- দে । শ
- মে ১৭, ২০২৫
ভিনরাজ্যের ভাটা শ্রমিকদের সন্তানদের নিখরচায় পাঠদান
এ এক আজব পাঠশালা। ফি-বছর এই পাঠশালার মেয়াদ মেরেকেটে মাস আষ্টেক। কারণ পড়ুয়ারাতো এখানে থাকে মাস পাঁচেকই। ওরা সবাই ভিনরাজ্যের ইটভাটা শ্রমিকদের সন্তানসন্ততি। তাতে অবশ্য পরোয়া নেই সোমেশ মণ্ডলের। এইভাবেই ৮ মাসের ‘সেশনে’ প্রায় এক দশক ধরে পাঠশালাটি চালাচ্ছেন পূর্বস্থলীর নীলমণি ব্রহ্মচারী হাইস্কুলের ইংরাজির শিক্ষক সোমেশবাবু। সঙ্গী একদল সমমনস্ক হিন্দি জানা যুবক-যুবতী। গাছতলাতেই শুরু হয়েছিল শিক্ষাদান। ঝড়জল হলে স্কুল ছুটি। সোমেশবাবুর উদ্যোগ আর উদ্যমকে কুর্নিশ জানাতে পঠনপাঠন অব্যাহত রাখতে ভাটা মালিক পাঠশালার চারপাশে কংক্রিটের দেওয়াল তুলে দিয়েছেন। লাগিয়ে দিয়েছেন ব্ল্যাকবোর্ড। তাতেই চলছে পাঠদান।
শুধু পাঠদান? ফি-বছর প্রত্যেক পড়ুয়াকে নতুন পোশাক তুলে দেন সোমেশবাবু। পড়ুয়াদের পরিবারের হাতে তুলে দেন বিভিন্ন ধরনের খাবার। এমন কাজের ‘কোনও তুলনা হয় না’ বলে জানালেন স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান অনিন্দিতা রায়।
পূর্বস্থলীর নীলমণি ব্রহ্মচারী ইনস্টিটিউশনের ইংরাজির শিক্ষক সোমেশবাবুর বাড়ি পূর্বস্থলী ১নং ব্লকের নিমার গ্রামে। বর্তমানে তিনি নবদ্বীপে থাকেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বছর দশেক আগে স্কুল যাওয়ার পথে পূর্বস্থলীর ইটভাটার কর্মরত শ্রমজীবী পরিবারগুলির সন্তানদের ধুলোকাদা মাখা চেহারা দেখে মন কেঁদে ওঠে সোমেশবাবুর। সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নেন তাদের শিক্ষার আঙিনায় আনবেন। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। হিন্দি জানা স্থানীয় ছাত্রছাত্রী অঙ্কিতা ব্যানার্জি, সুদীপ্ত ঘোষ, প্রদীপ অধিকারী, সুলতানা খাতুনদের সঙ্গে নিয়ে ভাটার পাশে গাছতলায় পড়ানো শুরু করে দেন। পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়াতে কখনও নিজের পকেট থেকে, কখনও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের পছন্দমত টিফিন, নানারকম বইপত্রের ব্যবস্থা করেন। ফি-সপ্তাহে তিনদিন করে পাঠদান। এই পাঠশালার খবর শুনে এলাকার প্রশাসনের লোকজন, জনপ্রতিনিধিরা নিয়মিত খোঁজখবর নিয়ে যান। বর্তমানে পড়ুয়ার সংখ্যা ৪৮। এখানকার ইটভাটাগুলিতে মূলত বিহার ও ঝাড়খণ্ডের পরিযায়ী শ্রমজীবী হিন্দিভাষী লোকজন কাজ করেন। অক্টোবর মাসে আসেন। জুন মাস পর্যন্ত থাকেন। কাজ করেন। মাঝের কয়েক মাস দেশের বাড়ি যান। তারা নিজেরাই পেটের চিন্তায় এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, তাদের শিশুরা শৈশবের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। তা দেখে গাছতলাতেই ভাটা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য পাঠশালা গড়ে পাঠদানের ব্যবস্থা করেছেন সোমেশবাবুরা। বিনা পারিশ্রমিকের এই পাঠদান সম্পর্কে সোমেশবাবুর উপলব্ধি, ‘ওদের পড়ার আগ্রহ, আমাদের প্রতি ভালবাসা, সবমিলিয়ে এমন একটা পরিবেশ, যা কোথাও মিলবে না। অদ্ভুত এক আনন্দ উপভোগ করি।’
❤ Support Us






