Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৫

জিএসটি সংস্কার: কী সস্তা, কী মহার্ঘ? পুজো মরশুমের আগে মধ্যবিত্তের পকেটে বড়োসড়ো স্বস্তি, আঘাতও

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জিএসটি সংস্কার: কী সস্তা, কী মহার্ঘ? পুজো মরশুমের আগে মধ্যবিত্তের পকেটে বড়োসড়ো স্বস্তি, আঘাতও

উৎসবের মুখে সাধারণ মানুষের খরচের ঝুলি হালকা করার পথে বড়ো পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র। এদিন, জিএসটি কাউন্সিল ঘোষণা করল, বহু দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যে শুল্ক হ্রাস করা হচ্ছে। এ পরিবর্তনে কিছু পণ্যের দাম বাড়বে, কিছু পণ্যের দাম কমবে, এবং কিছু পণ্যে সম্পূর্ণভাবে জিএসটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। খাদ্যপণ্য, ওষুধ, বীমা থেকে শুরু করে ছোটো গাড়ি, বাইক, ট্রাক্টর—সব ক্ষেত্রেই মিলছে ব্যাপক স্বস্তি। তবে বিলাসবহুল গাড়ি, সফট ড্রিঙ্ক, তামাকজাত দ্রব্য এবং জুয়ার মতো পরিষেবায় চাপানো হয়েছে বাড়তি কর। ২০১৭ সালে চালু হওয়া পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) কাঠামোর পর এটাই সবচেয়ে নিবিড় সংস্কার। ৪ ধাপের কর হারকে কমিয়ে নামিয়ে আনা হয়েছে ২ ধাপে—৫ শতাংশ এবং ১৮ শতাংশ। কেবল বিলাসী ও ক্ষতিকর পণ্যের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ ৪০ শতাংশ হারের কর। কিছুদিন আগে কেন্দ্র সরকার পণ্য পরিষেবা কর (জিএসটি) কাঠামোয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয় এবং তা অনুমোদন পায় জিএসটি কাউন্সিলের প্রথম বৈঠকে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বুধবার নতুন জিএসটি হার ঘোষণা করেছেন। ২২ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ নবরাত্রির প্রথম দিন থেকেই কার্যকর হবে নতুন ব্যবস্থা।

খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সবথেকে বেশি স্বস্তি মিলছে। এতদিন রুটি, পরোটা, ইউএইচটি দুধ, ছানা কিংবা পনিরের মতো পণ্যে ৫ শতাংশ জিএসটি দিতে হতো। নয়া সংশোধনে তা শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। মাখন, ঘি, শুকনো ফল, কনডেন্সড মিল্ক, সসেজ, জ্যাম-জেলি, নমকিন, আইসক্রিম, বিস্কুট, কর্নফ্লেক্স কিংবা প্যাকেটজাত সিরিয়ালের মতো জিনিসে এতদিন ১৮ শতাংশ কর বসত, এবার তাও কমে দাঁড়াচ্ছে ৫ শতাংশে। ভেগান দুধ বা সয়া মিল্ক ড্রিঙ্কের ক্ষেত্রেও একই ছাড় মিলতে চলেছে। গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসে এ সংস্কার বিশেষভাবে কার্যকর। দাঁতের গুঁড়ো, শিশুখাদ্যের বোতল, ছাতা, সাইকেল, বাঁশের তৈরি আসবাব বা রান্নাঘরের সাধারণ জিনিস এতদিন ১২ শতাংশ হারে করের আওতায় ছিল। এবার তা কমে দাঁড়াল ৫ শতাংশে। সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, টুথব্রাশ কিংবা চুলের তেল, যেখানে আগে ১৮ শতাংশ কর দিতে হত, সেখানেও এখন থেকে মাত্র ৫ শতাংশ দিতে হবে।

ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালী যন্ত্রপাতিতে একইভাবে উল্লেখযোগ্য ছাড় মিলছে। এসি, ডিশওয়াশার কিংবা বড়ো টিভির কেনার ক্ষেত্রে এতদিন ক্রেতাকে ২৮ শতাংশ কর দিতে হত, এখন থেকে তা কমে দাঁড়াচ্ছে ১৮ শতাংশে। ছোটো টিভি আরো সস্তা হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে মিলছে ব্যাপক ছাড়। পেন্সিল, শার্পনার, খাতা, নোটবই কিংবা মানচিত্রের মতো জিনিস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে সমস্ত কর। স্বাস্থ্য পরিষেবায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, অক্সিজেন, টেস্ট কিট, গ্লুকোমিটার কিংবা সাধারণ চশমা—সবকিছুই এখন শূন্য বা ৫ শতাংশ করের আওতায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় মিলবে জীবনবীমা ও স্বাস্থ্যবীমায়। এতদিন প্রিমিয়ামের উপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ কর দিতে হত। এবার থেকে কেবল প্রিমিয়ামের অঙ্কটুকুই দিতে হবে, কোনো বাড়তি কর বসবে না। কৃষি ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য নির্মলা সীতারমণের উপহার আন্তরিক।
বিড়ির পাতার উপর ১৮% থেকে কমে ৫% জিএসটি হবে। এছাড়া বিড়ির উপর ২৮% জিএসটি কমিয়ে ১৮% করা হয়েছে। সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া, এসকল পণ্যের উপর ৫% জিএসটি ধার্য করা হয়েছে, যা পূর্বে ছিল ১২%।

যানবাহনের কেনাকাটায় সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতা ও কৃষক—দু-পক্ষই স্বস্তি পাচ্ছেন। ছোটো গাড়ি, অর্থাৎ পেট্রোল, সিএনজি ও এলপিজি-চালিত গাড়ি ১,২০০ সিসি পর্যন্ত এবং ডিজেল গাড়ি ১,৫০০ সিসি পর্যন্ত, দৈর্ঘ্যে সর্বোচ্চ ৪,০০০ মিমি—এই গাড়িগুলির কর ২৮ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়াচ্ছে ১৮ শতাংশে। ৩৫০ সিসি পর্যন্ত মোটরবাইকও একই হারে সস্তা হচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে আগের মতোই ৫ শতাংশ কর বহাল থাকছে। ট্রাক্টর ও কৃষিযন্ত্রের উপর কর ১২ শতাংশ থেকে নামিয়ে করা হয়েছে ৫ শতাংশ। সার ও কীটনাশকেও একই ছাড় মিলছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেই আশা অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের। বাড়ি তৈরির খরচও কমতে চলেছে। সিমেন্টের উপর এতদিন ২৮ শতাংশ কর বসত, তা ১৮ শতাংশ করা হয়েছে। কেবল তাই নয়, সৌন্দর্য ও বিনোদন খাতেও কিছুটা স্বস্তির হাওয়া। সেলুন, ফিটনেস সেন্টার কিংবা যোগকেন্দ্রের ১৮ শতাংশ হারে কর বর্তমানে কমে দাঁড়াচ্ছে ৫ শতাংশে।

তবে সব ক্ষেত্রেই যে স্বস্তি মিলেছে, তা নয়। কিছু ক্ষেত্রে কর বেড়েছে। কয়লার উপর জিএসটি ৫% থেকে ১৮% করা হয়েছে, যার ফলে কয়লার দামও বেড়ে যাবে। কোকা-কোলা, পেপসি-সহ সব ধরনের সফট ড্রিঙ্ক বা ক্যাফিনযুক্ত পানীয়র উপর কর বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। বড়ো ইঞ্জিনের গাড়ি, বিলাসবহুল এসইউভি, ৩৫০ সিসির বেশি মোটরবাইক, ইয়ট বা প্রাইভেট এয়ারক্রাফ্ট—সবকিছুতেই বাড়তি কর বসছে। তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রেও বাড়তি কর কার্যকর হচ্ছে। সিগারেট, চুরুট এবং অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের উপর ৪০% হারে জিএসটি নেয়া হবে, যা পূর্বে ছিল ২৮%। পান মশলা, বাড়তি চিনি মিশ্রিত পানীয়, কার্বনযুক্ত পানীয়র উপর ২৮% থেকে জিএসটি বাড়িয়ে ৪০% করা হয়েছে।

ক্যাসিনো, রেস ক্লাব, অনলাইন গেমিং কিংবা আইপিএল টিকিটেও ৪০ শতাংশ কর দিতে হবে। অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যে পকেট কিছুটা বাঁচলেও, স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের আশাভঙ্গ হয়েছে। টিভি, এসি বা ফ্রিজে অনেকখানি ছাড় মিললেও মোবাইল ফোনের কর ১৮ শতাংশই থাকছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘নতুন জিএসটি হার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি এনে দেবে, ফলে খরচের ঝোঁকও বাড়বে, উৎসবের মরসুমে যদি ভোগব্যয় বাড়ে, তবে অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে।’ শিল্পমহলও এ সংস্কারকে স্বাগত জানিয়েছে। অটোমোবাইল শিল্পের আশা, গাড়ির দাম কমলে ক্রেতাদের গাড়ি-বাইক কেনার আগ্রহ বাড়বে। কৃষিযন্ত্রে ছাড় গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন করে চাঙ্গা করবে বলেও মত তাঁদের।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!