এরপর ২০২০ সালের জুলাই মাসে নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্র সরকার পাশ করল ৩টি নতুন কৃষি আইন। সরকারি বক্তব্যে, ‘কৃষক স্বাধীন হবে, বাজারের সুযোগ বাড়বে’। কিন্তু মাঠের কৃষকের চোখে তা যেন অজানা ঝুঁকি ও কর্পোরেট দাপটের পথ খুলে দেওয়া। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দিল্লির দরবার পর্যন্ত পৌঁছল, হাজার হাজার কৃষক ৬ মাসের মধ্যে রাজধানী সীমানায় সিঙ্গু টিকরি,গাজিপুরে অবরোধ শুরু করেন। সেই থেকে কিষান মোর্চার নেতৃত্বে আন্দোলনকারীরা একটাই দাবি তুলছেন, কৃষি আইন বাতিল ও ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চয়তা।

২০২১ সালের ২৬ জানুয়ারি, দেশের সাধারণতন্ত্র দিবসের দিনে রাজধানীর রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল ট্র্যাক্টর মিছিল। পুলিশের কাঁদানিস্ক্রব গ্যাস, জলকামান— সব কিছু উপেক্ষা করে দাঁতে দাঁতে চেপে লড়াই করলেন অন্নদাতারা। অনশন, সমাবেশ ও সামাজিক আন্দোলন–এর মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন আন্তর্জাতিক সংবাদেও স্থান পেল। প্রবল সে কৃষক সংগ্রামে বিল ফেরত নিতে বাধ্য হয় কেন্দ্রের সরকার। ১৯ নভেম্বর ২০২১, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করলেন—‘তিনটি কৃষি আইন বাতিল করা হলো।’ তবে ততক্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৭০০-র বেশি কৃষক। এরপরও লড়াই থামেনি। কৃষক আন্দোলন এসেছে নতুন আঙ্গিকে। পাঞ্জাবে ‘ভূমি সংরক্ষণ নীতি’র বিরুদ্ধে হাজার হাজার কৃষক ট্রাক্টর মার্চ করেছেন। নতুন ধারার আন্দোলনে কৃষকেরা শুধু মাত্র ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কিংবা ঋণ মকুবের দাবিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দৃঢ় কণ্ঠে জানাতে চাইছেন, ভূমি অধিগ্রহণ নীতির কঠোর বিরোধিতা, সরকারি নীতির অনিশ্চয়তা ও বাস্তব জীবনে কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে নিজেদের কথা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!