Advertisement
  • বি। দে । শ
  • এপ্রিল ৩, ২০২৬

মাঝ সমুদ্রে পথ বদলে চিনমুখী ভারতগামী ইরানি তেলবাহী জাহাজ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে ঘোর অনিশ্চয়তা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মাঝ সমুদ্রে পথ বদলে চিনমুখী ভারতগামী ইরানি তেলবাহী জাহাজ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে ঘোর অনিশ্চয়তা

আরব সাগরের বুকে ফের একবার কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার ছায়া।  ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে যাত্রা শুরু করা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ট্যাঙ্কার ‘পিং শুন’ তার পূর্বঘোষিত গন্তব্য ভারত থেকে সরিয়ে হঠাৎ চিনের দিকে রওনা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ীকয়েক দিন আগেও র‍্যাডারে জাহাজটির গন্তব্য  গুজরাটের ভাদিনা বন্দরের নাম দেখা যাচ্ছিলহঠাৎ করেই সে সংকেত বদলে এখন চিনের দোংইং শহরকে নতুন গন্তব্য হিসেবে দেখাচ্ছে।

ভারতমুখী তৈলবাহি জাহাজের আকস্মিক দিক পরিবর্তনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হয়েছে প্রবল কৌতূহল ও জল্পনা। প্রশ্ন উঠছেশেষ মুহূর্তে কেন বদলে গেল গন্তব্যকী এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো যে ভারত নয়, চিনের দিকে ঘুরে গেল বিপুল পরিমাণ ইরানি তেলবাহী জাহাজ? ওয়াকিবহাল মহলের এর সম্ভাব্য কারণ দুটি; এক, আর্থিক কারণ। কেপলারের ‘রিফাইনিং ও মডেলিং বিভাগ’-এর কর্মকর্তা সুমিত রিটোলিয়া জানিয়েছেনবিষয়টি সম্ভবত টাকাপয়সার আদান-প্রদান কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানিয়েছেন, আগে যেখানে ইরানি তেল বাণিজ্যে ৩০ থেকে ৬০ দিনের ক্রেডিট সুবিধা দেওয়া হতসেখানে এখন বিক্রেতারা অনেক বেশি কঠোর শর্তেঅগ্রিম বা স্বল্পমেয়াদি অর্থপ্রদানের ভিত্তিতে লেনদেন চাইছেন। ভারতও আগে এই সুযোগসুবিধা পেত।  পরিবর্তিত আর্থিক শর্তেই জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

রিটোলিয়া আরও জানিয়েছেন, এই জাহাজের কার্গোর প্রকৃত বিক্রেতা ও ক্রেতা কেতা এখনো সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। ফলে পুরো লেনদেন কাঠামোই এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। তাঁর মতেইরানি তেলের ক্ষেত্রে মাঝপথে গন্তব্য পরিবর্তনের ঘটনা একেবারে বিরল নয়তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক শর্ত মিলিয়ে আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্য ক্রমশই আরও জটিল হয়ে উঠছে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ব্রিটেন আয়োজিত ৬০ দেশের আন্তর্জাতিক বৈঠকে দিল্লির আক্রমণাত্মক বার্তাও সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। বৈঠকে,ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জানিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালী  তার আশপাশের সংঘাতপূর্ণ জলপথে এ পর্যন্ত একাধিক ভারতীয় নাবিকের প্রাণহানি ঘটেছে। বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালীকে দ্রুত স্বাভাবিক ও খোলা রাখার জন্য তেহরানের প্রতি আহ্বান জানান বিদেশসচিব। তিনি বলেনএই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হল উত্তেজনা হ্রাস করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপ ও আলোচনার প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা।

সূত্রের খবর অনুযায়ী, ‘আফ্রাম্যাক্স’ শ্রেণির এই ট্যাঙ্কারটি ২০০২ সালে তৈরি। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই জাহাজই ইরান থেকে প্রায় ৬ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। প্রথম পর্যায়ে তার গন্তব্য হিসেবে ভারতের গুজরাটের ভাদিনার বন্দরের নামই দেখানো হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী৪ এপ্রিল এই কার্গো পৌঁছানোর কথা ছিল বলে ট্র্যাকিং তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু সমুদ্রযাত্রার মাঝপথেই আচমকা সে গন্তব্য পরিবর্তনের সংকেত আসে। জাহাজটির অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বা এআইএস ট্রান্সপন্ডারযা আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে জাহাজের অবস্থান ও গন্তব্য নির্দেশ করেতা হঠাৎ করেই ভারতের বদলে চিনের দিকে ইঙ্গিত করতে শুরু করে। যদিও বিশেষজ্ঞদের একাংশ স্পষ্ট করছেন, ভ্রান্তিপূর্ণ দিকচিহ্ন দেখানো অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে, ভারতের দিক থেকে এ ঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।  প্রায়  বছর পর ফের ইরানি তেল আমদানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে গুজরাটের ভাদিনার বন্দরের সঙ্গে যুক্ত  তেল  রিফাইনারি  সংস্থাগুলিসাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রে থাকা ইরানি তেল কেনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছিল বলে জানা যায়। ভারতীয় তেল বাজারের ইতিহাসে ইরান একসময় ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী দেশ। ২০১৮ সালে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ১১.৫ শতাংশই আসত ইরান থেকে। সে সময় দিনে প্রায় ৫,১৮,০০০ ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করত ভারত। কিন্তু ২০১৮ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কঠোর হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ২০১৯ সালের মে মাস থেকে ভারত সম্পূর্ণভাবে ইরানি তেল আমদানি বন্ধ করে দেয়।

এরপর থেকে ভারত বিকল্প উৎস হিসেবে পশ্চিম এশিয়াযুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য অঞ্চলের তেলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এক সময় ইরানের ক্রুড অয়েল ভারতের রিফাইনারিগুলির জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল, প্রথমত, ওই কাঁচাতেল প্রযুক্তিগতভাবে পরিশোধনের জন্য সহজ  তুলনামূলকভাবে কম খরচা সাপেক্ষ ছিল দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে ‘ক্রেডিট’ ব্যবস্থায় তেল সরবরাহ করত ইরান। বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ইরান অনেক দিন যাবদ ‘সুইফ্ট’ বা সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাঙ্ক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন থেকে বিচ্ছিন্ন। বৈশ্বিক আর্থিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বাইরে থাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেন কার্যত কঠিন হয়ে পড়েছে। এর আগে কিছু ক্ষেত্রে ইউরো মুদ্রায় এবং তুর্কি ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন হতকিন্তু সে ব্যবস্থাও এখন আর কার্যকর নেই বলে জানা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতেএই আর্থিক বিচ্ছিন্নতাই ইরানি তেল বাণিজ্যে সবচেয়ে সবচেয়ে বড়ো বাধা তৈরি করছে। কারণ শুধু তেল সরবরাহ নয়তার অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তাও এখন প্রশ্নের মুখে। উল্লেখযোগ্যভাবেযুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সমুদ্রপথে থাকা ইরানি তেল কেনার ক্ষেত্রে সীমিত সময়ের জন্য কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল। সেই শিথিলতার মেয়াদ ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে। বর্তমানে সমুদ্রে থাকা প্রায় ৯৫ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেলের মধ্যে বড়ো অংশ বিভিন্ন দেশের বাজারে যেতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছেযার মধ্যে ভারতের জন্যও একটি অংশ সম্ভাব্য ছিল। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!