Advertisement
  • খাস-কলম
  • এপ্রিল ১৪, ২০২২

বাংলা বর্ষপঞ্জির সূচনার তথ্যতালাশ

গাজন শেষে দেবাদিদেব মহাদেব না মহাভারতের মমতা আর উতথ্যর পুত্র দীর্ঘতমার পুত্র বঙ্গ? রাজা শশাঙ্ক না জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ কে ছিলেন আধুনিক বাংলা বর্ষপঞ্জির স্রষ্টা

তুষার ভট্টাচাৰ্য
বাংলা বর্ষপঞ্জির সূচনার তথ্যতালাশ

অভিবক্ত বঙ্গদেশে নববর্ষ বা বঙ্গাব্দের সূচনা কবে হয়েছিল তা নিয়ে বিভিন্ন রকমের মতামত রয়েছে । ঋকবেদ, মহাভারত এবং মৎস্য পুরাণ গ্রন্থে বঙ্গাব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে – মাতা মমতা ও পিতা উতথ্যর পুত্র দীর্ঘতমার ঔরসে সুদেষ্ণার গর্ভের পাঁচ সন্তানের এক সন্তান ‘বঙ্গ’র নাম থেকে বঙ্গাব্দের নামকরণ। ঋকবেদের ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ পর্বেও ‘ বঙ্গে’র উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার অনেকে মনে করেন গৌড় অধিপতি রাজা শশাঙ্কের আমলেই সূচনা হয় বঙ্গাব্দের। তাঁর আমলেই ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১৪এপ্রিল সোমবার শুরু হয়েছিল বঙ্গাব্দের প্রথম মাস এবং দিন গণনার হিসেব ।
প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড:সুকুমার সেন বলেছেন যে – ‘বাংলাদেশের ( অবিভক্ত )একটি বিশেষ উদ্ভিদ হল কাপাস।বঙ্গ শব্দের প্রাচীন অর্থ হল কাপাস । এই কাপাস থেকেই বঙ্গ নামের উৎপত্তি ।’
ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে ‘বঙ্গ ‘ শব্দের সঙ্গে দিন গণনার ‘অব্দ ‘যোগ করে বঙ্গাব্দ সনের সূচনা হয়েছে ।

অন্যদিকে পুরাণে কথিত রয়েছে -নতুন বছরের প্রথম মাস বৈশাখের প্রথমদিনেই কৈলাস পর্বতে নববর্ষ উৎসবের সূচনা হয়।  চৈত্র দিনের শেষে শিবের গাজন শেষ হয়ে যায়। তাই পার্বতীর সঙ্গে সাংসারিক কথাবার্তা বলার একটু ফুরসৎ পান দেবাদিদেব মহাদেব  ।
ছড়াতে বর্ণনা রয়েছে –

  “পুলকিতা পার্বতী পুছেন পঞ্চানন
জগদুৎপত্তি কথা কহ দয়াময়
সংসার সৃজন অগ্রে কার জন্ম হয়
বর্ষে বর্ষে কেন হয় নূতন নূতন
কী নিমিত্ত হয় কহ রাজা পাত্রগণ
নূতন পঞ্জিকা নাম হয় কী কারণ
কী হেতু করিবে নব পঞ্জিকা শ্রবণ
ভব কন ভবানীকে
কহি বিবরণ
বৎসরের ফলাফল করহ শ্রবণ ।  ”

শিব তো মহাকাল । তিনি অনেক আগাম খবর এবং পুরাণের কথা গড়গড় করে পার্বতীকে বলে গিয়েছেন ।
প্রাচীনকালে এভাবেই মুখে মুখে দিন, মাস, তিথি, নক্ষত্রের কথা প্রচারিত হয়েছে । পরবর্তীকালে পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করেই নতুন পাঁজি বা পঞ্জিকা ছাপা শুরু হয়। ১৮১৮খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বাংলা ভাষায় মুদ্রিত পঞ্জিকা ছাপা শুরু হয় । ১৮৩৫ খিস্টাব্দে কলকাতার দীনবন্ধু প্রেসের পঞ্জিকা শুভাশুভ দিনক্ষণের তালিকা ভাষায় সংগৃহীত করে প্রকাশ করে।

সেই সময়ে ১ বৈশাখে নতুন পাঁজি কিনে বাড়িতে পাঠ করার জন্য পাঁজিতেই নির্দেশ দেওয়া থাকত এরকমভাবে – শুনিবেক শুদ্ধ চিত্তে শুদ্ধান্বিত মনে / পূর্ণ পাত্র সম্মুখে বেষ্টিত বন্ধুগণ /ফলপুষ্প হস্তে করি পঞ্জিকা শ্রবণ /শ্রবণেতে সবার আয়ু বৃদ্ধি হয় /নৃপ নাম শ্রবণেতে রাজপীড়া ক্ষয় ।

ঐতিহাসিকদের মতে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চে একটি কৃষি ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি ( হিজরি সন ও সৌরবর্ষের সংমিশ্রণে যার নামকরণ হল – ‘ফসলি সন ‘ ) তৈরি করে সম্রাটের দরবারে পেশ করেন জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ । সেই বর্ষপঞ্জি দিয়েই গণণা হয় বাংলার সাল তারিখ

যদিও আম বাঙালির পয়লা বৈশাখকে নববর্ষ হিসেবে সূচনা করার পিছনে মুঘল সম্রাট জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের অসামান্য অবদান ছিল একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য।মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে (৯৬৩ হিজরি সন )দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করেন । তাঁর শাসনকালে ভারতে বর্ষপঞ্জির হিসেব করা হত চান্দ্র মাস অনুযায়ী, যাকে হিজরি সন বলা হত। ২৭দিনের হিসেবে এই হিজরি সন গণনা করা হত । এর ফলে প্রতিবছরই হিজরি সন এগিয়ে আসে চান্দ্র মাসের হিসেব অনুযায়ী। এই জন্য সেই সময়ে কৃষিকেন্দ্রীক বঙ্গদেশের ফসল উৎপন্ন হওয়ার পরে কৃষকদের খাজনা প্রদানের সময়সীমার কিছুটা হেরফের হয়ে যেত। বাংলার কৃষকরা আষাঢ়, শ্রাবণ মাসের পরে নতুন ফসল উঠলে রাজা, জমিদারদের খাজনা মিটিয়ে দিতেন ।  কিন্তু হিজরি সনের হিসেব অনুযায়ী, প্রতিবছর চান্দ্রমাস এগিয়ে আসার ফলে বাংলার কৃষকরা নতুন ফসল না উঠলেও জমির খাজনা দিতে খুব মুশকিলে পড়তেন । কোনও বছর নতুন হিজরি সন শুরু হত ইংরেজি নভেম্বর মাসে আবার কোনও বছরে মার্চ মাসে ।

বাংলার কৃষকদের এই অসুবিধার কথা সম্যক উপলন্ধি করে সম্রাট আকবর তাঁর দরবারের স্বনামধন্য পন্ডিত ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ সিরাজি’কে নির্দেশ দেন -চান্দ্রমাস বা হিজরিসন এবং সূর্যকেন্দ্রীক বর্ষপঞ্জির সংমিশ্রণে একটি নতুন বর্ষ তৈরি করার । যাতে করে বঙ্গ দেশের আপামর কৃষকদের খাজনা বা কৃষিকর দিতে সুবিধে হয় ।

মুঘল সম্রাট আকবরের নির্দেশ পেয়ে অভিজ্ঞ প্রবীণ জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ কয়েকবছর গণনার পর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চে একটি কৃষি ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি ( হিজরি সন ও সৌরবর্ষের সংমিশ্রণে যার নামকরণ হল – ‘ফসলি সন ‘ ) তৈরি করে সম্রাটের দরবারে পেশ করেন।

১৫৮৪খিস্টাব্দে জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ সিরাজি এই নতুন’ ফসলি সন ‘ বা বঙ্গাব্দ বর্ষের সূচনা করলেও ঐতিহাসিকরা মনে করেন সম্রাট আকবর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকেই অর্থাৎ তাঁর রাজত্বকালের শুরু থেকেই বাংলার সাধারণ কৃষকদের বা প্রজাদের সুবিধার্থে ফসলি সনের হিসেব বা গণনা অনুযায়ী খাজনা আদায় শুরু করেছিলেন ।

বাংলা নববর্ষ এখনও দুই বাংলায় নতুন আশা, সুখ সমৃদ্ধি, আশা আকাঙ্খার স্বপ্ন এঁকে দেয় আমবাঙালির মানস পটে । অবিভক্ত বাংলা, আসাম, ত্রিপুরায় বাংলা নববর্ষ পালিত হয় দোকানে দোকানে হালখাতা । এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় আয়োজিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তবে বাঙালি প্রধান অঞ্চলগুলিতে বিদেশীয় ইংরেজি নববর্ষ যেভাবে আদিখ্যেতা, জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয় তা বাঙালির নিজেদের বাংলা নববর্ষ নিয়ে আদৌ হয় না ।

বাংলা নববর্ষ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন -নববৎসর আসিল।  নববর্ষের এমন নবীন মূর্তি অনেকদিন দেখি নাই । সত্য যেখানে সুন্দর, শক্তি যেখানে প্রেম, সেইখানে একেবারে সহজ হইয়া বসিবার জন্য আজ নববর্ষের দিনে ডাক আসিল । আজ নববর্ষের পাখি সেই ডাক ডাকিতেছে । বেলফুলের গন্ধ সেই সহজ কথাটিকে বাতাসে অযাচিত ছড়াইয়া দিতেছে । নববর্ষ যে সহজ কথাটি জানাইবার জন্য প্রতিবৎসর দেখা দিয়া যায় সেই কথাটি আজ স্তব্ধ হইয়া শুনিবার সময় পাইলাম। আজ প্রভাতের আলোকের এই নিমন্ত্রণ পত্রটিকে প্রণাম করিয়া মাথায় করিয়া গ্রহণ করি (১৩১৯ বঙ্গাব্দ ) ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!