- এই মুহূর্তে দে । শ
- ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬
ছাত্র সংঘর্ষে ফের উত্তাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়! পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন কর্তৃপক্ষের, জারি একগুচ্ছ নির্দেশিকা
আইসিসি নির্বাচন ও অভ্যন্তরীণ বিবাদের জেরে ফের উত্তাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। আক্রান্ত শিক্ষক থেকে ছাত্র। শুক্রবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের মধ্যে সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আহত হন অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিং ও ললিত মাধব। সে ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার সন্ধ্যায় ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এইবার ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন স্নাতকোত্তর ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র প্রিয়ম চট্টোপাধ্যায়। তার কানের পর্দা ফেটে যায় বলে অভিযোগ।
বিশ্ববিদ্যাল্য সূত্রে জানা যাচ্ছে, শুক্রবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানে শিক্ষক ও ছাত্ররা উপস্থিত ছিলেন। সায়েন্স-আর্টস মোড়ের কাছে দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়, যা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে আহত হন দুই অধ্যাপক। প্রিয়ম তখন উপস্থিত ছিলেন এবং আহত অধ্যাপকদের উদ্ধার করতে চেষ্টা করেছিলেন। এসএফআই-এর অভিযোগ, সে ঘটনার জের ধরে সোমবার তাঁকে লক্ষ্য করে কালেক্টিভের ১০–১২ জন ছাত্র অতর্কিতভাবে হামলা চালায়। মারপিটের সময় প্রিয়ম মাটিতে পড়ে যান এবং অচৈতন্য হয়ে যান। তাঁকে উদ্ধার করেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল কাফি সহ অনান্য শিক্ষকরা। অধ্যাপকদের দ্রুত হস্তক্ষেপে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় শঙ্কিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী থেকে কর্তৃপক্ষ সকলেই। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শিক্ষকের উপর হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অকল্পনীয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনায় ৫ সদস্যের বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকেও সদস্য রয়েছেন। কমিটির চেয়ারপারসন করা হয়েছে প্রাক্তন আইএসআই ডিরেক্টর বিমল রায়কে। এছাড়া সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য শ্যামল রায়, বোস ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন রেজিস্ট্রার শম্পা দাস, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সহ-উপাচার্য অমিতাভ দত্ত এবং প্রেজেন্টিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বে আছেন উপ-রেজিস্ট্রার আবুল হাসনাথ। তদন্ত কমিটি ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিপোর্ট জমা দেবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় নতুন নির্দেশিকাও জারি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক। যারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন, তাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত বৈধ পরিচয়পত্র থাকা আবশ্যক। যদি কেউ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন করতে না পারেন, তাহলে অন্য কোনো বৈধ পরিচয়পত্র দেখাতে হবে এবং গেটে একটি রেজিস্টারে যে ব্যক্তিকে দেখা করতে যাচ্ছেন তার বিস্তারিত তথ্য (যোগাযোগ নম্বরসহ) লিখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, দুই বা চার চাকার যানবাহনে ক্যাম্পাসে প্রবেশের জন্য ‘জাবি’ পার্কিং স্টিকার লাগানো বাধ্যতামূলক। স্টিকারবিহীন যানবাহনের ক্ষেত্রে প্রবেশের আগে বিশ্ববিদ্যালয়কে কারণ জানাতে হবে। নিরাপত্তা বিধি আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের মাদকদ্রব্য বা অবৈধ পদার্থ নেওয়া যাবে না। রাত ৮টার পর কোনো দলবদ্ধ সমাবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। শিক্ষার্থীদের বাইরে কোনো ব্যক্তি রাত ৮টার পরে ক্যাম্পাসে থাকলে তাকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিরাপত্তা কর্মীদের প্রতি যে কোনো অসদাচরণ বা অসম্মানজনক আচরণে গুরুতর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

শিক্ষক সমিতি জুটা ইতিমধ্যে দাবি জানিয়েছে, ক্যাম্পাসে শিক্ষকের ওপর হামলা পরিকল্পিত। তারা উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে জানান, যদি দোষীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে তারা ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কর্মবিরতি পালন করবেন এবং ২ মার্চ থেকে প্রশাসনিক কাজে অসহযোগিতা করবেন। জুটার সাধারণ সম্পাদক পার্থ প্রতিম রায় বলেন, ‘ক্যাম্পাসে একটি নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা প্রশাসনের দায়িত্ব। আমরা চাই, ওই দিন যারা হামলায় যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কর্তৃপক্ষ মৈখিকভাবে আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু আমরা কার্যকর পদক্ষেপ চাই।’
অপরদিকে, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য সরকারি অনুমতি নিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন শুরু হয়েছে। ঘটনার স্থান ও আশেপাশের ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত কমিটি তা পর্যবেক্ষণ করবে। এ সকল উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। শুক্রবার শিক্ষক নিগ্রহের পর সোমবারে ফের সংঘর্ষ, কানের গুরুতর আঘাত, নতুন নিরাপত্তা বিধি, শিক্ষক সমিতির হুঁশিয়ারি এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা একত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ক্যাম্পাসে শান্তি ফিরিয়ে আনা হবে। তবে শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষা কতটা কার্যকর হবে, তা আগামীদিনে দেখা যাবে।
❤ Support Us






