- এই মুহূর্তে দে । শ
- এপ্রিল ৬, ২০২৬
বর্ষীয়ান চিকিৎসক মণি কুমার ছেত্রী প্রয়াত
প্রান্তিক সমাজের প্রতিনিধি। মহানগরের অভিজাত মহলেও সহজ যাতায়াত। দীর্ঘ কর্মজীবনে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যাননি নিজের শিকড়। বিস্তৃত চিকিৎসকজীবনের অভিজ্ঞতা আর কর্মস্পৃহাই চালিত করেছে তাঁকে আজজীবন। কিংবদন্তী বর্ষীয়ান চিকিৎসক মণি কুমার ছেত্রী প্রয়াত হলেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ১০৬ বছর। রবিবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জের বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। শোকস্তব্ধ পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, দিন পনেরো আগে পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পান তিনি। এরপর শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়ি ফিরলেও, শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি।
১৯২০ সালের ২৩ মে দার্জিলিংয়ের তিস্তা ভ্যালি চা-বাগান এলাকায় গোর্খা পরিবারে জন্ম মণি কুমার ছেত্রীর। ছোটবেলা কাটে পাহাড়েই। দার্জিলিং মিউনিসিপ্যাল প্রাইমারি স্কুল ও টার্নবুল হাই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা। ১৯৩৬ সালে দার্জিলিং গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে কলকাতায় পাড়ি উচ্চশিক্ষার টানে। সেন্ট পল’স ক্যাথিড্রাল মিশন কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের পর ভর্তি হন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। ১৯৪৪ সালে এমবিবিএস এবং ১৯৪৯ সালে এমডি ডিগ্রি অর্জনের পর চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চতর শিক্ষার জন্য পাড়ি দেন লন্ডনে। সেখান থেকে রয়্যাল কলেজ অফ ফিজিশিয়ানস-এর এমআরসিপি ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফেরেন।
দেশে ফিরে শুরু হয় কর্মজীবন। স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন-এ যোগ দেন। পরে বিধানচন্দ্র রায়-এর আমলে প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতালে (বর্তমান এসএসকেএম) কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান হিসেবে যোগ দেন। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানে হয়ে ওঠেন গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। দীর্ঘদিন সার্জেন সুপারিনটেনডেন্ট পদে দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি আইপিজিএমইআর-এর কার্ডিওলজি ও মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর-ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেন। বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজি-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গঠনে তাঁর ভূমিকা আজও স্মরণীয়। তাঁর হাত ধরেই এসএসকেএম হাসপাতালে চালু হয় আধুনিক ইনটেনসিভ থেরাপি ইউনিট (আইটিইউ)। পাশাপাশি এনডোক্রিনোলজি, নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, ডায়াবিটিস ও রিউম্যাটোলজির মতো বিশেষায়িত বিভাগ চালুর ক্ষেত্রেও পথিকৃৎ ছিলেন তিনি, যা সে সময়ে রাজ্যের সরকারি হাসপাতালে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতার ছাপ স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য অধিকর্তার পদ সামলেছেন তিনি। চিকিৎসক হিসেবে তাঁর খ্যাতি যেমন ছিল সুদূরপ্রসারী, তেমনই সংগঠক হিসেবেও ছিলেন সমান দক্ষ। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু-র ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বহুদিন।
চিকিৎসাক্ষেত্রে অনন্য অবদানের কেন্দ্রীয় স্বীকৃতি আসে ১৯৭৪ সালে, পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয় তাঁকে। অবসর গ্রহণ করেন ১৯৮২ সালে। তবে চিকিৎসা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হননি কখনো। জীবনের শেষপর্যন্ত চিকিৎসা ও পরামর্শদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে বিতর্কও এড়িয়ে যায়নি। আমরি হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি ওই হাসপাতালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন। সে ঘটনায় গ্রেফতারও করা হয় তাঁকে। যদিও পরবর্তীতে আদালত তাঁকে অভিযোগমুক্ত ঘোষণা করে।
মণি কুমার ছেত্রীর প্রয়াণে শোকের ছায়া চিকিৎসক মহলে। ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর’স ফোরামের তরফে জানানো হয়েছে, সোমবার তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে। উত্তরবঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যরা কলকাতায় পৌঁছনোর পর সম্পন্ন হবে শেষকৃত্য।
❤ Support Us







