- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ৭, ২০২৫
উচ্চমাধ্যমিকেও জেলাগুলির উজ্জ্বল ছবি। মেধাতালিকার প্রথম ১০-এ ৭২ কৃতী পরীক্ষার্থী, পাশের হারে এগিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর।
উচ্চ-মাধ্যমিকের লাখ লাখ পরিক্ষার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান করে, পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে আজ। এ বছর মোট ৪ লক্ষ ৮২ হাজার ৯৪৮ জন পড়ুয়া পরীক্ষায় বসেছিল। এর মধ্যে পাশ করেছে ৪ লক্ষ ৩০ হাজার ২৮৬ জন। এ বছর উচ্চ মাধ্যমিকে পাশের হার ৯০.৭৯ শতাংশ। চলতি বছরে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ৩ মার্চ থেকে, শেষ হয় ১৮ মার্চ। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৫০ দিনের মাথায় ফলপ্রকাশ হল। ২০২৫-এই শেষ বার্ষিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, পরের বছর থেকে চালু হচ্ছে সেমেস্টার পদ্ধতি। বুধবার সাংবাদিক সম্মেলন করে শিক্ষা সংসদ উচ্চ-মাধ্যমিকের মেধা তালিকাও প্রকাশ করেছে। মেধা তালিকার প্রথমে দশে জায়গা পেয়েছে মোট ৭২ জন। এর মধ্যে হুগলি এবং পূর্ব বর্ধমান থেকে ৭ জন করে ঠাঁই পেয়েছে মেধা তালিকায়।
এ বছর উচ্চ-মাধ্যমিকে রাজ্যের সেরা হয়েছে বর্ধমান সিএমএস হাই স্কুলের রূপায়ণ পাল। মোট প্রাপ্ত নম্বর ৪৯৭। সে বাংলায় পেয়েছে ৯৮, ইংরেজিতে ৯৭, অঙ্ক, ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রিতে ১০০-র মধ্যে ১০০ এবং বায়োলজিতে ৯৯। রূপায়ণ জানায়, তার কোনও নির্দিষ্ট পড়াশোনার রুটিন ছিল না। তবে বোর্ড পরীক্ষার ঠিক এক মাস আগে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা সময় দিয়েছিল। নিট-এ বসেছিল রূপায়ন। সে জানিয়েছে ওই পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে বর্ধমানের কৃতী সন্তান। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে কোচবিহারের বাকশিরহাট হাই স্কুলের ছাত্র তুষার দেবনাথ, প্রাপ্ত নম্বর ৪৯৬। মাধ্যমিকেও রাজ্যে নবম হয়েছিল সে। অর্থনৈতিক সঙ্কটের সব বাধা জয় করে সে জায়গা দখল করেছে মেধাতালিকায়। প্রতিটি বিষয়ের জন্য গৃহশিক্ষক ছিল। দিনে অন্তত ৪-৫ ঘণ্টা নিজে পড়ত। তাঁর বাবা সব্জি বিক্রি করেন। তুষার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আইআইটিতে পড়াশোনা করে গবেষক হতে চায়।
মাধ্যমিকে র্যাঙ্ক করার স্বপ্ন ছিল রাজর্ষি অধিকারীর। সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ হল এ বছরের উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায়। ২০২৫-এর ফলাফলে রাজর্ষি রাজ্যের মধ্যে এককভাবে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে । আরামবাগ হাই স্কুলের ছাত্র রাজর্ষির প্রাপ্ত নম্বর ৪৯৫, শতাংশের হিসেবে ৯৯। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে সে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সাংবাদিক বৈঠকে যখন রাজর্ষির নাম ঘোষণা করা হয়, তখন আবেগে চোখে জল এসে যায় তাঁর মা-বাবার। সাফল্যে খুশি রাজর্ষি নিজেও বলে, ‘তৃতীয় হব, এমনটা কোনওদিন ভাবিনি।’ চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে বাঁকুড়ার সোনামুখী গার্লস হাই স্কুলের ছাত্রী সৃজিতা ঘোষাল। নম্বর ৪৯৪। যৌথভাবে চতুর্থ হলেও ছাত্রীদের মধ্যে সে সেরা। ছোটবেলায় মা-কে হারিয়েছিল সৃজিতা, স্কুলশিক্ষক বাবা-ই হয়ে উঠেছেন একমাত্র অবলম্বন। কৃতী ছাত্রী জানায়, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি ছিল না, সময় পেলেই সে পড়ত। কোচিংয়ের শিক্ষকদের গাইডেন্স অনুযায়ী সে চলেছে। অবসর সময়ের প্রিয় সঙ্গী গান, ছবি আঁকা আর ওয়েব সিরিজ। ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার সবার স্বপ্ন দেখছে বাঁকুড়ার কন্যা, পছন্দের বিষয় ডেটা অ্যানালিটিক্স ও কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন।
এ বছর উচ্চ মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছে ৭২ জন। হুগলি ও পূর্ব বর্ধমান জেলার ৭ জন করে রয়েছে এই তালিকায়। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা বাঁকুড়ার যমজ ভাই অনীশ ও অনীক বারুইয়ের একসঙ্গে নবম স্থান লাভ। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের এই দুই ছাত্র পেয়েছে ৪৮৯ নম্বর। মাধ্যমিকে অনীশ ছিল চতুর্থ, অনীক ষষ্ঠ। এবার নম্বরের কোনো ফারাক নেই। তাদের লক্ষ্যও এক, চিকিৎসক হওয়া। খেলাধুলার প্রতিও রয়েছে সমান টান। ফলপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স-এ শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, যারা এ বছর উচ্চ মাধ্যমিকে পাশ করেছো, তোমাদের অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। তোমরা ভবিষ্যতে আরও সাফল্য অর্জন করো — দেশ ও দশের মুখ উজ্জ্বল করো।’
সম্পূর্ণ মেধা তালিকা —
প্রথম — রূপায়ণ পাল, বর্ধমান সি এম এস হাই স্কুল, প্রাপ্ত নম্বর ৪৯৭
দ্বিতীয় — তুষার দেবনাথ, বাকশিরহাট হাই স্কুল, প্রাপ্ত নম্বর ৪৯৬
তৃতীয়— রাজর্ষি অধিকারী, আরামবাগ হাই স্কুল, প্রাপ্ত নম্বর ৪৯৫
চতুর্থ— সৃজিতা ঘোষাল, সোনামুখী গার্লস হাই স্কুল, প্রাপ্ত নম্বর ৪৯৪
পঞ্চম—বীরেশ ঘোষ, রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাভবন
প্রান্তিক গঙ্গোপাধ্যায়, আরামবাগ হাই স্কুল
তন্ময় পাতি, সোনারপুর বিদ্যাপীঠ হাই স্কুল
ঋদ্ধিত পাল, কাটোয়া কাশীরাম দাস ইনস্টিটিউশন
কুন্তল চৌধুরী, ভাতার এম পি হাই স্কুল
ঐশিকী দাস, মণীন্দ্রনাথ হাই স্কুল
(সকলের প্রাপ্ত নম্বর ৪৯৩)
ষষ্ঠ —রৌনক গড়াই, শ্রী অরবিন্দ বিদ্যামন্দির
আরাফত হোসেন, মুক্তারপুর হাই স্কুল
চয়ন দাস কবিরাজ, সাঁইথিয়া টাউন হাই স্কুল
জয়দীপ পাল, মেমারি ভি এম ইনস্টিটিউশন
পারন্তপ মুখোপাধ্যায়, নব নালন্দা শান্তিনিকেতন এইচএস স্কুল
দেবদত্তা মাঝি, কাটোয়া ডি ডি সি গার্লস হাই স্কুল
রূপাঞ্জন সরকার, রামকৃষ্ণ মিশন বয়েজ় হোম হাই স্কুল
অয়ন কুণ্ডু, বাঁকুড়া বঙ্গ বিদ্যালয়
(সকলের প্রাপ্ত নম্বর ৪৯২)
সপ্তম — অনুষ্কা শর্মা, আলিপুরদুয়ার নিউ টাউন গার্লস হাই স্কুল
সৈয়দ মহম্মদ তামজিদ, রহিমপুর নবগ্রাম হাই স্কুল
অঙ্কন নন্দী, গোঘাট হাই স্কুল
তন্ময় হালদার, চাতরা নন্দলাল ইনস্টিটিউশন
শিল্পা গোস্বামী, ভেদুয়াসোল হাই স্কুল
শুভম পাল, বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল
প্রিয়াঙ্কা বর্মণ, নগর ডাকালিগঞ্জ হাই স্কুল
জ্যোৎসি ঘোষ, এগরা ঝাটুলাল হাই স্কুল
বর্ণিতা হাজ়রা, এগরা স্বর্ণময়ী গার্লস হাই স্কুল
মহম্মদ সাজিদ হুসেন, হাওড়া হাই স্কুল
কোয়েল গোস্বামী, কচুয়া বোয়ালমারি হাই স্কুল
(সকলের প্রাপ্ত নম্বর ৪৯১)
অষ্টম— জ্যোতির্ময় দত্ত, ফালাকাটা হাই স্কুল
তথাগত রায়, পাঠ ভবন
রাজদীপ সাসমল, কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মিশন মাল্টিপারপাস স্কুল
অভ্রদীপ বেরা, মাহেশ শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয়
রিতম মান্না, বাঁকুড়া জেলা স্কুল
দেবজিৎ রায়, বাঁকুড়া বঙ্গ বিদ্যালয়
অনুভব মণ্ডল, নব নালন্দা শান্তিনিকেতন এইচ এস স্কুল
কৃষ্টি সরকার, মণীন্দ্রনাথ হাই স্কুল
লিনা দাস, মণীন্দ্রনাথ হাই স্কুল
তিস্তা বেরা, রঘুনাথবাড়ি রাম তারক হাই স্কুল
নবমিতা কর্মকার, উদয়পুর হৃদয়লাল নাগ আদর্শ বিদ্যালয়
অদ্রিজ গুপ্ত, নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়
ওম কুণ্ডু, সারদা বিদ্যাপীঠ
রফিদ রানা লস্কর, নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়
অঙ্কিত চক্রবর্তী, বেহালা হাই স্কুল
শ্রেষ্ঠা মুখোপাধ্যায়, শ্রী রামকৃষ্ণ শিশু তীর্থ হাই স্কুল
(সকলের প্রাপ্ত নম্বর ৪৯০)
নবম — সৌরভ বেরা, ঝাড়গ্রাম কে কে ইনস্টিটিউশন
বিপ্রদীপ জানা, কিশোরনগর শচীন্দ্র শিক্ষা সদন
সৌম সুন্দর রায়, মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল
অঙ্কুর ঘোষ, নিমতলা হাই স্কুল
জিষ্ণু ঘোষ, মাহেশ শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয়
নাজ়ফর রহমান, রামপুরহাট জিতেন্দ্রলাল বিদ্যাভবন
সায়ক বিশ্বাস, চাকদা রামলাল অ্যাকাডেমি
সত্যম বণিক, কোচবিহার রামভোলা হাই স্কুল
অদ্রিজা জানা, তাজপুর হাই স্কুল
পবিত্র মণ্ডল, সুন্দরবন আদর্শ বিদ্যামন্দির
অর্ক মণ্ডল, বসিরহাট টাউন হাই স্কুল
তনয় ঠিকাদার, অশোকনগর বয়েজ় সেকেন্ডারি স্কুল
অনিক বারুই, নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়
অনিশ বারুই, নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়
শৌনক বন্দ্যোপাধ্যায়, টাকি হাউজ় গভর্মেন্ট স্পনসর মাল্টিপারপাস স্কুল ফর বয়েজ়
শ্রীজিতা দত্ত, বেথুন কলেজিয়েট স্কুল
সপ্তর্ষি পাঁজা, অনুর হাই স্কুল
(সকলের প্রাপ্ত নম্বর ৪৮৯)
দশম — মৌসুমী পাল, মুরালিগঞ্জ হাই স্কুল
কৌরব বর্মণ, বালাপুর হাই স্কুল
সাগ্নিক পাত্র, মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল
শ্রীপর্ণা মণ্ডল, পানসুলি হাই স্কুল
অর্ক বন্দ্যোপাধ্যায়, বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল
সর্বজিৎ সাহা, আরামবাগ হাই স্কুল
অদ্রিশা সামন্ত, রামনগর এন বি পি হাই স্কুল
দীপ অধিকারী, বোলপুর নীচুপটি নিরোদ বরণী হাই স্কুল
মৌমিতা মণ্ডল, আড়াইডাঙা ডিবিএম অ্যাকাডেমি
অভিষেক দাস, কান্দি রাজ হাই স্কুল
(সকলের প্রাপ্ত নম্বর ৪৮৮)
২০২৫ সালের উচ্চ মাধ্যমিক ছিল একাধিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। এবারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ডেটা সায়েন্স নতুন বিষয় হিসাবে যুক্ত হয়েছে। মোট ৬২টি বিষয়ের পরীক্ষা হয়েছে। আগামী বছর থেকে চারটি সেমেস্টারে ভাগ হয়ে পরীক্ষা হবে। একাদশ শ্রেণিতে প্রথম দুটি, দ্বাদশ শ্রেণিতে তৃতীয় ও চতুর্থ সেমেস্টার। তৃতীয় সেমেস্টার হবে ৮ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর এবং চতুর্থ সেমেস্টার ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি। পরীক্ষার সময়সূচিও নির্ধারিত হয়েছে। । চতুর্থ সিমেস্টারের পরীক্ষা চলাকালীন প্রথম ও তৃতীয় সিমেস্টারের সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষাও চলবে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত ভোকেশন্যাল বিষয় ছাড়া সব বিষয়ের প্রথম সিমেস্টারের পরীক্ষা হবে। তৃতীয় সিমেস্টারের পরীক্ষা হবে দুপুর ১টা থেকে ২টো ১৫ মিনিট পর্যন্ত। এবারের যারা ফলাফলে সন্তুষ্ট নন, তাঁদের জন্য স্ক্রুটিনি ও রিভিউয়ের সুযোগ রয়েছে। আবেদন শুরু হবে ৮ মে রাত ১২টা থেকে এবং চলবে ১১ মে রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত। সাধারণ স্ক্রুটিনির জন্য ফি ধার্য হয়েছে ১৫০ টাকা, রিভিউয়ের জন্য ২০০ টাকা। তৎকালীন স্ক্রুটিনির জন্য ৬০০ টাকা এবং তৎকালীন রিভিউয়ের জন্য ৮০০ টাকা ফি লাগবে। এবার আর তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় খাতা দেখা যাবে না। ২০২৫-এর উচ্চ মাধ্যমিক পরিসংখ্যান বলছে, ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীর সংখ্যা বেশি — প্রায় ৪৫ হাজার ৫৭১ জন। গত বছরের তুলনায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কম হলেও গুণগত মানে সফলতা অনেকটাই বেশি বলে মনে করছেন শিক্ষা সংসদের কর্তারা।
❤ Support Us






