- দে । শ
- জুন ১৯, ২০২৬
শান্তিচুক্তির মধ্যেই লেবাননে হামলা ইজরায়েলি বাহিনীর, নিহত অন্তত ১৬। স্থগিত আমেরিকা-ইরান বৈঠক
পশ্চিম এশিয়ায় সদ্য ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ফের ঘনাচ্ছে অশান্তির মেঘ। ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তি কার্যকর হওয়ার মাত্র একদিনের মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালাল ইজরায়েল। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির দাবি, শুক্রবার ভোর থেকে চলা হামলায় অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। তবে নিহতদের পরিচয় এবং হতাহতের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
শুক্রবার সকালে ইজরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, রাতভর দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় তাদের বাহিনী অভিযান চালিয়েছে, হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সেনার দাবি, হিজবুল্লাহর যোদ্ধা, অস্ত্রভান্ডার আর সামরিক পরিকাঠামোকেই নিশানা করা হয়েছে। ইজরায়েলের অভিযোগ, ইরান-সমর্থিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠী বারবার যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করছে। সে কারণেই হামলা চালাতে বাধ্য হয়েছে তারা। কিন্তু ইজরায়েলের এই পদক্ষেপ নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সদ্য হওয়া সমঝোতার ভবিষ্যৎকে।
ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর সঙ্গে নৈশভোজের সময় ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিটি সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়। ওই সমঝোতা স্মারকে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং লেবানন-সহ সমস্ত ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কূটনৈতিক মহলের মতে, দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘর্ষ সমঝোতার ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিতে পারে। কারণ, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযান ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ফলে ওই ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়লে বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়াও ধাক্কা খেতে পারে।
চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচনের মুখে থাকা ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অবশ্য লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা কার্যত উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, হিজবুল্লাহর হুমকি সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত ইজরায়েলি বাহিনী লেবাননের মাটিতেই থাকবে। এই পরিস্থিতিতে সুইৎজারল্যান্ডে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্ধারিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গিয়েছে। ওই বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সের। বৃহস্পতিবার তিনি তাঁর সুইৎজারল্যান্ড সফর স্থগিত করেন। হোয়াইট হাউসের তরফে জানানো হয়েছে, ‘লজিস্টিক সমস্যার’ কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এর ঠিক আগেই হিজবুল্লাহ দাবি করেছিল, দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের জেরে ইরান তাদের প্রতিনিধিদল পাঠানো পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর জেডি ভ্যান্স ইজরায়েলের উদ্দেশে কড়া বার্তাও দেন। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বে ইজরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প।’ চুক্তির পর থেকেই ওয়াশিংটনের তরফে বারবার সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘আমরা লেবানন, হিজবুল্লা এবং ইজরায়েল-সহ সমস্ত ফ্রন্টে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি প্রত্যাশা করছি। মধ্যপ্রাচ্যের সব পক্ষকে আমরা অনুরোধ করছি, যাতে তারা আমাদের আলোচনাকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিজেদের প্রতিশ্রুতি অটুট রাখে।’ তবে পরিস্থিতি যে দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে, তার ইঙ্গিত মিলেছে ইরানের তরফ থেকেও। দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ ইতিমধ্যেই সতর্ক করে বলেছেন, চুক্তির কোনো শর্ত বা ধারা লঙ্ঘিত হলে তার ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, ইরান-আমেরিকা সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পর এটি দ্বিতীয় বড়ো হামলা। এর আগে চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রথম ইজরায়েলি হামলায় দক্ষিণ লেবাননে অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছিলেন। সে হামলাও হয়েছিল লেবানন-সহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী চুক্তি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। সর্বশেষ হামলার মধ্যে রয়েছে কফর তেবনিত শহরের কাছে ড্রোন হামলা এবং জাবাদিন এলাকায় পৃথক আর একটি বিমান হামলা। জানা যাচ্ছে, কফর তেবনিতের কাছে একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে চালানো ইজরায়েলি ড্রোন হামলায় ২ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, জাবাদিনে পৃথক হামলায় মৃত্যু হয়েছে আরও এক জনের।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর দাবি, তারা গত ৪ দিন ধরে চলা ইজরায়েলি সামরিক অভিযান প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, ড্রোন, রকেট আর গোলন্দাজ হামলার মাধ্যমে তারা ইজরায়েলি সেনা ও ট্যাঙ্ককে লক্ষ্যবস্তু করেছে। হিজবুল্লার বক্তব্য, তাদের পাল্টা আক্রমণের ফলে ইজরায়েলি বাহিনী কফর তেবনিতের দিকে আরও অগ্রসর হতে পারেনি। যদিও হিজবুল্লাহর এ দাবির সত্যতা যাচাই সম্ভব হয়নি। তবে দক্ষিণ লেবাননে টানা সংঘর্ষ, বাড়তে থাকা হতাহতের সংখ্যা এবং আমেরিকা-ইরান শান্তি প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তির আশা ফের ধাক্কা খেল বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল।
❤ Support Us





