Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • এপ্রিল ১৯, ২০২৫

চলছে শেষ প্রস্তুতি। রাত পোহালেই শহরে বামেদের ‘মেহনতি ব্রিগেড’

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
চলছে শেষ প্রস্তুতি। রাত পোহালেই শহরে বামেদের ‘মেহনতি ব্রিগেড’

ব্রিগেডের লাল সমাবেশে ইতিহাস গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বামেরা। শ্রমিক-কৃষক-বস্তি সংগঠনের ডাকে রোববার বিকাল ৩টায় ‘মেহনতি ব্রিগেড’। ব্রিগেডের মঞ্চে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ছাড়াও প্রথমবারের মতো বক্তব্য রাখবেন কৃষক, খেতমজুর, শ্রমিক ও বস্তি আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা। বক্তব্য রাখতে পারেন যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জী।

বাংলায় এক সময় ব্রিগেড ও বামফ্রন্ট ছিল কার্যত সমার্থক শব্দ। সত্তরের দশক থেকে বামেদের ডাকা ব্রিগেড মানেই রাজ্যজুড়ে অন্যরকম উত্তেজনা। প্রমোদ দাশগুপ্ত, অনিল বিশ্বাস, হরেকৃষ্ণ কোঙার, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যদের আমলে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় জমেছে লাল সমাবেশে। লাল পতাকার রং আর সম্মিতিত স্লোগানে মুখরিত হয়েছে কল্লোলিনীর আকাশ-বাতাস। আজ সে রাজাও নেই, রাজপাটও নেই। তবু ফিরতি বছর ব্রিগেড সমাবেশের ডাক দেন বামফ্রন্ট নেতৃত্বরা। দূর-দূরান্তের জেলা থেকে পার্টি দরদীরা ছুটে আসেন প্রিয় নেতাদের বক্তব্য শুনতে, রাজনৈতিক সংগ্রামের আকাল অবস্থায় স্পর্ধা আর লড়াইয়ের অক্সিজেন সংগ্রহ করতে। ঘরছাড়া বহু বাম-কর্মীনেতাদের ব্রিগেড যেন মহামিলনক্ষেত্র। উত্তরবঙ্গের পাহাড়-তরাই-ডুয়ার্স থেকে হাজার হাজার চা শ্রমিক ইতিমধ্যেই ব্রিগেডমুখী হয়েছেন। রবিবারের কলকাতায় জড়ো হবেন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষেরা।শনিবার থেকেই বাম-কর্মীসমর্থকরা মহানগরের পথে আসতে শুরু করে দিয়েছেন। জানা যাচ্ছে, বানারহাট, মাদারিহাট, মালবাজার, শিলিগুড়ি থেকে ট্রেনে ঠাসাঠাসি ভিড়ে তাঁরা রওনা দিচ্ছেন। দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মৎস্যজীবী, মধুমৌলিরা নদীপথ পেরিয়ে ব্রিগেডে যোগ দিতে চলেছেন। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর, রানিগঞ্জ, আসানসোল, দুর্গাপুর—এই সমস্ত অঞ্চল থেকে আদিবাসী ও খনি শ্রমিকরা ছুটে আসছেন। শুধু তাই নয়, বারাকপুর, হাওড়া, হলদিয়া, দমদম, কাঁচরাপাড়া, নদীয়া, শিল্পাঞ্চল থেকে নির্মাণ শ্রমিক, ছোট দোকানদার, মুটে-মজুর, হস্তশিল্পী, পরিবহণ কর্মীরাও সক্রিয় অংশগ্রহণ করছেন। মুর্শিদাবাদ ও মালদহে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে মিছিল হচ্ছে; পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জুড়ে লাগাতার প্রচার কর্মসূচি চলছে।

এই ব্রিগেডের আরেক তাৎপর্য হল বক্তাদের তালিকায় নতুন মুখ। দীর্ঘদিন ধরে সিপিএম-এর ব্রিগেড মানেই ছিল প্রবীণ নেতাদের একচেটিয়া উপস্থিতি। কিন্তু এবার সেই ধারা ভাঙতে চলেছে। ব্রিগেডের মঞ্চে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম প্রধান বক্তা হিসাবে থাকলেও, প্রথমবারের মতো বক্তব্য রাখবেন কৃষক, খেতমজুর, শ্রমিক ও বস্তি আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা। বক্তব্য রাখতে পারেন যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জী। রাজ্যজুড়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ও তরুণদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা এতটাই বেশি যে, তাঁকে বক্তা হিসেবে না রাখা ‘রাজনৈতিক ভুল’ হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

রাজ্যজুড়ে এই মুহূর্তে অস্থির অবস্থা। মালদা-মুর্শিবাদাবাদের ঘটনা, চাকরিহারাদের আর্তনাদ সব মিলিয়ে কিছুটা ব্যাকফুটে লড়াকু নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই আবহে বামেদের ভোটবাক্সে শক্তি না থাকলেও, বিধানসভা-লোকসভায় কোনো প্রতিনিধি না থাকলেও ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড যে কানায় কানায় ভরে উঠবে, আশা রাখছেন সিপিএম-এর রাজ্য নেতৃত্বরা। আগামীকালের সমাবেশকে শ্রমিক-কৃষক-বস্তিবাসী মানুষের সমাবেশ বলে দাবি করেছেন তাঁরা। এই সমাবেশের মূল উদ্যোক্তা মূলত বামপন্থী শ্রমিক ও গণ সংগঠনগুলি। আইটিইউ, সারা ভারত কৃষক সভা, সারা ভারত ক্ষেতমজুর ইউনিয়ন আর পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতি। এই প্রথমবার সিপিএম সরাসরি সমাবেশের ডাক দেয় নি। বরং ভরসা রেখেছে শাখা সংগঠনগুলির উপর। তাহলে কি বামেদের বিরুদ্ধে কলকাতা কেন্দ্রিকতা, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মানুষের পার্টি হয়ে ওঠার যে ট্যাগ লেগেছে তা থেকে বেরোতে চাইছে আলিমুদ্দিন স্ট্রীট? প্রশ্ন আর জল্পনা — রাজনীতির দুই স্তম্ভের বহু উত্তরই হয়তো মিলবে ধুলোভরা ব্রিগেড মাঠে। অতীতে ব্রিগেড মানেই ছিল সিপিএম-এর রাজনৈতিক কর্মসূচি। এবার বামপন্থীদের রাজনৈতিক কৌশলে এক নতুন পরীক্ষা, শ্রমজীবী মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে এক গণমুখী সমাবেশ।

শুক্রবার শ্রমিক ভবনে সাংবাদিক সম্মেলন করে সিআইটিইউ, সারা ভারত কৃষকসভা, সারা ভারত খেতমজুর ইউনিয়ন এবং পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতির নেতৃবৃন্দরা জানিয়েছেন, রাজ্যের সব জেলা থেকে লাখ লাখ মানুষ আসবেন এই সমাবেশে। এমনি বামেদের বিগ্রেডের জনসংখ্যার সর্বকালীন রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে বলে মনে করছেন নেতারা। তাঁরা বলছে, শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গের জমায়েতই ১ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে! সে মতো প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। । জাত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণে ব্রিগেডের সমাবেশ এক নতুন মাত্রা পাবে বলে মনে করছেন শ্রমিক-কৃষক নেতারা। ফসলের ন্যায্য দাম, কৃষক আত্মহত্যা, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, ১০০ দিনের কাজ, সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি, বস্তি উচ্ছেদ, চাকরি বিক্রি ও চলমান সন্ত্রাস, রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয়কে সামনে রেখে বক্তব্য রাখবেন তাঁরা।

বামেদের ভোট শতাংশ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। গত কয়েক বছর ধরে ব্রিগেডে চোখধাঁধানো ভিড় হলেও তা ভোটের ফলে বিশেষ প্রতিফলিত হয়নি। এই বিসংগতির কারণ কী, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ যেমন চলেছে, তেমনি দলীয় অন্দরে চিন্তার ভাঁজও স্পষ্ট। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাই এবারের ব্রিগেডকে ঘিরে আরো পরিকল্পিত ও সচেতন প্রয়াস নিতে চাইছে বাম শিবির। তবে ব্রিগেডকে শুধুমাত্র ভোটের চোখে দেখতে নারাজ বাম নেতৃত্ব। তাঁদের মতে, এটা একটা ‘পলিটিকাল মোবিলাইজেশন’, বৃহত্তর সমাজ সচেতনতার আয়োজন। যা ধীরে ধীরে বামেদের হারানো জমি পুনর্দখলের ভিত গড়তে পারে। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী একটি ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘এই ব্রিগেড মানুষের ভরসা ফেরানোর ব্রিগেড। তৃণমূল আর বিজেপির কথা মানুষ আর বিশ্বাস করে না। তারা নিজের অধিকারের জন্য এবার রাস্তায় নামছে’।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!