- দে । শ
- জুলাই ২, ২০২৪
সংবর্ধনা স্কুলের কেতুগ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান ইসরোর বিজ্ঞানী
দারিদ্র জড়ানো চালাঘর থেকে ইসরোর ‘মহাকাশে’ গর্বের উড়ান। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই ইসরোর বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ কেতুগ্রামের শান্তিনগরের যুবক বিজয় মণ্ডলের। এমন ‘সোনার ছেলে’কে মঙ্গলবার সংবর্ধনা দিল কাটোয়া শহরের ভারতী ভবন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই স্কুল থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে বিজয়। বিজয় বর্তমানে শ্রীহরিকোটায় সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টারে কর্মরত। বিজয়ের সাফল্যে গর্বিত শুধু ভারতী ভবন স্কুলই নয়, গোটা কেতুগ্রাম। ভারতী ভবনের প্রধানশিক্ষক আনারুল হক মণ্ডল, সহ-শিক্ষক তুষার পণ্ডিতরা বললেন, ‘ব্যক্তি বিজয়ের সঙ্গে আমরা জীবনসংগ্রামের একটা দৃষ্টান্তকেও স্বীকৃতি দিচ্ছি।’ যে স্কুল থেকে ৮২ শতাংশ নম্বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডী পেরিয়েছিলেন, সেই স্কুলের উঠোনে পা রাখতে পারা, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষকদের সান্নিধ্য লাভ করার আহ্লাদে আটখানা বিজয়। তাঁর কথায়, ‘আমার জীবনে ভারতী ভবন হাইস্কুল ও স্কুলের শিক্ষকদের অবদান কোনওদিন ভুলব না।’
কেতুগ্রামের একেবারে প্রান্তে শান্তিনগর গ্রাম। বাংলাদেশ থেকে ঠাঁইনাড়া হয়ে জীবন আর জীবিকার সন্ধানে ভাসতে ভাসতে কয়েকজন মানুষ ফাঁকা সরকারি খাসের জমিতে এসে তাঁবু খাটান। শান্তির আশায় থিতু হয়ে এখানেই ‘নগর’ গড়েন। নাম দেন শান্তিনগর। থিতু হওয়ার পরই কলোনির লোকজনের জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছে সংগ্রাম। গ্রামে চক্কর কেটে জানা গেল, অভাবের সঙ্গে দাঁতে দাঁতে লড়াই দিয়ে সাফল্যের মুকুট পরার কাহিনী ডানা মেলেছে বেশ কয়েকটি পরিবারে। কেউ হয়েছেন অধ্যাপক, কেউ শিক্ষক, কেউ সরকারি চাকরি পেয়েছেন। শান্তিনগরের খ্যাতি বালাপোশ তৈরিতেও। ঘর ঘর মহিলারা সংসারের কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে বালাপোশ বানান। এখানকার বালাপোশের রাজ্য ও ভিনরাজ্যেও যথেষ্ট কদর রয়েছে।
এখানকার বালাপোশের ওমের তাপই বিজয়ের বড় হওয়ার রসদ। তাঁর কথায়, ‘অসম্ভব দারিদ্র্যের সঙ্গে যুঝতে হয়েছে ছোট থেকেই। লেখাপড়া করব কী, দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়া আর পরার চিন্তাই ছিল সংসারে। সেই কষ্টই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জেদ তৈরি করে।’ বাবা প্রান্তিক কৃষক। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মা মণিমালা মণ্ডলের যখন মৃত্যু হয়, বিজয় তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। রান্না করে খেয়ে স্কুল যেতে হত বিজয়কে। মাঠে যাওয়া, চাষের কাজে বাবাকে সাহায্য করার জন্য প্রায়ই স্কুল কামাই হত বিজয়ের। ২০১৭ সালে স্থানীয় খাটুন্দি হাইস্কুল থেকে ৯০ শতাংশ নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করেন বিজয়। ২০১৯-এ কাটোয়ার ভারতী ভবন উচ্চবিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে জয়েন্টেও উত্তীর্ণ হন। তারপর ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ স্পেস সায়েন্স এন্ড টেকনলজি’ থেকে ইলেকট্রনিক্সস এন্ড টেলিকমিউনিকেশন নিয়ে পড়াশোনা করে পাশ করে সরাসরি ইসরোয় যোগ দেন। বিজয়ের একটাই প্রত্যাশা ‘জীবনভর দেশের সেবায় কাজে লাগা।’ বিজয়ের সাফল্যের উচ্ছ্বাস তাঁর বাবা সন্তোষ মণ্ডল থেকে শুরু করে গোটা শান্তিনগরের পথেঘাটে গড়াগড়ি দিচ্ছে। ভারতী ভবন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরফে বিছয়ের সফল ‘জার্নি’কে কুর্নিশ জানানোর আয়োজনের শরিক হওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে দু’চোখ জলে চিকচিক করে কাটোয়া শহরের আবাসনের বাসিন্দা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জীববিজ্ঞানী সুনীল পালের। মনে পড়ে যায় আজ থেকে বছর সাতেক আগে তাঁর দরজায় মাধ্যমিকের মার্কশিট হাতে চোখভরা জল নিয়ে মলিন চেহারার বিজয়ের দাঁড়ানো। উচ্চশিক্ষার সাধ ষোলআনা। কিন্তু সাধ্যে টান। বাবা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘লেখাপড়ার খরচ জোটানোর ক্ষমতা নেই। বরং দিনমজুরের কাজ করে সংসারটাকে একটু গুছিয়ে নে।’ আর লেখাপড়া হবে না ভেবেই জলভরা চোখে সুনীলবাবুর দরজায় দাঁড়িয়েছিল বিজয়। সেই জল ছিল যন্ত্রণার, কষ্টের। তা লাঘব করতে বিনা মাইনেয় পড়ানো থেকে নানাভাবে বিজয়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সুনীলবাবু। প্রিয় ছাত্রের তুঙ্গ সাফল্যের স্বীকৃতি দানের আমন্ত্রণে সুনীলবাবুর চোখেও জল। তা যে ‘আনন্দাশ্রু’, তা বলে দেওয়ার জন্য অবশ্য কোনও পুরস্কার নেই।
❤ Support Us






