Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫

মনরেগার পরিবর্তে ‘জি রাম জি’ ! সংসদে নতুন বিল আনছে কেন্দ্র

কাজ বাড়বে ২৫ দিন, মজুরি দেবে রাজ্য-কেন্দ্র

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মনরেগার পরিবর্তে ‘জি রাম জি’ ! সংসদে নতুন বিল আনছে কেন্দ্র

নাম বদল, কাজের দিন বাড়ানো এবং কাঠামোগত রদবদল— এক ঢিলে একাধিক পাখি মারার পথে হাঁটল নরেন্দ্র মোদি সরকার। ইউপিএ আমলে চালু হওয়া মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প বা ‘মনরেগা’কে কার্যত বিদায় জানিয়ে কেন্দ্র আনতে চলেছে এক নতুন আইন। লোকসভায় পেশ হতে চলা ‘বিকশিত ভারত—রোজগার ও জীবিকা নিশ্চয়তা মিশন (গ্রামীণ)’, সংক্ষেপে ‘ভি বি–জি রাম জি বিল-২০২৫’, কার্যকর হলে বাতিল হয়ে যাবে ‘মনরেগা আইন-২০০৫’। নতুন আইনে গ্রামীণ পরিবারগুলোর জন্য বছরে কাজের নিশ্চয়তা ১০০ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করা হয়েছে। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে রোজগারের সুযোগ বাড়ছে ২৫ দিন। তবে এই বাড়তি সুযোগের সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্ক শুরু হয়েছে।

‘মনরেগা’র নাম বদল শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। কংগ্রেস আমলে চালু হওয়া প্রকল্পের নাম বদলে দেওয়া, আইনের নাম থেকে মহাত্মা গান্ধীর নাম সরিয়ে ফেলা এবং নামের মধ্য থেকে ঔপনিবেশিকতার ছাপ মুছে ফেলা— এই ত্রিমুখী ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতেই তৎপর হয়েছে কেন্দ্র, এমনটাই মত বিরোধীদের। কেন্দ্রের দাবি, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের দর্শন ও লক্ষ্যকে আরো স্পষ্ট করতেই এই নামকরণ। শুক্রবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেয় সরকার। এরপরই সংসদে বিল পাশ করাতে বিজেপি সাংসদদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হুইপ জারি হয়েছে। নতুন আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক গ্রামীণ পরিবার, যাদের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যরা, যারা অদক্ষ শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে ইচ্ছুক, তারা বছরে সর্বাধিক ১২৫ দিনের কাজ পাবেন। বর্তমানে ‘মনরেগা’য় এই সীমা ১০০ দিন। যদিও কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাজের সুযোগ থাকলেও, তা স্থায়ী অধিকার ছিল না। নতুন আইনে ওই বাড়তি দিন স্থায়ী করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, এর ফলে গ্রামে রোজগারের সুযোগ বাড়বে এবং পরিযায়ী শ্রমিক সমস্যার সমাধান হবে। তবে বাস্তবে কতজন পরিবার এই ১২৫ দিনের কাজ পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন এসেছে অর্থনৈতিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে। ‘মনরেগা’য় যেখানে মজুরির সম্পূর্ণ খরচ বহন করত কেন্দ্র, সেখানে নতুন আইনে রাজ্যগুলিকেও ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ বহন করতে হবে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও হিমালয় রাজ্য এবং কয়েকটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের ব্যয়ের অনুপাত রাখা হয়েছে ৯০:১০। অন্য রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে এই অনুপাত হবে ৬০:৪০। যেসব কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা নেই, সেখানে সম্পূর্ণ খরচ বহন করবে কেন্দ্র।অর্থাৎ, কাজের দিন বাড়লেও আর্থিক দায়িত্বের বড় অংশ চলে যাচ্ছে রাজ্য সরকারের কাঁধে। এই বাড়তি চাপ অনেক রাজ্যের পক্ষেই সামলানো কঠিন হবে বলে আশঙ্কা। ‘মনরেগা’র অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্য ছিল চাহিদাভিত্তিক কাঠামো। গ্রামে যত কাজের চাহিদা, তত বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ ছিল। নতুন আইনে সে ব্যবস্থার বদলে আনা হচ্ছে নির্দিষ্ট বরাদ্দ পদ্ধতি। অর্থাৎ, কেন্দ্র আগেই রাজ্যভিত্তিক নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ করবে। সেই সীমার বাইরে খরচ হলে দায়িত্ব নিতে হবে রাজ্য সরকারকেই। এর ফলে গ্রামে প্রকৃত চাহিদা থাকলেও কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। নতুন আইনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত দিক হল কৃষির ব্যস্ত মরশুমে কাজ বন্ধ রাখার বিধান। বছরে সর্বাধিক ৬০ দিন, বীজ বপন ও ফসল কাটার সময় রাজ্য সরকার নির্ধারিত সময়ে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকবে। কেন্দ্রের যুক্তি, এতে কৃষিকাজে শ্রমিকের অভাব মিটবে। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, এতে কার্যত ১২৫ দিনের কাজ পাওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাবে।

নতুন আইনে শ্রমিকদের মজুরি সাপ্তাহিক ভিত্তিতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে ‘মনরেগা’র মতো মজুরি দিতে দেরি হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। ফলে সময়মতো টাকা না পেলে শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা কমছে বলেই মত কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগঠনগুলোর। সব মিলিয়ে, নতুন ভি বি–জি রাম জি বিল একদিকে যেমন গ্রামীণ কর্মসংস্থানে কাজের দিন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে রাজ্যগুলির উপর আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ বাড়াচ্ছে। অধিকারভিত্তিক কর্মসংস্থান আইন থেকে বরাদ্দনির্ভর প্রকল্পে ফেরার এ যাত্রা নিয়ে সংসদের ভিতরে ও বাইরে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত অনিবার্য বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!