- এই মুহূর্তে দে । শ
- জানুয়ারি ১০, ২০২৬
মমতার অভিযোগের পর তৎপর কলকাতা পুলিশ, প্রতীক জৈনের বাড়ি ও আইপ্যাক অফিসে নথি চুরির তদন্ত শুরু
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও আইনি মহলে উত্তেজনা চলছেই। এদিন রাজ্য সরকার সম্ভাব্য পরিস্থিতি মাথায় রেখেই সুপ্রিম কোর্টে ক্যাভিয়েট দাখিল করেছে। এর অর্থ, যদি সুপ্রিম কোর্টে এই মামলায় কোনও আবেদন আসে, আদালত যেন রাজ্যের বক্তব্য না শুনে কোনও রায় না দেয়। এদিকে মমতার অভিযোগের ভিত্তিতে কলকাতা পুলিশের একটি দল শনিবার সকালে শেক্সপিয়ার সরণি থানার পুলিশ আধিকারিকরা আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে যান। সেখান থেকে বাড়ির সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ ও ডিভিআর সংগ্রহ করা হয়েছে।
শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টে ED এবং তৃণমূলের জোড়া মামলার শুনানি ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পালকে ইমেল করে ED এদিন শুনানি চেয়ে আবেদন জানিয়েছিল। পাশাপাশি আবেদন করা হয়েছিল, মামলাটি অন্য কোনও বিচারপতির এজলাসে পাঠিয়ে শুনানি করা হোক। তবে প্রধান বিচারপতি জানান, বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের নির্দেশ যেহেতু জুডিশিয়াল অর্ডার, তাই তিনি প্রশাসনিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।
আইনজীবী মহলের মতে, শুনানি স্থগিত হওয়ার পরই ED সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারে—এই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই রাজ্য সরকার ক্যাভিয়েট দাখিল করেছে।
আইপ্যাক কাণ্ডে হাইকোর্টে তৃণমূল ও ED দুপক্ষই মামলা করেছে। তৃণমূলের পিটিশনে দাবি করা হয়েছে, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্বাচনের প্রচার সংক্রান্ত গোপন ও স্পর্শকাতর নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।”
পাল্টা ED-এর পিটিশনে উল্লেখ করা হয়েছে, “এই তল্লাশি অভিযান প্রমাণভিত্তিক ও সম্পূর্ণ আইনী।”
শুনানি স্থগিত হওয়ায় হাইকোর্টের পরবর্তী তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ১৪ জানুয়ারি। ED-এর অবস্থান অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টে সরাসরি যাওয়ার ফলে যদি রাজ্যের বিরুদ্ধে কোনও আবেদন আসে, আদালত রাজ্যের বক্তব্যও শুনবেন।
গত বৃহস্পতিবারের ঘটনায় ED-মমতা বন্দ্যোপাধযায়ের প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিস থেকে তথ্য নিয়ে যাওয়ার জন্য সিবিআই তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছে। মামলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে পক্ষ করা হয়েছে। অন্যদিকে, অজ্ঞাত পরিচয় ED কর্মকর্তারা এবং CRPF-এর বিরুদ্ধে দুটি থানায় তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে।
মামলার অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে :
হুমকি: ধারা ৩/৫
চুরি: ধারা ৩০৩/২ (যা জামিন অযোগ্য)
অনধিকার প্রবেশ: ধারা ৩৩২সি
তথ্যপ্রযুক্তি আইন: ধারা ৬৬
এই ঘটনাগুলি রাজ্যের রাজনৈতিক ও আইনি চিত্রকে আরও জটিল করে তুলেছে, এবং আগামী শুনানি পর্যন্ত পরিস্থিতি বিশেষভাবে নজরদারি করবে।
এদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুতর অভিযোগের পরেই তদন্তে নেমেছে কলকাতা পুলিশ। তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচন সংক্রান্ত নথি ও ইলেকট্রনিক তথ্য চুরির অভিযোগে প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের দফতরে অভিযুক্ত এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর আধিকারিকদের শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ওই অভিযানের সময় উপস্থিত কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান ও আধিকারিকদের পরিচয় চিহ্নিত করার কাজও চলছে।
এই তদন্তের অংশ হিসেবে শনিবার সকালে শেক্সপিয়ার সরণি থানার পুলিশ আধিকারিকরা আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে যান। সেখান থেকে বাড়ির সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ ও ডিভিআর সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি, বাড়ির পরিচারিকা এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের বয়ানও রেকর্ড করেছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রের খবর, অভিযুক্তদের শনাক্তকরণ সম্পূর্ণ হলেই তাঁদের নোটিস পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার ভোর সোয়া ৬টা নাগাদ। ইডি আধিকারিকরা লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের ফ্ল্যাটে তল্লাশি শুরু করেন। তবে অভিযোগ, প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর, সকাল ১১টার পর ইডি ই-মেলের মাধ্যমে কলকাতা পুলিশকে তল্লাশির বিষয়টি জানায়। তল্লাশির খবর পেয়ে দফায় দফায় শেক্সপিয়ার সরণি থানার পুলিশ আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। এমনকী, ডিসি (সাউথ) প্রিয়ব্রত রায় নিজেও সেখানে যান এবং ইডি আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন।
পুলিশের অভিযোগ, স্থানীয় থানাকে না জানিয়েই ইডি তল্লাশি শুরু করে, যা নিয়মবিরুদ্ধ। থানার এক সার্জেন্ট প্রথমে কয়েকজন পুলিশকর্মী নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলে অজ্ঞাতপরিচয় ইডি আধিকারিক ও উর্দিধারী কেন্দ্রীয় বাহিনীর কর্মীরা তাঁদের ভিতরে ঢুকতে বাধা দেন। পরিচয়পত্র দেখানো হয়নি, এমনকী আদালতের ওয়ারেন্ট আছে কি না জানতে চাইলে পুলিশকর্মীদের ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এরপর ডিসি (সাউথ) অতিরিক্ত ওসি ও অন্যান্য আধিকারিকদের নিয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে ইডির সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাঁদেরও বাধা দেওয়া হয়। পুলিশ সূত্রে অভিযোগ, বচসা ও বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে কয়েকজন সিআরপিএফ জওয়ান লাঠি উঁচিয়ে পুলিশকর্তাদের দিকে তেড়ে যান এবং ডিসি-সহ একাধিক আধিকারিককে ধাক্কা দেওয়া হয়।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ২০ মিনিট নাগাদ শেক্সপিয়ার সরণি থানায় পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া, বেআইনি অনুপ্রবেশ এবং পুলিশের উপর হামলার অভিযোগ দায়ের করে। বিষয়টি লালবাজারে জানানো হলে পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা ঊর্ধ্বতন পুলিশকর্তাদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ইডি আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেন। যদিও এক ইডি আধিকারিক পরিচয়পত্র দেখালেও পুলিশকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে শেক্সপিয়ার সরণি থানা ও বিধাননগরের ইলেকট্রনিক কমপ্লেক্স থানার পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। ভারতীয় ন্যায়সংহিতার ৩(৫) ধারায় অপরাধমূলক সমান অভিপ্রায়, ৩০৩(২) ধারায় চুরি, ৩৩২(সি) ধারায় ঘরে অনুপ্রবেশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের দফতরে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও বৈদ্যুতিন নথি রাখা ছিল। অজ্ঞাতপরিচয় ইডি ও সিআরপিএফ আধিকারিকরা সেখানে অনুপ্রবেশ করে সেই নথি চুরি করেছেন এবং অনলাইনে তথ্য পাচারও করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ও রাজ্য পুলিশের মধ্যে তীব্র সংঘাতের ছবি সামনে এসেছে, যা রাজ্য-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
❤ Support Us






