Advertisement
  • বি। দে । শ
  • মে ২৬, ২০২৬

প্রার্থনা মুখর আরাফাতের ময়দান, পবিত্র হজের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক মুহূর্তে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ভারতীয় হাজি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রার্থনা মুখর আরাফাতের ময়দান, পবিত্র হজের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক মুহূর্তে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ভারতীয় হাজি

মক্কার আকাশে তখনও ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়ায়নি। তার আগেই সাদা ইহরামের ঢেউ নেমেছে আরাফাতের বিশাল প্রান্তরে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা লক্ষ লক্ষ মুসলিম পা রেখেছেন সেই ঐতিহাসিক ময়দানে, যেখানে ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায়ী ভাষণ দিয়েছিলেন প্রায় চৌদ্দশো বছর আগে। ইসলামি মতে, আচার ছাড়া হজ সম্পূর্ণ হয় না বলেই মনে করা হয়। মঙ্গলবার, পবিত্র জিলহজ্জ মাসের নবম দিনে, হজযাত্রার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পর্ব ‘উকুফে আরাফা’-য় অংশ নিতে আরাফাতের ময়দানে জড়ো হলেন ১৬ লক্ষেরও বেশি হাজি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ১ লক্ষ ৭৫ হাজারেরও বেশি ভারতীয়।

ইসলামে হজ পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলিম জীবনে অন্তত একবার হজ পালন আবশ্যিক বলে বিবেচিত। আর হজের এ দিনটিকেই ইসলাম ধর্মে সবচেয়ে পবিত্র এবং আবেগঘন দিন বলে মনে করা হয়। হাদিসে রয়েছে— ‘হজ হলো আরাফা।’ অর্থাৎ আরাফাতেই হজের সারবস্তু নিহিত। আর সে কারণেই মঙ্গলবার সকাল থেকেই আরাফাতের বিস্তীর্ণ প্রান্তর পরিণত হয় এক বিশাল মানবসমুদ্রে। কেউ কুরআন পাঠে নিমগ্ন, কেউ দু-হাত তুলে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ক্ষমা চাইছেন আল্লাহর দরবারে। কারও চোখে গভীর আত্মসমর্পণের ছাপ, কারও মুখে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি ছাপিয়েও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি।

মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘জাবালে রহমত’ বা ‘রহমতের পাহাড়’-কে ঘিরেই এই ঐতিহাসিক সমাবেশ। ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, এখানেই মহানবী (সা.) তাঁর বিদায়ী হজের ভাষণে মানবসমতা, ন্যায় ও ভ্রাতৃত্বের বাণী দিয়েছিলেন। অনেকে বিশ্বাস করেন, কুরআনের সে বিখ্যাত আয়াত — ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম’— এই আরাফার দিনেই অবতীর্ণ হয়েছিল। ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে, এখানেই আদম ও হাওয়ার পুনর্মিলন ঘটেছিল বলেও বিশ্বাস করা হয়।

সৌদি প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ভোর থেকেই ধাপে ধাপে হাজিদের আরাফাতে পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। বাস, দ্রুতগতির ট্রেনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হয় নির্ধারিত স্থানে। জেদ্দায় ভারতীয় হজ মিশনের তরফে জানানো হয়েছে, এ বছরের সমস্ত ভারতীয় হাজি নির্বিঘ্নে আরাফাতে পৌঁছেছেন। তাঁদের প্রায় অর্ধেকই যাতায়াত করেছেন রেলপথে। সৌদি আরবে ভারতের রাষ্ট্রদূত সুহেল আজাজ খান জানিয়েছেন, ভারতীয় হাজিদের চলাচল, আবাসন, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ করছে ভারতীয় হজ মিশন। তাঁর কথায়, ‘এত বিপুল সংখ্যক হাজিকে নির্ভুল পরিকল্পনার মাধ্যমে আরাফাতে পৌঁছে দেওয়া নিঃসন্দেহে বড়ো সাফল্য।’

দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা ছুঁয়েছে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি। তীব্র গরমে হাজিদের সুরক্ষায় নজিরবিহীন ব্যবস্থা নিয়েছে সৌদি প্রশাসন। আরাফাতের বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে শীতলীকরণ কেন্দ্র, বসানো হয়েছে বিশাল মিস্টিং ফ্যান। লক্ষ লক্ষ জলের বোতল বিলি করা হয়েছে হাজিদের মধ্যে। মোতায়েন রয়েছেন চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক ও নিরাপত্তারক্ষীরা।  সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রক বারবার হাজিদের রোদে দীর্ঘক্ষণ না থাকার, ছাতা ব্যবহার করার এবং পর্যাপ্ত জল খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তবুও বহু হাজিকে দেখা যায় খোলা আকাশের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করতে।

মসজিদ-এ নামিরা থেকে দুপুরে সম্প্রচারিত হয়েছে আরাফার খুতবা। সেই খুতবায় ধর্মীয় অনুশাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং আত্মশুদ্ধির বার্তা তুলে ধরা হয়। এরপর হাজিরা সুন্নত অনুযায়ী একসঙ্গে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলেছে দোয়া, তওবা ও ইবাদত। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, আরাফার দিন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষমা করেন। সহি মুসলিমে বর্ণিত এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের চেয়ে বেশি মানুষকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এমন আর কোনও দিন নেই।’ সে বিশ্বাসেই মঙ্গলবার আরাফাতের আকাশ ভরে উঠেছে লক্ষ লক্ষ মানুষের কান্নাভেজা মোনাজাতে।

ধর্মীয় মতে, যাঁরা হজে যেতে পারেননি, তাঁদের মধ্যেও দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, আরাফার দিনের রোজা রাখা অত্যন্ত জরুরি। হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, এই রোজা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। ফলে বিশ্বের নানা দেশে মঙ্গলবার বহু মুসলমান নফল রোজা রেখেছেন এবং বিশেষ ইবাদতে অংশ নিয়েছেন। তবে হাজিদের জন্য এদিন রোজা না রাখাই ভালো বলে ইসলামি পণ্ডিতদের মত, কারণ কঠোর শারীরিক পরিশ্রম ও তীব্র গরমে রোজা তাঁদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে। মহানবী (সা.) নিজেও আরাফাতে রোজা রাখেননি বলে উল্লেখ রয়েছে।

সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়তেই ধীরে ধীরে আরাফাত ছাড়তে শুরু করেন হাজিরা। তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য ‘মুযদালিফা’। সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানোর পর আগামী দিনে তাঁরা মিনায় ফিরে অংশ নেবেন ‘জামারাত’ বা শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের রীতিতে। তারপরই শুরু হবে ঈদুল আজহা বা বকরি ইদের আনুষ্ঠানিকতা। একদিকে প্রখর মরু গরম, অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের অবিশ্বাস্য সমাবেশ— সব কিছুর মাঝে আরাফাতের দিন যেন প্রতি বছর নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখে বিশ্বাস, বিনয় ও আত্মসমর্পণের সেই চিরন্তন আহ্বান।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!