Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • আগস্ট ৩, ২০২৬

যন্তর মন্তরের বদলে বিকল্প বিক্ষোভস্থলের দাবিতে জনস্বার্থ মামলা দায়ের, কেন্দ্রকে নোটিস শীর্ষ আদালতের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
যন্তর মন্তরের বদলে বিকল্প বিক্ষোভস্থলের দাবিতে জনস্বার্থ মামলা দায়ের, কেন্দ্রকে নোটিস শীর্ষ আদালতের

‘নিট’ প্রশ্নফাঁস ঘিরে দিল্লির যন্তর মন্তরে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম ছাত্র-যুব বিক্ষোভ দেখেছে রাজধানী। বিক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। এর ফলে ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের যাতায়াত, জরুরি পরিষেবা নিত্যদিনের কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটছে। আবার, দিল্লিতে বিক্ষোভ-সমাবেশের জন্য যন্তর মন্তরের পরিবর্তে বিকল্প স্থান নির্ধারণের দাবিতে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে সোমবার বিষয়টি বিবেচনার জন্য সম্মত হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আবেদনে বলা হয়েছে, যন্তর মন্তর এখন আর বিক্ষোভের জন্য উপযুক্ত স্থান নয়, কারণ সেখানে আন্দোলন হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি হয়, জরুরি পরিষেবা ব্যাহত হয়।

প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি. মোহনা-র সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আবেদনকারী সতীশ চন্দ কৌশিক-এর দায়ের করা এ মামলায় কেন্দ্র সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিস জারি করেছে। পাশাপাশি, সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা-কে আবেদনে উত্থাপিত উদ্বেগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দেশ নিয়ে আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে।আবেদনে দাবি করা হয়েছে, জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ-সমাবেশের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত জরুরি সামগ্রীর সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটে। শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, এ মামলায় মূলত যন্তর মন্তর এলাকায় যাতায়াত ও প্রবেশ-প্রস্থানের সমস্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বলেন, ‘আবেদনে বলা হয়েছে, প্রবেশ ও প্রস্থানের সমস্যার কারণে যন্তর মন্তর আর বিক্ষোভের জন্য উপযুক্ত স্থান নয়। চিকিৎসা-সংক্রান্ত জরুরি সরঞ্জামের সরবরাহও ব্যাহত হয়। আমার মনে হয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

শুনানির সময় আবেদনকারীর আইনজীবী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত একটি রাজনৈতিক মিছিলের প্রসঙ্গও তুলে বলেন, ‘২০ জুলাইয়ের মতো আরেকটি ঘটনা এড়ানো উচিত।’ তবে সুপ্রিম কোর্ট ওই প্রস্তাবিত কর্মসূচি নিয়ে কোনো মন্তব্য করে নি। আদালত জানায়, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের। শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছে, এ মামলাটি পৃথকভাবে তালিকাভুক্ত করে পরবর্তী শুনানি করা হবে।

উল্লেখ্য, স্বাধীনোত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিল্লির যন্তর মন্তরের নাম উচ্চারিত হয় শুধু ঐতিহাসিক স্থাপত্য হিসেবে নয়, প্রতিবাদ ও গণআন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হিসেবেও এর জগৎজোড়া পরিচিতি। সংসদ ভবন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রক এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলির নিকটবর্তী হওয়ায় কয়েক দশক ধরেই দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, কৃষক সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, ছাত্র সংগঠন, সরকারি কর্মচারী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ-সমাবেশের প্রধান মঞ্চ হয়ে উঠেছে এই এলাকা। রাজধানীতে নিজেদের দাবি-দাওয়া সরাসরি কেন্দ্রের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যন্তর মন্তর কার্যত একটি নির্দিষ্ট বিক্ষোভস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের পর থেকে যন্তর মন্তরে আন্দোলনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়তে থাকে। সরকারি চাকরির দাবিতে আন্দোলন, সংরক্ষণনীতি, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকদের ঋণমুক্তি, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, পরিবেশ রক্ষা, নারী-নিরাপত্তানানা ইস্যুতে বছরের পর বছর ধরে এই এলাকায় অবস্থান-বিক্ষোভ, অনশন ও মিছিলের সাক্ষী থেকেছে দিল্লি। আন্দোলনের মাত্রা যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও। ২০১১ সালে সমাজকর্মী আন্না হাজারের নেতৃত্বে জন লোকপাল বিলের দাবিতে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন যন্তর মন্তরকে আন্তর্জাতিক স্তরেও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। হাজার হাজার মানুষের সমাগম, টানা অনশন এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া জনসমর্থনের ফলে ই আন্দোলন ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। অনেকের মতে, সেই আন্দোলনের প্রভাবেই পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় পরিবর্তন আসে।

এর পরেও যন্তর মন্তর বারবার জাতীয় স্তরের প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মীদের ওয়ান র‌্যাঙ্ক, ওয়ান পেনশন‘-এর দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন, বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের বিক্ষোভ, সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন এবং বিভিন্ন রাজ্যের নাগরিক সংগঠনের কর্মসূচি নিয়মিত ভাবে এই এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৩ সালে ভারতীয় মহিলা কুস্তিগীরদের যৌন হেনস্থার অভিযোগকে ঘিরে আন্দোলনও যন্তর মন্তরকে ফের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে নিয়ে আসে। সে আন্দোলন ঘিরে পুলিশি হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক বিতর্কও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয় ছিল।

একই সঙ্গে, যন্তর মন্তরে ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ-সমাবেশকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের অসুবিধা, যানজট, শব্দদূষণ জরুরি পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও সময়ের সঙ্গে জোরালো হয়েছে। ২০১৭ সালে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) পরিবেশ ও জনদুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে সেখানে নিয়মিত বিক্ষোভের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। পরে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিলেও, স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকার ও জনস্বার্থের সঙ্গে তার ভারসাম্য বজায় রাখার উপর জোর দেয়। সাম্প্রতিক জনস্বার্থ মামলাটি সেই দীর্ঘ বিতর্ককেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!