- বি। দে । শ
- অক্টোবর ৩০, ২০২৬
ভাঙনের মুখে নেতানিয়াহুর জোট! বিরোধী শিবিরকে সমর্থনের ইঙ্গিত ইউটিজের, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা ইজরায়েলে
ইজরায়েলের রাজনীতিতে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরও সরকার গঠন নিয়ে কাটেনি অনিশ্চয়তা। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টির জোট ১২০ আসনের নেসেটে পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্য দিকে, বিরোধী নেতা অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন শিবিরের ঝুলিতে রয়েছে ৪৮টি আসন। আরবীয় রাজনৈতিক দলগুলি সম্মিলিত ভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনও পক্ষই অর্জন করতে পারেনি।
এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শরিক অতি-রক্ষণশীল হেরাডি ইহুদিদের রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে)-এর অবস্থান ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। সংবাদমাধ্যম Ynet-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দলটি শাসক জোট ছেড়ে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটকে প্রধানমন্ত্রী পদে সমর্থনের কথা বিবেচনা করছে। তবে এর বিনিময়ে হেরাডি বা অতি-রক্ষণশীল ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে তারা। ইউটিজে-র এই অবস্থান কার্যকর হলে নেসেটে নেতানিয়াহুর সমর্থন আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নেসেটের মোট আসনসংখ্যা ১২০। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন সাংসদের সমর্থন। চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শাসক জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। এর মধ্যে একক ভাবে লিকুদ পার্টির দখলে রয়েছে ২৭টি আসন। জোটের অন্যতম শরিক ইউটিজে পেয়েছে ৭টি আসন। ফলে দলটি সমর্থন প্রত্যাহার করলে শাসক শিবিরের আসনসংখ্যা আরও কমে যাবে। শাসক জোটের অন্য শরিকদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের নেতৃত্বাধীন ওৎমা ইহুদিত পেয়েছে ৭টি আসন। প্রাক্তন উপপ্রধানমন্ত্রী আরিয়ে দেরদির নেতৃত্বাধীন শাস পেয়েছে ৬টি আসন। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট পার্টির (আরজেডপি) ঝুলিতেও রয়েছে ৬টি আসন। এই দলগুলির সমর্থন নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্য দিকে, গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের মধ্যে তাঁর নিজের দল ইয়াশার পেয়েছে ২১টি আসন। জোটের আর এক শরিক বি’ইয়াসাদ পেয়েছে ১২টি আসন। বামপন্থী দল দ্য ডেমোক্র্যাটসের আসনসংখ্যা ৮ এবং রুশভাষী ইহুদিদের রাজনৈতিক দল ইজরায়েল বেইতেনুর দখলে রয়েছে ৭টি আসন। আরবীয় রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১২টি আসন। অন্য দিকে, মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম পেয়েছে ৮টি আসন। সব মিলিয়ে আরবীয় দলগুলির আসনসংখ্যা ১৯। এই দলগুলির সমর্থন বিরোধী শিবিরের সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যেই দ্য ডেমোক্র্যাটসের নেতা ইয়ার গোলান বিরোধী জোটকে আরবীয় দলগুলির সঙ্গে সমঝোতা করে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইজরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করেছে। তাতে আসনসংখ্যার কোনও পরিবর্তন হয়নি। নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি, বিরোধী জোট ৪৮টি এবং আরবীয় দলগুলি সম্মিলিত ভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে। চূড়ান্ত হিসাবে ভোটদানের হার দাঁড়িয়েছে ৭৭.৯ শতাংশ। মোট ভোট পড়েছে ৫৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৬৫টি। নির্বাচনের আগে বুথফেরত সমীক্ষাগুলিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তী কিছু পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর জোট সামান্য এগিয়ে থাকবে বলে জানানো হলেও চূড়ান্ত ফলাফলে কোনও পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ভোটদানের যোগ্য ইজরায়েলির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৩ লক্ষ ৩০ হাজার। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই ছিল দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আরবীয় রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধে ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। তাদের দাবি, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলি ভোটারদের ভয় দেখানো এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কাতার এবং সংশ্লিষ্ট আরবীয় রাজনৈতিক দলগুলি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
লিকুদ পার্টি পুলিশ, ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। বুধবার সমাজমাধ্যম এক্স-এ নেতানিয়াহুর অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত একটি পোস্টে জানানো হয়, আরবীয় দলগুলির পরিচালিত ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগে শতাধিক সাক্ষ্য ও প্রমাণ জমা দেবে লিকুদ। ঘুষ দেওয়া, ভোটারদের হুমকি, হিংসা, জাল নথি তৈরি এবং একাধিক বার ভোট দেওয়ার মতো অভিযোগও তুলেছে শাসক দল। তবে এগুলি লিকুদ পার্টির দাবি। অভিযোগগুলির স্বাধীন ভাবে সত্যতা যাচাই করা হয়নি। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পাশাপাশি দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিও জানিয়েছে দলটি। তাদের বক্তব্য, এই ধরনের অনিয়ম ইজরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার জন্য বিপজ্জনক।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ‘ডবল এনভেলপ’ বা দ্বিস্তরীয় খামে জমা পড়া ভোট গণনার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করেছে। এই ভোটগুলির মধ্যে রয়েছে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর সদস্য, বন্দি, চিকিৎসাকর্মী, শারীরিক অসুস্থতায় ভোগা ভোটার এবং বিদেশে কর্মরত ইজরায়েলি প্রতিনিধিদের ভোট। এর আগে কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মোট ১২,০১৮টি সাধারণ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১,৭১২টির ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ করা হয়েছিল। ওই কেন্দ্রগুলিতে মোট ভোটার ছিলেন ৫১ লক্ষ ২৬ হাজার ৭৫৯ জন। বাকি কেন্দ্রগুলির ভোট যাচাইয়ের কাজও নিয়মমাফিক চলছিল। ইজরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দেন না। তাঁরা রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে ১২০ আসনের নেসেটে দলগুলির প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন করা হয়। সংসদে আসন পাওয়ার জন্য কোনও দলকে জাতীয় স্তরে অন্তত ৩.২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। এই ন্যূনতম ভোটের হার অতিক্রম করা দলগুলির মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন ভাগ করে দেওয়া হয়।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন সাংসদের সমর্থন। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট আইজাক হেরজগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। সংসদে কোন নেতার সরকার গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখে তিনি সংশ্লিষ্ট নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। এরপর জোট গঠন এবং সরকার তৈরির জন্য ওই নেতা সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় পাবেন। ‘দ্য টাইমস অফ ইজরায়েল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে নির্বাচনের ফলাফল প্রেসিডেন্ট আইজাক হেরজগের কাছে জমা দেওয়ার কথা। ১০ নভেম্বর ২৬তম নেসেটের শপথ গ্রহণের দিন নির্ধারিত রয়েছে। যদি কোনো রাজনৈতিক নেতা প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে না পারেন, তা হলে ইজরায়েলে ফের সাধারণ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তত দিন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে চলবে জোট গঠনের আলোচনা।
এদিকে, নির্বাচনে লিকুদ পার্টির ফলাফলের জন্য নেতানিয়াহুকে অভিনন্দন জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলেও লিকুদকে ইজরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন তিনি। দলটির নির্বাচনী ফলাফলকে ‘বড় জয়’ বলেও উল্লেখ করেছেন মিলেই। সব মিলিয়ে, নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরেও ইজরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত। ইউটিজে-র অবস্থান, আরবীয় দলগুলির সম্ভাব্য ভূমিকা এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে সমঝোতা—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনে সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নেসেটে ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে কোন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
❤ Support Us








