Advertisement
  • দে । শ বৈষয়িক
  • জুন ১, ২০২৬

হরমুজে সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তায় ভারতের ‘বিকল্প দুয়ার’ ওমান! কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
হরমুজে সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তায় ভারতের ‘বিকল্প দুয়ার’ ওমান! কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি

পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকাইজরায়েল-ইরান যুদ্ধের আবহে যখন হরমুজ প্রণালী কার্যত অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছেতখনই ভারতের জন্য নতুন বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার দরজা খুলে দিল ওমান। সোমবার থেকে কার্যকর হলো ভারত-ওমান কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ)। কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়ালের দাবিএ চুক্তি শুধু বাণিজ্য বৃদ্ধির পথই প্রশস্ত করবে নাভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মাসকাটে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। সমস্ত আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ১ জুন, সোমবার থেকে তা কার্যকর হয়েছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিনেই মুম্বইকলকাতা ও চেন্নাই থেকে কৃষিপণ্য এবং রত্ন ও গয়নার প্রায় দশটি চালান অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা নিয়ে ওমানের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। এ চুক্তিকে ঘিরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে বাণিজ্য গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই)। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তবের মতেওমানের অর্থনীতি বা জনসংখ্যা হয়তো খুব বেশি নয়কিন্তু তার ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

এশিয়ার অধিকাংশ দেশ যেখানে হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উপর নির্ভরশীলসেখানে ওমানের বিস্তীর্ণ উপকূলরেখার বড়ো অংশ হরমুজের বাইরেসরাসরি আরব সাগর এবং ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত। সে কারণেই সালালাহ এবং দুকমের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলি হরমুজে অস্থিরতা দেখা দিলেও সচল রাখা সম্ভব। ফলে যুদ্ধসংঘাত কিংবা ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময়েও ওমান ভারতের জন্য নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য ও জ্বালানি করিডর হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি  সম্ভাবনাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। মার্কিন-ইরান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপক ভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের দৈনিক তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের এক-চতুর্থাংশ এই প্রণালীর উপর নির্ভরশীল। ফলে এ অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় সৌদি আরবকাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে ভারতে তেল ও গ্যাস সরবরাহে প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছেউপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যে ধাক্কা লেগেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে ভারতের আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯.৮ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে ভারতের রফতানিও ৪.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে এসেছে ২.৭ বিলিয়ন ডলারে। তবে এ ছবির ব্যতিক্রম ওমান। গত এক বছরে ওমান থেকে ভারতের আমদানি ২৪৬.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৪৩০ মিলিয়ন ডলার থেকে তা পৌঁছেছে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারে। মূলত অপরিশোধিত তেল এবং ইউরিয়া আমদানি বৃদ্ধির ফলেই এই উল্লম্ফন। অন্য দিকেওমানে ভারতের রফতানি মাত্র ১০.৩ শতাংশ কমেছেযা উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম।

জিটিআরআই-এর মতে, সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে ওমান ভারতের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে। সে অর্থে সিইপিএ কেবল বাণিজ্যিক চুক্তি নয়ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। চুক্তির আওতায় ওমান তার প্রায় ৯৮ শতাংশ শুল্কসারিতে অবিলম্বে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে। এর ফলে মূল্যের বিচারে ভারতের প্রায় ৯৯ শতাংশ রফতানি পণ্য ওমানে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। বিশেষ সুবিধা পাবে বস্ত্রচামড়াজুতোরত্ন ও গয়নাক্রীড়াসামগ্রীপ্লাস্টিকআসবাবপত্রকৃষিপণ্যইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যওষুধচিকিৎসা সরঞ্জাম এবং অটোমোবাইল শিল্প।

২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ওমানে ভারতের রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে পেট্রোল ও ন্যাফথার মতো পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের অংশই সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি ক্যালসাইন্ড অ্যালুমিনাইস্পাতজাত পণ্যযন্ত্রপাতি এবং চালও উল্লেখযোগ্য রফতানি পণ্যের তালিকায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতেএত দিন ভারতের অধিকাংশ পণ্য তুলনামূলক কম শুল্কে ওমানে প্রবেশ করলেও কিছু ক্ষেত্রে শুল্কহার ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছত।  বাধা দূর হওয়ায় ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা আরও বাড়বে। যদিও মাত্র ৫৫ লক্ষ জনসংখ্যার ওমানের বাজার সীমিত হওয়ায় রফতানি বৃদ্ধির সম্ভাবনাও স্বাভাবিক ভাবেই একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকবে।

অন্য দিকেওমানও বাণিজ্য চুক্তি থেকে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে। ভারত ধাপে ধাপে প্রায় ৭৮ শতাংশ শুল্কসারিতে শুল্ক কমাবে বা তুলে দেবে। জ্বালানিসার এবং শিল্প কাঁচামাল— এই তিন ক্ষেত্রেই ওমান ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী দেশ। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারত ওমান থেকে ৭.২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেলতরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং সারের অংশ সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি মিথানল ও অ্যামোনিয়ার মতো শিল্প কাঁচামালেরও অন্যতম উৎস ওমান। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল জানিয়েছেন,  এই চুক্তি ভারতীয় কৃষকমৎস্যজীবীক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগীকারিগর  রফতানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। নতুন বাজারে প্রবেশাধিকার যেমন বাড়বেতেমনই কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ওমান। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দুদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ পৌঁছেছে ১১.১৮ বিলিয়ন ডলারেযা আগের বছরের ১০.৬১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। হরমুজে যুদ্ধের আবহে সে সম্পর্কই এখন ভারতের কাছে আরও কৌশলগত গুরুত্ব পেতে চলেছে। কারণঅস্থির মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে ওমান ক্রমশ উঠে আসছে ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিকল্প দুয়ার’ হিসেবে। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!