Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬

জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে দেশ জুড়ে বিক্ষোভ ! অসমে আটক গৌরব গগৈ, দিল্লিতে আটক নেহা-দীপঙ্কর-যোগেন্দ্র, পাটনায় জলকামান

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে দেশ জুড়ে বিক্ষোভ ! অসমে আটক গৌরব গগৈ, দিল্লিতে আটক নেহা-দীপঙ্কর-যোগেন্দ্র, পাটনায় জলকামান

নির্বাচন কমিশনের অন্দরের গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পর, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। শুক্রবার দেশের একাধিক রাজ্যে পথে নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে কংগ্রেস ও অনান্য বিরোধী দলগুলি। মূল দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ । দিল্লি থেকে পাটনা, গুয়াহাটি থেকে কলকাতা—বিভিন্ন জায়গায় মিছিল, অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। কোথাও ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, কোথাও জলকামান, আবার কোথাও বিক্ষোভকারীদের আটক করার ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেস কর্মীরা নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে মিছিল করেন। কোথাও পুলিশ বিক্ষোভকারীদের আটকে দেয়, কোথাও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অসমে বিক্ষোভ চলাকালীন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈকে আটক করে পুলিশ। দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে যাওয়ার পথে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি হয়। কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকদের একটি দল ব্যারিকেড অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বেশ কয়েক জনকে আটক করে। পরে যোগেন্দ্র যাদব, আইসা নেত্রী নেহা বরা, অঞ্জলি ভরদ্বাজ এবং সিপিআই(এম-এল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকেও আটক করা হয় বলে জানা গিয়েছে।

দিল্লি পুলিশের বক্তব্য, বিক্ষোভের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি। অন্য দিকে, বিক্ষোভকারীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এবং তার অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব দিতে হবে। দিল্লি কংগ্রেস সভাপতি দেবেন্দ্র যাদব বলেন, জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। তাঁর বক্তব্য, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ঘিরে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার প্রতিবাদে বিরোধীরা নীরব থাকবে না। দিল্লির পাশাপাশি, মণিপুরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি হয় এবং পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। চণ্ডীগড়ে বিক্ষোভকারীদের আটকাতে জলকামান চালানো হয়।  বিহারের রাজধানী পটনাতেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের দফতরের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে পুদুচেরী, ইম্ফল, শিমলা, শ্রীনগর, দেহরাদূন, জম্মু এবং কলকাতাতেও।

অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি-র নির্দেশে শুক্রবার দেশ জুড়ে একাধিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। অসম, জম্মু ও কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, চণ্ডীগড়, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ-সহ একাধিক রাজ্যে পথে নামেন কংগ্রেস কর্মীরা। কোথাও নির্বাচন কমিশনের দফতর ঘেরাওয়ের ডাক দেওয়া হয়, কোথাও স্লোগান, মিছিল ও বিক্ষোভের মাধ্যমে ‘এসআইআর’ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের তীব্র বিরোধিতা করা হয়। অসমে বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশ আটক করে কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি গৌরব গগৈকে। আটক হবার মুহূর্তেও গগৈ জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করতে থাকেন। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মে অনিয়ম হয়েছে। ভোটার তালিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে কমিশনকে। গগৈ আরও বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার গুরুতর অপরাধ করেছেন, রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ করেছেন। তাঁর আজই পদত্যাগ করা উচিত। তাঁর বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’ভোটাধিকার নিয়েও সরব হন গগৈ। তাঁর বক্তব্য, গোটা বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দেশের নাগরিকদের মৌলিক ভোটাধিকার। তিনি বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং মানুষের ভোটাধিকারই গণতন্ত্রের ভিত্তি। সে ব্যবস্থার উপরেই আঘাত এসেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অন্যদিকে, বিক্ষোভ ঘিরে মণিপুরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ওকরাম ইবোবি সিং এবং কংগ্রেস লেজিসলেচার পার্টির নেতা কেইশাম মেঘচন্দ্র সিংয়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস কর্মীরা লামফেলপাটে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের দিকে মিছিল করেন। তাঁদের দাবি ছিল, জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হোক। মিছিল এগোনোর সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। বিক্ষোভকারীরা জ্ঞানেশ কুমারের কুশপুতুলও পোড়ান। অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ইটানগরেও নির্বাচন ভবনের কাছে বিক্ষোভ দেখায় প্রদেশ কংগ্রেস। সেখানে ‘এসআইআর’ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলির বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবিও তোলেন বিক্ষোভকারীরা। তবে, প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ইটানগরের বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল।

এদিন, চণ্ডীগড়েও নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে মিছিল করে কংগ্রেস। সেখানে বিক্ষোভকারীদের এগিয়ে যাওয়া আটকাতে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন কংগ্রেস কর্মীরা। জম্মুতেও নির্বাচন কমিশনের দফতরের সামনে আগে থেকেই মোতায়েন ছিল বিশাল পুলিশ বাহিনী। অন্যদিকে, শ্রীনগরে বিধানসভার ভিতরে বিক্ষোভ দেখান কংগ্রেস বিধায়করা। হাতে ব্যানার নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন তাঁরা। উত্তরাখণ্ডের দেহরাদূনে প্রদেশ কংগ্রেস দফতর থেকে সচিবালয়ে অবস্থিত নির্বাচন দফতরের দিকে মিছিল করে কংগ্রেস। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন দলের রাজ্য ইনচার্জ কুমারী শৈলজা ও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গণেশ গোডিয়াল। নির্বাচন দফতর ঘেরাওয়ের ডাকও দেওয়া হয়েছিল। ‘এসআইআর’-এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখান কংগ্রেস কর্মীরা। হাজরতগঞ্জে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দফতর ঘেরাওয়ের পরিকল্পনাও নিয়েছে হাত শিবির।

পশ্চিমবঙ্গেও পথে নেমেছে কংগ্রেস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে মিছিল শুরু করে প্রদেশ কংগ্রেস। গন্তব্য ছিল স্ট্র্যান্ড রোডে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে কংগ্রেস কর্মীরা মিছিলে যোগ দেন। নেতৃত্বে ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। মিছিল ঘিরে ছিল ব্যাপক পুলিশি ব্যবস্থা। বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটের মোড়ে পুলিশ মিছিল আটকে দেয়। এর পরেই বিক্ষোভকারীরা জ্ঞানেশ কুমারের কুশপুতুল পোড়ান এবং তাঁর গ্রেফতারের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। শুভঙ্কর বলেন, ‘আমরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অবিলম্বে গ্রেফতার চাই। এই আন্দোলন এত সহজে থামবে না। এটি সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রশ্ন।’ কলকাতা পুলিশের এক পদস্থ আধিকারিকের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, শহরের যান চলাচল যাতে ব্যাহত না হয়, সে কারণেই মিছিল আটকানো হয়েছে। তাঁর কথায়, মিছিল আরও এগোলে শহরে বড়ো ধরনের যানজট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

দিল্লিতেও পৃথক কর্মসূচি নেয় ‘ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেস’। রাইসিনা রোডের সংগঠনের দফতর থেকে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরের দিকে মিছিল করেন যুব কংগ্রেস কর্মীরা। কয়েক জনের মুখে ছিল জ্ঞানেশ কুমারের মুখের আদলে তৈরি মুখোশ। কারও কারও হাত ছিল শিকলে বাঁধা। সংগঠনের সভাপতি উদয় ভানু চিবের নেতৃত্বে আয়োজিত ওই বিক্ষোভে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ভোটার তালিকা নিয়ে তদন্তের দাবি ওঠে। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আপত্তি এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী নথি প্রকাশ্যে আনার দাবিও জানানো হয়। চিবের বক্তব্য, ভোটের পবিত্রতা রক্ষা করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে কমিশনের অন্দরেই যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে তার ব্যাখ্যা এবং জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।

শীর্ষ আদালতে এ বিতর্কের আঁচ লেগেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। শুক্রবার আইনজীবী শৈলেন্দ্র মানি ত্রিপাঠী আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বলে জানা গিয়েছে। মামলাকারীর অভিযোগ, কমিশনের দুই সদস্যকে অবহিত না করেই একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই সিদ্ধান্তগুলি বাতিল করার পাশাপাশি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে। মামলায় শুধু জ্ঞানেশ কুমার নন, সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ এবং ডিজি (আইটি) সীমা খন্নাকেও জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩২ নম্বর ধারার অধীনে তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনার দাবি করা হয়েছে। মামলাকারীর যুক্তি, ২০২৩ সালের কেন্দ্রীয় আইনে নির্বাচন কমিশনারদের সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলেও সেই সুরক্ষার অর্থ একক ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নয়। কমিশনের মতো যৌথ সংস্থায় মতপার্থক্য দেখা দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধানই প্রযোজ্য—এমনটাই দাবি মামলাকারীর।

এদিকে, বিষয়টি সংসদেও তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে কংগ্রেস। দলীয় সূত্রের খবর, বিরোধী দলগুলির সঙ্গে আলোচনা করে জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে সংসদে আবারও প্রস্তাব আনার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক রয়েছে। সেখানে ‘এসআইআর’, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে ভোটার তালিকার সংশোধন ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক আপাতত শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশন বনাম রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তা ক্রমেই জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুর রূপ নিচ্ছে। শুক্রবারের দেশজোড়া বিক্ষোভ সেই সংঘাতকে আরও প্রকাশ্য করে তুলল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!