- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- অক্টোবর ১৩, ২০২৫
অর্থনৈতিক গতির চালিকাশক্তি নয়া প্রযুক্তি আর উদ্ভাবন; ত্রয়ীর তত্ত্বই পেল এবার নোবেল স্বীকৃতি
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস সোমবার ঘোষণা করেছে, ২০২৫ সালের অর্থনীতিতে নোবেল জয় করেছেন জোয়েল মোকির, ফিলিপ আঘিয়ন এবং পিটার হাউইট। তিনজনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ‘উদ্ভাবন-চালিত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ব্যাখ্যা করার জন্য’ এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মান তাঁরা অর্জন করেছেন। পুরস্কারের অর্ধেক জোয়েল মোকিরের জন্য এবং বাকি অর্ধেক যৌথভাবে আঘিয়ন ও হাউইটের মধ্যে ভাগ করা হয়েছে। রয়্যাল একাডেমি জানিয়েছে, এই বছরের অর্থনীতির লরিয়েটরা দেখিয়েছেন, শুধুমাত্র পুঁজি, শ্রম বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়— নতুন চিন্তা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনই এখন মূল চালিকাশক্তি। দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য এ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
জোয়েল মোকির জন্ম নেদারল্যান্ডের লেইডেনে, ১৯৪৬ সালে। বর্তমানে নর্থ-ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁর গবেষণা দেখিয়েছে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন কিভাবে একে অপরকে সহায়তা করে, এবং কিভাবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উদ্ভাবনী চক্র অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। মোকির বলেন, সৃজনশীল ধ্বংস ছাড়া স্থায়ী বৃদ্ধি সম্ভব নয়। নতুন প্রযুক্তি পুরনো প্রযুক্তিকে প্রতিস্থাপন করে, সমাজে পরিবর্তন আনে, কিন্তু এতে প্রায়ই বিদ্যমান সুবিধাভোগীদের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তাই উদ্ভাবন ও পরিবর্তনের জন্য সমাজের গ্রহণযোগ্যতা অপরিহার্য। সমাজে মুক্ত চিন্তা এবং উদার মনোভাব না থাকলে এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা থেমে যেতে পারে।
ফিলিপ আঘিয়ন ও পিটার হাউইট ১৯৯২ সালে যৌথভাবে একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করেন, যা ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ নামে পরিচিত। মডেল অনুযায়ী, যখন নতুন প্রযুক্তি বা উন্নত পণ্য বাজারে আসে, তখন পুরনো পণ্য ও প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রক্রিয়া একদিকে যেমন সৃজনশীল, কারণ এটি আরো উন্নত পণ্য ও প্রক্রিয়ার পথ তৈরি করে। তবে এ প্রক্রিয়া ধ্বংসাত্মকও, কারণ পুরনো প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে দেয় না। অর্থাৎ, নতুন উদ্ভাবন পুরনোকে প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করে। তাঁদের মডেল প্রথমবারের মতো সৃজনশীল ধ্বংসকে মাক্রো-অর্থনীতির সাধারণ সমতার মধ্যে সংজ্ঞায়িত করেছে। তাঁরা বলছেন, মানব ইতিহাসের দীর্ঘ সময়ে জীবনযাত্রার মান প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে ধারা বদলে যায়। নতুন আবিষ্কার ও প্রযুক্তি ক্রমাগত আসে, উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, আয় বাড়ে, জীবনমান উন্নত হয়। মোকির দেখিয়েছেন, বৈজ্ঞানিক ও প্রয়োগযোগ্য জ্ঞানের সংমিশ্রণই স্থায়ী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। আঘিয়ন ও হাউইটের মডেল দেখায়, এ প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা ও বাজারের চাপে নতুন উদ্ভাবন আরও ত্বরান্বিত হয়। উদাহরণস্বরূপ তাঁরা দেখিয়েছেন, কীভাবে বাষ্প ইঞ্জিন ও স্টীল উৎপাদনের উন্নতি বৈজ্ঞানিক ধারণা ও ব্যবহারিক দক্ষতার সমন্বয়েই সম্ভব হয়েছে।
যদিও নোবেল প্রাপকরা তাঁদের গবেষণা পত্রে সাবধান করেছেন, নতুন প্রযুক্তি বা পণ্যের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান ও কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তবে স্থায়ী চাকরিতে নয়, উৎপাদনশীল ও উদ্ভাবনী চাকরিতে স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া। সামাজিক গতিশীলতা ও উদার পরিবেশ উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে। মোকির, আঘিয়ন ও হাউইটের গবেষণা দেখায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চক্রকে আরও দ্রুত করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে উদ্ভাবনের নেতিবাচক প্রভাবও থাকতে পারে। যেমন পরিবেশ দূষণ, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ, সামাজিক বৈষম্য এবং অস্থায়ী সম্পদের ব্যবহার। তাই সুপরিকল্পিত নীতি গ্রহণ অপরিহার্য। অন্যদিকে, নোবেল কমিটি তাদের বিবৃতিতে মনে করিয়ে দিয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবে আসে না। নতুন চিন্তা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিকে সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তোলা এবং প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করা অপরিহার্য। সৃজনশীল ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে সচল রাখাই স্থায়ী বৃদ্ধির গ্যারান্টি। নইলে আমরা আবারও স্থবির অর্থনীতির মধ্যে ফিরে যেতে পারি।
❤ Support Us








