Advertisement
  • বি। দে । শ
  • অক্টোবর ২৯, ২০২৬

ইরানে চলচ্চিত্র পরিচালক জাফর পানাহিকে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের সাজা !

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ইরানে চলচ্চিত্র পরিচালক জাফর পানাহিকে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের সাজা !

ইরানের রাষ্ট্রীয় দমননীতি, সেন্সরশিপ আর ব্যক্তিস্বাধীনতার সংকটকে বার বার চলচ্চিত্রের পর্দায় তুলে এনেছেন তিনি। নিষেধাজ্ঞা, গ্রেফতারি, কারাবাস — কোনো কিছুই থামাতে পারেনি তাঁর ছবি তৈরির জেদ। এ বার বহুল আলোচিত ইরানি পরিচালক জাফর পানাহিকেই নতুন করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিল ইরানের আদালত। শুধু কারাবাস নয়, তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কী অভিযোগে এই সাজা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আদালতের রায় ঘোষণার সময় পানাহি উপস্থিত ছিলেন না। নতুন করে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ইরানের সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত সপ্তাহে আচমকাই পানাহির সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলি বন্ধ হয়ে যায়। তার পরেই বিষয়টি জানতে তেহরানের সংস্কৃতি ও সংবাদমাধ্যম সংক্রান্ত সরকারি দফতরে যান পরিচালক ও তাঁর আইনজীবী। সেখানেই তাঁরা জানতে পারেন, তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। পানাহির আইনজীবীর দাবি, এ মামলায় শুনানির আগে তাঁর মক্কেলকে যথাযথ ভাবে কিছু জানানো হয়নি। ফলে রায়ের বিষয়ে তাঁরা আগে থেকে অবগত ছিলেন না। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের বিপ্লবী আদালতের ২৬ নম্বর শাখা এ রায় দিয়েছে। তবে নতুন মামলায় ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি।

পানাহির বিরুদ্ধে ইরানে এর আগেও একাধিক মামলা হয়েছে। গত বছর ইরান সরকারের বিরুদ্ধে ‘প্রচারমূলক কার্যকলাপে’ যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁকে অনুপস্থিতিতেই এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সে মামলায় দু-বছরের জন্য সামাজিক ও নাগরিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। সেসময় সে রায়ের বিরুদ্ধে পরিচালকের আইনজীবীরা আইনি পদক্ষেপ করেছিলেন। নতুন করে পাঁচ বছর এক মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ অবশ্য সে মামলা থেকে পৃথক। ফলে দু-টি সাজা কী ভাবে কার্যকর করা হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। পানাহির বিরুদ্ধে বর্তমানে তিনটি মামলা বিচারাধীন বলেও জানিয়েছেন নিলি।

তবে নতুন রায় ঘোষণার পরেও পানাহিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে খবর নেই। সাজা ঘোষণার পর সোমবার সন্ধ্যাতেও পরিচালকের সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁর আত্মীয়-পরিজনদের। তখনো পানাহি কারাবন্দি হননি। অন্যদিকে, ইরানের মানবাধিকারকর্মীদের একাংশের মতে, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে। মানবাধিকারকর্মীদের আইনি পরামর্শ দেওয়া সংস্থা দাদবানের আইনজীবী মইন খাজায়েল জানিয়েছেন, পরিচালকের কোনো সম্পত্তির সঙ্গে অপরাধের যোগ রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট আইনি ভিত্তি দেখাতে না পারলে তা বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত ইরানের সংবিধানের পরিপন্থী হতে পারে।

ইরান ও বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতে জাফর পানাহির পরিচিতি কেবল আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী পরিচালক হিসাবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে নিরন্তর শিল্পীসত্তার লড়াইয়ের এক প্রতীক হিসাবেও। তাঁর ছবিতে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সংঘাত, সামাজিক বিধিনিষেধ ও স্বাধীনতার প্রশ্ন। ঠিক সে কারণেই দীর্ঘ দিন ধরে ইরানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছেন তিনি। ২০১০ সালেও পানাহির বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি, ছবি তৈরি, চিত্রনাট্য লেখা, সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং বিদেশযাত্রার উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আরও একাধিক আইনি পদক্ষেপ করা হয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে সরে আসেননি তিনি। কখনো সীমিত পরিসরে, কখনো গোপনে ছবি তৈরি করেছেন। সেসব ছবিতে ইরানের সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নানা দিক উঠে এসেছে।

‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’, ‘ট্যাক্সি’ এবং ‘নো বিয়ার্স’-এর মতো ছবি সেই প্রতিরোধেরই উদাহরণ। ছবিগুলিতে কখনও নিজের জীবন ও কাজের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে বিষয় করেছেন পরিচালক, কখনও আবার তুলে ধরেছেন ইরানের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং স্বাধীন ভাবে কথা বলার অধিকার নিয়ে তাঁদের লড়াই। ১৯৯৫ সালে তাঁর ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে ক্যামেরা দ’র পুরস্কার পেয়েছিল। ২০০০ সালে ‘দ্য সার্কল’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন জয় করে। ২০১৫ সালে ‘ট্যাক্সি’ বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বিয়ার পায়।

২০২২ সালের জুলাই মাসে আবার গ্রেফতার করা হয়েছিল পানাহিকে। সে বারও তাঁর বিরুদ্ধে আগের সাজা কার্যকর করার প্রসঙ্গ সামনে আসে। প্রায় সাত মাস কারাবাসের পরে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পান তিনি। কারাগারে থাকার সময় এবং মুক্তির পরেও তাঁর কাজ ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলেছে। তাঁর মুক্তির দাবিতে সরব হয়েছিলেন বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী এবং মানবাধিকারকর্মীরা। পানাহির সাম্প্রতিকতম ছবি ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ তাঁকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র মহলে ফের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ২০২৫ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি পাম দ’র জয় করে। পরে সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বিভাগে অস্কারের জন্য ফ্রান্সের মনোনয়ন পায় ছবিটি। ছবির কেন্দ্রে রয়েছে এক দল প্রাক্তন বন্দি, যাঁরা তাঁদের অতীতের অভিজ্ঞতা আর এক নির্যাতনকারী কারারক্ষীর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের মুখোমুখি হয়। বন্দিত্ব, স্মৃতি, প্রতিশোধ এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন ছবিটির কাহিনিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ছবিটির প্রচারে বিদেশে যাওয়ার সময়েও পানাহির বিরুদ্ধে ইরানে আইনি জটিলতা ছিল। তবু আন্তর্জাতিক সফর শেষে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ইরানে ফিরে আসেন পরিচালক। সেই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে চলচ্চিত্র মহলে আলোচনা হয়েছিল। কারণ, দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে আগের সাজা কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এর পরেই নতুন করে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের খবর সামনে এল। চলতি বছরের গোড়ায় এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন পানাহি। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্রের দমন-পীড়ন এবং তার প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া হিংসার চক্র ক্রমশ দীর্ঘায়িত হলে তা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ছবিতে আমি দেখিয়েছি, হিংসার চক্র চলতে থাকলে তা থামানো কতটা কঠিন হয়ে ওঠে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, রাষ্ট্রের তরফে যে নৃশংসতা চালানো হচ্ছে, তাতে আশঙ্কা হচ্ছে, হিংসার এ চক্র চলতেই থাকবে।’

পানাহির বিরুদ্ধে নতুন সাজা ঘোষণার সময় ইরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিক্ষোভ দমনে কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় পানাহির বক্তব্য, বিভিন্ন মতের মানুষের মধ্যে ঐক্যের আহ্বান তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে পদক্ষেপের কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন ইরানের এক চলচ্চিত্র নির্মাতা। তবে নতুন মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রকাশ্যে না আসায় এই দাবির সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা যায়নি। তবে, পানাহির বিরুদ্ধে নতুন সাজা ঘোষণার পরে ইরানের ভিতরে ও বাইরে একাধিক শিল্পী তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। ইরানি অভিনেত্রী সেতারে মালেকি, যিনি পরিচালক মহম্মদ রাসুলফের অস্কার-মনোনীত ছবি ‘দ্য সিড অফ দ্য সেক্রেড ফিগ’-এ অভিনয়ের পর দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, বলেছেন, কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের কাছে মানুষের নিজেদের গল্প বলার স্বাধীনতা হারানো ভয়ংকর আশঙ্কার বিষয়। তাঁর মতে, সেই গল্প যখন দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে যায়, তখন তাকে আর সহজে নীরব করে রাখা যায় না। পানাহির বিরুদ্ধে সাজাকে তিনি সেই স্বাধীন কণ্ঠকে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা হিসাবেই দেখছেন।

আমেরিকাভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান’ও সাংস্কৃতিক জগতের উপর বাড়তে থাকা চাপ নিয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থাটির বক্তব্য, শিল্পী, লেখক, কবি, সঙ্গীতশিল্পী ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে ইরান কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ আরও কঠোর হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ ভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করা ব্যক্তিদেরও এমন নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে, যা ইরান জুড়ে ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ। জাফর পানাহির বিরুদ্ধে নতুন রায় সেই বৃহত্তর উদ্বেগকেই ফের সামনে এনেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!