Advertisement
  • বি। দে । শ স | হ | জ | পা | ঠ
  • মার্চ ৫, ২০২৬

৪৭০ বছরের পুরনো টলেমির ‘আলমাজেস্ট’-এ গ্যালিলিওর স্বাক্ষর, বিস্মিত ইতিহাসবিদরা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
৪৭০ বছরের পুরনো টলেমির ‘আলমাজেস্ট’-এ গ্যালিলিওর স্বাক্ষর, বিস্মিত ইতিহাসবিদরা

সম্প্রতি ইতালিয়ান ইতিহাসবিদ ইভান মালারা সম্প্রতি এক চমকপ্রদ আবিষ্কার করেছেন। ১৫৫১ সালে প্রকাশিত ক্লডিয়াস টলেমির ‘আলমাজেস্ট’ বইটির পাতায় তিনি খুঁজে পান হাতে লেখা কিছু নোটযা গ্যালিলিও গ্যালিলির স্বাক্ষর ও লেখার ধরনের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে।

প্রথমে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে পারেননিকিন্তু ফ্লোরেন্সের জাতীয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এবং গ্যালিলিও মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞরা হাতের লেখা ও মন্তব্যের ধরন পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেছেন যে এগুলো গ্যালিলিওরই লেখা। বিশেষজ্ঞরা বলছেননোটগুলো প্রায় ১৫৯০ সালের সময় লেখাঅর্থাৎ গ্যালিলিওর বৃহঃস্পতির চাঁদ আবিষ্কারের প্রায় ২০ বছর আগে। মালারা জানানগ্যালিলিও আলমাজেস্ট পড়ার আগে প্রার্থনা করতেন। সে প্রমাণ হিসেবে তিনি নিজের ছাপ রেখে গেছেন। নোটগুলোতে কিছু নেতিবাচক মন্তব্যও আছে পটোলোমির তত্ত্ব সম্পর্কেযা পরে তার লেখা অন্যান্য কাজেও দেখা মিলেছে।  

গ্যালিলিও ছিলেন ‘ড়ো-ছবির মানুষ’। বিশ্ববিদ্যালয় অফ পিউজেট সাউন্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ জেমস ইভানস বলেছেন, ‘গ্যালিলিও গাণিতিক কারণে ভূকেন্দ্রবাদ প্রত্যাখ্যান করেননি। তিনি বড়ো ছবিটিই দেখেছেন।’ গ্যালিলিওকে সাধারণভাবে তাঁর মৌলিক মতবাদ ও পর্যবেক্ষণের জন্যই গুরুত্ব দেওয়া হ। কিন্তু এই নোটসগুলো দেখাচ্ছে তিনি গণিত ও প্রাচীন তত্ত্বের গূঢ় হিসাব‑নিকাশে পারদর্শী ছিলেনযা বর্তমান সময়ে অনেকে অগ্রাহ্য করে থাকেন। মালারা বলেছেন, টলেমির জটিল গাণিতিক প্রমাণ এবং কোপার্নিকাসের হেলিওসেন্ট্রিক তত্ত্ব একসাথে গ্যালিলিওকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে নতুন পথ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।’ ফ্লোরেন্সের জাতীয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে জানা যায়গ্যালিলিও কেবল আলমাজেস্ট’-এর নিবিড় পাঠকই ছিলেন নাতিনি টলেমির তত্ত্বের গভীর বিশ্লেষকও ছিলেন এবং সম্ভবত সে কারণেই ‘আলমাজেস্ট’-এর পাতায় নানা ধরণের মন্তব্য লিখেছেন। এই বিশেষ আবিষ্কার নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রবন্ধ জার্নাল ফর দ্য হিস্ট্রি অব অ্যাস্ট্রোনমি’-তে প্রকাশিত হবে জানিয়েছেন আবিষ্কারকর্তারা।

উল্লেখ্য, ১৫৬৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির টুসকানিতে জন্ম গ্যালিলিও গ্যালিলেই‑এর। গ্যালিলিওর বাবা ভিনসেঞ্জো গ্যালিলি সংগীতশিল্পী ও তাত্ত্বিক ছিলেন। তিনি তাঁর সন্তানকে চিকিত্সাবিদ্যার দিকে এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই গ্যালিলিওর মন গণিত ও প্রকৃতির রহস্য সমাধানে চঞ্চল হয়ে ওঠে। শরীরের গতিতূলা ও ভার প্রকাশের মতো মৌলিক প্রশ্নে তিনি নিজেই পরীক্ষা‑নিরীক্ষা চালাতে শুরু করেন। সে সময়েই তিনি প্রমাণ করেন যেভিন্ন ভরবিশিষ্ট বস্তু একই রকমভাবে পড়ে, যেটি অ্যারিস্টটেলীয় তত্ত্বের বিপরীত।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়, যখন তিনি টেলিস্কোপের দিকে নজর দেন।  যন্ত্রটি নেদারল্যান্ডে প্রথম তৈরি হলেও, গ্যালিলিও এটিকে এমনভাবে উন্নত করেন যে, টা দিয়ে তিনি চাঁদের অমসৃণ পৃষ্ঠবৃহস্পতির চারটি উপগ্রহভেনাসের পরিবর্তিত আবগতি এবং মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির অসংখ্য তারা দেখতে পান। তার এই পর্যবেক্ষণগুলোই পৃথিবী‑কেন্দ্রিক তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে সূর্য‑কেন্দ্রিক (হেলিওসেন্ট্রিক) ব্রহ্মাণ্ডের ধারণাকে দৃঢ় ভিত্তিতে স্থাপন করেছিল। গ্যালিলিও শুধু পর্যবেক্ষকই ছিলেন নাতিনি নিজে নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।  যেখানে পরিমাপপরীক্ষা ও বিশ্লেষণ প্রকৃতির গোপন কথাকে ভাষায় অনুবাদ করার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তিনি দাবি করেছিলেন, প্রকৃতির ভাষা হচ্ছে গণিতনির্ভর, আর এ ছাড়া বিশ্বকে বোঝা অসম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দেয় এবং পরবর্তীতে আইজ্যাক নিউটনের মতো বিজ্ঞানীরা একের পর এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করতে থাকেন।

তবে তাঁর তীব্র প্রগতিশীল ভাবনা তাঁকে সংঘাতেও জড়িয়ে ফেলে। ১৬৩২ সালে তাঁর রচিত ‘’পৃথিবীর দুটি প্রধান ব্যবস্থার সংলাপ’ বইতে তিনি স্পষ্টভাবে কোপারনিকাসীয় বর্ণনা তুলে ধরেন, ফলে তখনকার রোমান ক্যাথলিক চার্চের সঙ্গে তাঁর তীব্র বিরোধ বাঁধে। ১৬৩৩ সালে গ্যালিলিওকে বিধর্মিতার’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়।   জীবনের শেষ দিনগুলো তাঁকে গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছিল। গৃহবন্দীত্বের সময়েও গ্যালিলিও তার কাজ থামাননি। তিনি মাধ্যাকর্ষণগতির সমীকরণ ও অন্যান্য পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা চালিয়ে যানএমনকি ১৬৩৭ সালে ব্যাটারির মতো যন্ত্রের ধারণাও তৈরি করেন যা পরে সময়ের সঙ্গে‑সঙ্গে ঘড়ির মেকানিজমে বদলে যায়। তার অদম্য মনোযোগ ও জ্ঞানচর্চা এমন ছিল যেঅন্ধত্ব আসার পরও তিনি গবেষণা ও লেখালিখি চালিয়ে গেছেন। ১৬৪২ সালের ৮ জানুয়ারি ফ্লোরেন্সের আর্কেত্রি শহরে তিনি মারা যান। গ্যালিলিওর জীবন ও কাজ শুধু এক ব্যক্তির কাহিনি নয়এটি একটি সময়ের বিভাজকএকটি নতুন বিশ্বদর্শনের জন্মস্থান এবং বিজ্ঞান ও ধর্মধারণা ও বাস্তবতার মধ্যে এক দর্শনিক লড়াইয়ের সাক্ষী।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!