- খাস-কলম ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- ডিসেম্বর ১১, ২০২৩
স্মৃতিকথা নয়,শ্রদ্ধার্ঘের চেয়ে বেশি
অঞ্জন দত্তের “চালচিত্র এখন”(২০২৩) চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হলো। যা মূলত মৃণাল সেনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং অভিনয়জীবনের নানা স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার নির্যাস । কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে, পরিচালক নিজে মঞ্চে এসে এ ছবি বানানোর তাগিদ ও পেছনের কথা দর্শকদের বললেন । জানালেন স্বউদ্যোগে প্রযোজনার নেপথ্য কাহিনী ।
সিনেমা “চালচিত্র”(১৯৮১) করার সময়ে মৃণাল সেনের কর্ম জীবন, তাঁর ব্যক্তিত্ব , দর্শন ও মতামত, কলাকুশলীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামলানো এবং বিশেষ করে অঞ্জনকে দিগদর্শন করানোর চিত্রভাষ্য আছে এই নির্মাণে । মাত্র দেড় ঘন্টার বিস্তারে দু’টি মানুষের দৈনন্দিনতার আভাসও থাকে বিভিন্ন মূহুর্তের উল্লেখ ও সংলাপে ।

এই দৃশ্যমালার যা সবচেয়ে ভালো, এটা স্মৃতিকথা হয়েও স্রেফ তা নয়, তথ্যচিত্রের গুণ নিয়েও তা নয়, শ্রদ্ধার্ঘের চেয়ে অনেক বেশি কিছু । অতীতকে বর্তমানের চোখে দেখা এবং দুই প্রজন্মের পরস্পরের কাছে আসার এ এক উপভোগ্য অনন্য আধুনিক চলচ্চিত্রের সার্থক সৃজন । আঙ্গিকের দিক দিয়ে তাই এর বুনন সহজ দেখালেও সরল নয়, বরং শ্যুটিয়ের সমান্তরালে এগোনো, মাঝেমধ্যে চরিত্রদের নিজেদের কথা, সঙ্গীদের প্রসঙ্গ, বাড়ির কথা,মৃণালের অন্যান্য ছবির চরিত্রদের প্রসঙ্গ, সবকিছু ছুঁয়ে সঠিক শৈলীতে গাঁথা হয়েছে ।
চালচিত্রের প্রায় সব চরিত্র ও প্রধান কলাকুশলী এখানে আছেন, তবে নামের সামান্য বদল নিয়ে । আছে চিত্রগ্রহণের সময়ের বাধা বিপত্তি, নির্মাণের নানা অনুষঙ্গ, চরিত্রের সঙ্গে ব্যক্তির বিকাশের সুন্দর বর্ণনা, এমনকি অভিনয় ও পরিচালনার কিছু গূঢ় বার্তা ।
অঞ্জন সরাসরি মৃণালের চালচিত্রের দৃশ্য না দেখিয়ে, ক্যামেরার উল্টো দিকে কী কী হয়েছিল, তা বলে দর্শকের কৌতূহল মিটিয়ে চলেন । তাই এ খানিক মেকিং অব চালচিত্রও বটে । আবার তার মাঝে তৎকালীন পৃথিবীর কিছু প্রসঙ্গ তুলে এনে ঐতিহাসিক ছোঁয়াও রেখে দেন । ছবি আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে গুরু-শিষ্যের স্পষ্ট রাজনৈতিক আদানপ্রদানে । ফলে চরিত্র দীপু এবং ব্যক্তি অঞ্জনের সমঝোতার প্রশ্নে ব্যক্তিগত দর্শন, জীবনের লক্ষ্য এবং শহর কলকাতা অন্য মাত্রা পেতে থাকে । “দত্ত ভার্সেস দত্ত” না করলে হয়ত এই গভীরতায় পৌঁছত না চালচিত্র এখন ।
অতি সংযমের সঙ্গে এ ছবিতে কলকাতাকে ব্যবহার করা হয়েছে, বিশৃঙ্খলার মধ্যে মজার সন্ধান করা হয়েছে, যা ছবিকেও রসময় করেছে । ম্যাক্সমুলার ভবনে জার্মান নাটক করার সময় সহঅভিনেতাদের ঝগড়া দেখাতে গিয়ে মৃণাল ও অঞ্জন দু’জনেরই নেতিবাচক সমালোচনা তুলে ধরা হয়েছে । নাটকটির একটি বিশেষ সংলাপ ব্যবহার করে এবং গীতা সেন, অনুপকুমার, উৎপল দত্ত, কে কে মহাজনের অনুষঙ্গে আরেক দিগন্ত খুলে দেওয়া হয় ।
নীল দত্তের সঙ্গীত পরিচালনায় গান এ ছবির যথার্থ সম্পদ । চিত্রনাট্যে যা বলা যায় নি, তা পূরণ করে দেয় ছোটো ছোটো বেশ কিছু গান, যা কলকাতা, দেশের দশা, চরিত্রের মনের কথা তুলে ধরে । আবহনির্মাণও বেশ উচ্চমানের হয়েছে বলা যায় ।
এই ছবিতে তাই কেবল একরৈখিক প্রণতির বদলে নানা খেলার পুরো সুযোগ নিয়েছেন অঞ্জন । আবার সংযম দেখিয়ে সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও পুরস্কার পাওয়া ইত্যাদি অনেক কথা বলেননি, তাতে এ ছবি কেউ পছন্দ না করলেও(যে আশঙ্কা তিনি নিজে করেছেন), ধান ভানতে শিবের গীত বলতে পারবেন না ।
অঞ্জনের এই সিনেমার বড় গুণ সহজ করে সরাসরি এবং আন্তরিকভাবে সিনেমার জগতের এক খণ্ডচিত্র তুলে ধরা, অথচ তার ফলে সিনেমার অনেক দিক আধুনিকতার আয়নায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে । হয়ত এ ছবি তাঁর চিত্রযাত্রায় আরেক বাঁক এনে দিতে পারে ।

এ ছবির ত্রুটি কি কিছুই নেই ! খুঁজে বার করলে আছেই, যেমন জার্মান নাটকের সংলাপটি অত বার ব্যবহার করার দরকার ছিল কি ! অঞ্জন বলতে পারেন তিনি ধরতাই হিসেবে ব্যবহার করে মূল বিষয় নিয়ে বার্তা দিতে চেয়েছেন । কে কে মহাজনের সঙ্গে সুরাপানের দৃশ্যের অর্থ বোঝা যায়, কিন্তু বারংবার দৃশ্যগ্রহণের শেষে পরিচালকের একই “কাট ! ঠিক আছে !” না বলে সেই জায়গায় শ্যুটিয়ের আরও অন্য দিক যোগ করা যেতেই পারত ।
একটি সংলাপ আলাদা করে বলতেই হয়। একা মানুষের স্বাধীনতা ও দলের বাধ্যবাধকতা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠতে থাকে, তখন মৃণাল যে ভাবে চলমান ছবি থেকে ভাড়াবাড়ির শ্যাওলা ঘষে তুলে ফেলার সমবেত উদ্যোগের উদাহরণ দেন, তা এক প্রাপ্তি।
নবাগত নায়কসহ প্রত্যেকেই ভালো অভিনয় করেছেন। অঞ্জন অতি নিপুণ অভিনয়ের সঙ্গে নির্দেশনায় তাঁর মুখের পার্শ্বচিত্র নেওয়ায় আমরা মৃণাল সেনের চকিত উপস্থিতি টের পেয়ে যাই। রঙের ব্যবহার খাপ খেয়ে গেছে ছবির চলনের সঙ্গে। মৃণালের জন্মশতবর্ষে আরেক ছবি “পদাতিক” মুক্তি পাবার আগে দর্শক তৃপ্তি পাবার সুযোগ পেলেন, তা নি:সন্দেহে বলা চলে।
❤ Support Us








